দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে খাদ্যের অপচয় কাম্য নয়

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে খাদ্যের অপচয় কাম্য নয়

নাজমুল সিকান্দার । শুক্রবার, ২২ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:৩০

পুরো পৃথিবীতে উৎপাদিত খাদ্যের বিরাট অংশ নষ্ট ও অপচয় হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে খাদ্য নষ্ট হয়। যা একদিকে খাদ্য নিরাপত্তায়, অন্যদিকে কৃষকের আয় ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর মধ্যে চলমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বাংলাদেশে খাদ্যের অনেক সমস্যা দেখা দিয়েছে।

জাতিসংঘ বলছে, মানুষের জন্য উৎপাদিত খাবারের মধ্যে অপচয় হয় ১৩০ কোটি টন (মোট উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ)। খাবারের অপচয় রোধে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে; কিন্তু ব্যক্তিপর্যায়ে আমাদের প্রচেষ্টা, উদ্যোগ ও আন্তরিকতা কতটুকু? অনেক বাড়িতে প্রতিবেলায় এত এত খাবার রান্না হয় যে, খেতে না পারার কারণে পরে তা ফেলে দিতে হয়। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বজুড়ে বছরে মোট খাবারের ১৭ শতাংশ রেস্তোরাঁ ও দোকানে অপচয় হয়। আমাদের আরেকটি অভ্যাসে ভীষণ অবাক হই, খাবার টেবিলে হরেক রকমের সুস্বাদু খাবার পরিবেশিত হলে পেট ভরে যাওয়ার পরও চোখের ক্ষুধা সামলাতে না পেরে অনেকে পেটে খাবার তুলতেই থাকে। পরে খেতে না পেরে ঐসব খাবারের জায়গা হয় বোনপেটে। এফএওর তথ্যমতে, উৎসবের দিনগুলোয় এ অপচয়ের পরিমাণ আরো বেড়ে যায়।

খাবারের অপচয় রোধে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে; কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে আমাদের প্রচেষ্টা, উদ্যোগ ও আন্তরিকতা কতটুকু? অনেক বাড়িতে প্রতিবেলায় এত এত খাবার রান্না হয় যে, খেতে না পারার কারণে পরে তা ফেলে দিতে হয়। আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি বাসাবাড়িতে ভিক্ষুক, দুস্থ ও অসহায় মানুষজন সাহায্যের জন্য এলে ভাত-রুটি যা থাকত, তাই খাইয়ে দেওয়া হতো। ওটিই হয়তো হতো সে অভুক্তের সারা দিনের আহার। গরিবের এভাবে ক্ষুধা নিবারণের এ রেওয়াজটি আজ আর ইটপাথরের খাঁচায় বন্দি বাসাবাড়িতে চোখে পড়ে না বললেই চলে। এ ধরনের মানবিক কাজগুলো আবার চালু করা যেতে পারে।

আমাদের কিছু কিছু অভ্যাস খাবার অপচয়ে সামান্য পরিমাণে হলেও ভূমিকা রাখে। অনেক অনুষ্ঠানে আয়োজকের আর্থিক সামর্থ্য প্রদর্শনের জন্য খাবারের পদের সংখ্যা ও পরিমাণ অনেক থাকে এবং ওয়েটাররাও অনেক সময় এত বেশি পরিমাণে খাবার তুলে দেয়, যা পরে নষ্ট হয়। ঘরে-বাইরে দাওয়াতে অতিথিদের জোর করে বেশি বেশি খাবার তুলে দেওয়ার প্রবণতা এ সমাজে প্রবলভাবে বিদ্যমান। এতে খাবারের অপচয় হয়। অতিথি আপ্যায়নে অন্যের পাতে জোর করে খাবার তুলে দেওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। ভালোবাসা ও সম্মান দেখাতে গিয়ে অন্যের পাতে জোর করে তুলে দেওয়া খাবারের বেশিরভাগই শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয়। সামান্য আন্তরিক হলে আমাদের বেঁচে যাওয়া খাবারে ক্ষুধার্ত অনেক মানুষের আহারের সংস্থান হয়ে যায়। ইসলামে বলা হয়েছে-তোমার প্রতিবেশী কেউ যদি অভুক্ত থাকে, তা হলে তার দায়দায়িত্ব তোমার ওপরেও বর্তায়। আমরা ক’জন বিষয়টি বিবেচনায় রাখি? বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বেঁচে যাওয়া খাবার অনেকেই এখন এতিমখানায় পাঠিয়ে দেন; আবার অনেক সংস্থা গরিব-দুঃখীদের খাওয়ানোর জন্য এসব খাবার সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। এ ভালো উদ্যোগগুলো আরও সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশে কী পরিমাণ খাদ্য নষ্ট বা অপচয় হয়, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও কয়েকটি গবেষণায় দেখা যায়, শাকসবজি ও ফলমূলে পোস্টহার্ভেস্ট নষ্ট বা অপচয়ের পরিমাণ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ, বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৪৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। মাঠে ফসল বোনা, পরিচর্যা, ফসল কাটা, প্রক্রিয়াজাত করা, দোকানে পৌঁছানো, ক্রেতার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই খাদ্য নষ্ট বা অপচয় হয়, যা এখন বৈশ্বিক উদ্বেগের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপচয়কৃত খাদ্যের শেষ ঠিকানা হয় ভাগাড়। এতে পরিবেশ দূষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তনও ত্বরান্বিত করছে। সেজন্য কোনোভাবেই খাদ্য নষ্ট ও অপচয় করা যাবে না। আমাদের খাদ্যবিলাসিতা থেকে সরে আসার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনকে সীমিত পর্যায়ে নিতে আসতে হবে। ব্যক্তিসতর্কতাও খাদ্যের অপচয় রোধে ভূমিকা রাখতে পারে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে এটি আরো বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।

লেখক :সাংবাদিক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading