গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ রোধে ব্যক্তি পর্যায়ে সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ
বায়েজিদ মোস্তফা । সোমবার, ২৫ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:৩০
দুর্ঘটনা যেন কোনোভাবেই এ দেশের মানুষের পিছু ছাড়ছে না। নানাভাবে মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। এই অকাল মৃত্যু রোধ করা যাচ্ছে না। মানুষ পানিতে, রাজপথে, বন্যায়, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে, ঘূর্ণিঝড়ে, নৌ-রেলপথে, সড়ক দুর্ঘটনায়, গ্যাস বিস্ফোরণে মারা যাচ্ছে। আর করোনায় মৃত্যুর কথা তো বলাই বাহুল্য। বাংলাদেশে এখন আর স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা নেই। যাদের এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তারা রয়েছে চরম উদাসীন। এক মৃত্যুর রেশ না কাটতেই আরেক মৃত্যু এসে হাজির হয়। আমরা শোকগ্রস্ত ও হতাশ হই। এটাই বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতা। বাংলাদেশের মানুষের নিয়তি। অন্যান্য দুর্ঘটনার পাশাপাশি ইদানীং এসি ও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।
এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, রাজধানীর উত্তরখান থানার বড়বাগ এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে শিশুসহ একই পরিবারের তিনজন দগ্ধ হয়েছেন। বুধবার (২১ জুলাই) রাত সাড়ে ৯টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। পরে দগ্ধ অবস্থায় তাদের রাত আড়াইটার সময় উদ্ধার করে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হয়। দগ্ধরা হলেন- আব্দুল মালেক (৭০), তার স্ত্রী নাজমা বেগম (৪৫) ও তাদের নাতি সাফওয়ান (৫)। শিশু সাফওয়ানের শরীরের ১৮ শতাংশ দগ্ধ, আব্দুল মালেকের শরীরের ২০ শতাংশ দগ্ধ ও নাজমা বেগমের শরীরের ১০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাদের তিন জনকে জরুরি বিভাগের অবজারভেশনে চিকিৎসা চলছে। ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। এই যে গ্যাস লিকেজ ও গ্যাস সিলিন্ডার থেকে দুর্ঘটনা ঘটছে, তারপরও কি আমরা সতর্ক হচ্ছি?
পাঁচ থেকে সাত বছর আগেও এসি বা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে এত আহত হওয়া এবং মৃত্যুর ঘটনা ঘটত না। কিছুদিন আগে, চট্টগ্রামের পাথরঘাটা এলাকায় গ্যাসের পাইপলাইন বিস্ফোরণে দেয়াল ধসে ৭ জন নিহত এবং ১০ জন দগ্ধ হয়েছিল। এখানেই শেষ নয়, রাজধানীর রূপনগরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৭ শিশুর মৃত্যু আমাদের হৃদয়ে দাগ কেটে আছে। বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগে বা গ্যাসের চুলার ব্যবহারে অসাবধানতা ও অসচেতনতা, গ্যাসের সিলিন্ডার পরীক্ষা না করা এবং সরবরাহকৃত গ্যাসলাইনের ত্রম্নটির কারণে বিপদ এবং মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে আনতে পারে তার দৃষ্টান্ত এসব দুর্ঘটনা। মানুষকে বলা হয় সৃষ্টির সেরা জীব, আশরাফুল মাখলুকাত। বর্তমান সমাজের মানুষ সবচেয়ে অনিরাপদ। মানুষ যত্রতত্র প্রাণ হারাচ্ছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না।
এ ক্ষেত্রে সরকারকে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। সারা দেশে বাসাবাড়ি, স্থাপনা ও যানবাহনের সব গ্যাস সিলিন্ডার মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। জননিরাপত্তার উপায় বের করতে হবে। এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা যানবাহনের বাৎসরিক নবায়নের সময় গ্যাস সিলিন্ডার ক্লিয়ারেন্সের শর্ত বেঁধে দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন এবং একইসঙ্গে নিম্নমান ও মেয়াদোত্তীর্ণ সব ধরনের গ্যাস সিলিন্ডারের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনার কথাও বলছেন। অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও ইতিবাচক এ প্রস্তাবটি গ্রহণ করা যেতে পারে।
আমাদের জনপদগুলোতে আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প এলাকা-সব যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে। বিল্ডিং কোড না মেনে যেভাবে গা ঘেঁষে একটার পর একটা স্থাপনা তৈরি হচ্ছে, তাতে শুধু সিলিন্ডার বিস্ফোরণ নয়, যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে। নির্মাণ সামগ্রীর গুণগত মানও রক্ষিত হচ্ছে না। তাই নগরবাসী প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট উভয় ধরনের দুর্যোগেরই হুমকির মধ্যে আছে।
পরিবার, সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্রের প্রতি সবার কিছু না কিছু দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। স্কুল-কলেজের পাঠ্যবইয়ে এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে ছোটবেলা থেকেই ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। জনগণকে সার্বক্ষণিক সচেতন রাখার জন্য গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের প্রচার আরও বাড়াতে হবে। সিলিন্ডার ব্যবহাকারীরা যদি নিজেদের ও জনমানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিকে আমলে না আনে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অবাধ্যদের আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রত্যেককে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কোনো একজনের কোনো একটি অসতর্ক আচরণে অনেক সময় অন্যদেরও বড় খেসারত দিতে হয়, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
লেখক: সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

