ঝুঁকি এড়াতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন জরুরি
মুনতাহা তেহজিব । রবিবার, ২৪ জুলাই ২০২২ । আপডেট ০৯:১৫
রোহিঙ্গা সংকটের যৌক্তিক সমাধানের ব্যাপারে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে কেবল আশারবাণী শোনানো হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি- এমন বিষয় বারবার আলোচনায় এসেছে। এছাড়া, পর্যায়ক্রমে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন করা হবে- এ ধরনের আশ্বাস বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবে আলোর মুখ দেখেনি। সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে মাদক, অস্ত্র চোরাচালানসহ সীমান্ত নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে। এই সমস্যা সমাধানে বন্ধুরাষ্ট্রের দ্রম্নত সহযোগিতা দরকার। না হলে মানবিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশ সংকটে পড়বে। তথ্য মতে, গত বুধবার দুপুরে রাজধানীর হোটেল রেডিসনে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। মূলত ‘রোহিঙ্গা ও নার্কো টেরোরিজম’ শীর্ষক ওই সেমিনারের আয়োজন করে ডিপেস্নামেটস পাবলিকেশন।
বলতে চাই, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার পর থেকে যখন মাদক, অস্ত্র চোরাচালানসহ নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে- তখন বিষয়টি আমলে নেওয়ার বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে যত দ্রম্নত সম্ভব রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রসঙ্গত, কক্সবাজার এলাকায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার পর ২০১৭ সাল থেকে কীভাবে কী পরিমাণ মাদকের চোরাচালান বেড়েছে তার পরিসংখ্যানও তুলে ধরেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, মাদক বলতে ইয়াবা বাংলাদেশে তৈরি হয় না। কিন্তু এর চোরাচালান হচ্ছে বাংলাদেশে। ইয়াবা তৈরি হচ্ছে মিয়ানমারে। অথচ এর ভিকটিম বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের বাহক ও চোরাচালানকারী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মাদকের হাব হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে রোহিঙ্গা এলাকাকে। আমরা মনে করি, যখন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে নানা আঙ্গিকে বাড়তি চাপ ও ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশ- তখন সামগ্রিক এ পরিস্থিতি এড়ানোর সুযোগ নেই। কেননা, মানবিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের ভার বহন করতে গিয়ে এই চাপ নিতে হচ্ছে। কোনো ধরনের মাদক উৎপাদন না করেও বাংলাদেশই এর ভুক্তভোগী- যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
বলার অপেক্ষা রাখে না, এর আগে এমন বিষয় আলোচনায় এসেছিল যে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সরকারের অগ্রাধিকারে থাকলেও মিয়ানমারের অনিচ্ছায় তা শুরু হয়নি। প্রসঙ্গত, মিয়ানমারের রাখাইন থেকে সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট হত্যা-নির্যাতন শুরুর কারণে মাত্র কয়েক মাসে সাত লাখ ৩৯ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এ ক্ষেত্রে এটাও বলা দরকার, প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নাগরিকদের মানবিক কারণে আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়েছিল বাংলাদেশ। সে থেকে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ অনেকটা এককভাবেই মোকাবিলা করছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকট। আমরা মনে করি, প্রত্যাবাসন সফল না হলে বাংলাদেশের জন্য স্বাভাবিকভাবেই তা উদ্বেগের। সঙ্গত কারণেই সামগ্রিক পরিস্থিতি এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশে মানবিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। আর এই সংকটের সমাধান নিহিত রয়েছে মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের ওপর। লক্ষণীয়, যখন মাদক চোরাচালান, অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে সীমান্তে এবং রোহিঙ্গা এলাকায় বেড়েছে মাদকদ্রব্য উদ্ধারের সংখ্যাও। তখন পরিস্থিতি ভয়াবহতা অনুধাবন করা জরুরি। এমন বিষয়ও সামনে এসেছে যে, সিনথেটিক ড্রাগস আসছে সীমান্ত দিয়ে। যেখানে বাহক হিসেবে কাজ করছে রোহিঙ্গারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে অস্ত্র চোরাচালান। এছাড়া মানবপাচারের ঘটনা ঘটছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো থেকে।
সর্বোপরি আমরা বলতে চাই, এমনটিও আলোচনায় এসেছে, মিয়ানমারই রোহিঙ্গা ক্রাইসিস তৈরি করেছে আর তাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রম্নতি ছিল এর সমাধান করা। ফলে মিয়ানমার রাজনৈতিক প্রতিশ্রম্নতি রক্ষা করে রোহিঙ্গা নাগরিকদের ফিরিয়ে নেবে এমনটি কাম্য। এটা মনে রাখা দরকার, প্রায় ১৭ কোটির অধিক বাংলাদেশি নাগরিকের জনবহুল বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের চাপ আর কতদিন সইতে হবে- এই প্রশ্ন অযৌক্তিক নয়। যা আন্তর্জাতিক মহলকে ভাবতে হবে। মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, তাদের আজীবন রাখতে হবে। এটা এখন বাংলাদেশের জন্য বিরাট বোঝা। বাংলাদেশ চায় সুষ্ঠু সুন্দর ব্যবস্থাপনায় নাগরিক মর্যাদায় তাদের পূর্ণ অধিকার দিয়ে ফেরত নেওয়া হোক। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলসহ সংশ্লিষ্টরা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে এমনটি কাম্য।
লেখক- সমাজ গবেষক।
ইউডি/সুস্মিত

