মেধা পাচার রোধের এখনই সময়

মেধা পাচার রোধের এখনই সময়

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২০ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১২:৪৫

মেধাকে অস্বীকার করে কোনো দেশ ও জাতি অগ্রসর হতে পারেনি। আমাদের দেশের মেধাবী তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ উন্নত দেশে পাড়ি জমানোর কারণ আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তাহীনতাসহ বিকশিত হওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব। উন্নত দেশের গবেষণা, প্রযুক্তি আর স্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের দেশের মেধাবী সন্তানরা নিজ দেশের বাইরে অন্য কোনো দেশে গিয়ে সেই দেশকে আরও শক্তিশালী ও পরাক্রমশালী করেন। এতে দেশ তার সবচেয়ে মেধাবী, জ্ঞানী, দক্ষ ও যোগ্য নাগরিককে হারায় মেধা পাচারের কারণে। সম্ভাবনাময় এ তুখোড় প্রজন্মকে হারিয়ে নিজ দেশ উন্নয়ন ও অগ্রগতি যাত্রায় বাধার সম্মুখীন হয়।

বর্তমান সময়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য মেধা পাচার একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা এ সমস্যাটি একটি জাতির উন্নয়নকে পশ্চাৎপদ করে দিতে পারে। উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে বাংলাদেশেও মেধা পাচারের ঘটনা প্রতি বছরই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বাংলাদেশের অগ্রগতির সবচেয়ে বড় অন্তরায় এদেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে না পারা, মেধাবীদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে না পারা। বিজ্ঞানের অগ্রগতির এ যুগে যখন বিশ্বের অনেক দেশই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে এবং বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন প্রণোদনা বৃদ্ধিসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করছে, তখন আমাদের দেশ বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাতে পারছে না। সৃজনশীল গবেষণা খাতে নেই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বরাদ্দ। ফলে উদ্ভাবনী ক্ষমতা থাকলেও উদ্ভাবনের সুযোগ পাচ্ছেন না এ দেশের অসংখ্য সম্ভাবনাময় বিজ্ঞানী। ফলে ঘটছে অনিবার্য মেধা পাচার।

শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকদের রাজনীতিসহ নানাবিধ কারণে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছাত্রাবস্থায় মেধাবীদের এক বিশাল অংশ বিদেশে যাওয়ার চেষ্টায় থাকে। একসময় তারা চলেও যায়। এতে করে তারা শুধু বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে তা-ই নয়, সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে অপার সম্ভাবনাময় মেধাও। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী দেশে যদি তার যোগ্যতা অনুসারে কর্মক্ষেত্র ও নিরাপত্তা না পান, তখন তাদের মধ্যে হতাশা কাজ করবেই। প্রসঙ্গ যখন সন্তানের নিরাপদ ভবিষ্যৎ, নিরাপদ জীবনযাপনের জন্য কেউ যদি বিদেশে গমন করেন, তাহলে তাকে দোষ দেওয়া যায় কি? আমরা মাঝে মধ্যেই তাদের কটাক্ষ করে বলে থাকি, তারা স্বার্থপরের মতো দেশের স্বার্থ বিবেচনা না করে বিদেশে পাড়ি জমায়। আদতে মেধাবীরা দেশ ছাড়তে চান না, পরিস্থিতি তাদের দেশ ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করে।
এ মেধাবী সন্তানরা কি অর্থ পাচারের উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন? তা কিন্তু নয়। তাহলে যারা এভাবে চলে যাচ্ছেন, তাদের আফসোসটা ঠিক কোথায়? কোন কষ্টে তারা নিজের জন্মভূমি তথা শেকড় ভুলে থাকতে পারছেন? সেই কষ্টকে উপলব্ধি করতে হবে। পুরো ব্যাপারটাকে হালকাভাবে দেখার কোনো অবকাশ নেই। যথাযথ মূল্যায়নের অভাব, সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তির অনিয়মে পরাজয় ঘটেছে মেধার। ক্ষমতার দাপট, অর্থের লেনদেনে প্রকৃত মেধাবীরা বঞ্চিত হয়ে চলেছে। অথচ উন্নত বিশ্বে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে রাজনীতির ছোঁয়া নেই। শিক্ষক হতে চাইলেও ছাত্র রাজনীতির ক্ষমতা নয়, যোগ্যতা ও গবেষণার মানই সেখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয় আর বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষকরা দিনরাত কাজ করেন আবিষ্কারের নেশায়।

আজ বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে, যা নিয়ে আমরা শঙ্কিত। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নৈতিক অবক্ষয় আজ দেশকে এত বড় বিপর্যয়ের সম্মুখীন করেছে। চাকরি-পদোন্নতির ক্ষেত্রে সুষ্ঠু নীতিমালার তোয়াক্কা না করে তদবির বাণিজ্য প্রকট হয়ে উঠেছে। ফলে যোগ্যতা না থাকলেও অনেকে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়ে যাচ্ছে। যদি যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে সব ধরনের নিয়োগ প্রদান করা হতো তাহলে এখন দেশের সব সেক্টরে যোগ্য ও মেধাবীরা অবস্থান করতেন। মেধাবীরা তাদের যোগ্য সম্মান এবং সামাজিক নিরাপত্তা পেলে মেধা পাচারের ঘটনা ঘটত না।

মেধা পাচারের ব্যাপারে খুব শিগ্গির কোনো উদ্যোগ না নিলে আগামী একশ বছরেও আমরা কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পারব কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। ১৯৭১ সালে পরাজয় নিশ্চিত জেনে বিজয়ের আগমুহূর্তে দেশের বুদ্ধিজীবীদের নিমর্মভাবে হত্যা করা হয়েছিল, যেন সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া জাতিটি সহজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে। আজও প্রতি বছর ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী বিশিষ্টজনদের নিয়ে আমরা আফসোস করি। অথচ প্রতি বছর হাজারও মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে সে নিয়ে আমাদের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। এ বিষয়ে আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকদের উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের বেশিরভাগ রাজনীতিকের সন্তানই বিদেশে পড়াশোনা করে। এ বিষয়ে তারা কতটা সোচ্চার হবেন, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। কাজেই এ বিষয়ে দেশের সাধারণ মানুষকেই বিশেষভাবে সোচ্চার হতে হবে।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading