সামাজিক অগ্রগতি ব্যাহত করে এসিড সন্ত্রাস

সামাজিক অগ্রগতি ব্যাহত করে এসিড সন্ত্রাস

মহসিনা মান্নান এলমা । সোমবার, ২৫ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:৪৫

দেশজুড়ে এসিড সন্ত্রাস-বিরোধী নানা প্রচার-প্রচারণা থাকা সত্ত্বেও এসিড সন্ত্রাস চলছেই। এসিড সন্ত্রাসের ভয়াবহতায় একজন মানুষের জীবনে যে ছন্দপতন ঘটে, তাতে সমাজ ও রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমানভাবে। আক্রান্তরা হারিয়ে ফেলে আত্মবিশ্বাস ও জীবনযাপনের আগ্রহ। হতাশায় কাটে তাদের জীবন। প্রায় দুই দশক আগে, ২০০২ সালে এসিড সন্ত্রাসের উল্লম্ফন নাড়া দিয়েছিল সারাদেশকে। এরপর আন্দোলন, সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন এবং আইনের কড়াকড়িতে কমে আসতে থাকে ঘটনার সংখ্যা। এরপরও এ নিষ্ঠুরতা ঘটে চলেছে, যার প্রধান শিকার হচ্ছেন নারী ও শিশু। নারী আড় শিশুরা শুধু নয়, পুরুষরাও এসিড সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রেমে প্রত্যাখ্যানের মতো ঘটনার জেরে এসিড নিক্ষেপের মতো বীভৎস অস্ত্রের আশ্রয় নিয়ে মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় বহু তরুণীর স্বপ্ন। সহিংসতা, প্রতিশোধ, শত্রুতার কারণেও এসিড নিক্ষেপের মতো ঘটনা ঘটে। এই বীভৎস এসিড সন্ত্রাস সমাজের চলমান অস্থিরতা, অশিক্ষা, বেকারত্ব, মাদকদ্রব্যের ব্যবহার, আঞ্চলিক প্রভাব, অর্থের দৌরাত্ম্যসহ নানাবিধ সামাজিক অনাচারের ফল। সমাজে মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের ব্যাপক অবক্ষয়ের ফলে সার্বিকভাবে এসিড সন্ত্রাসের মতো সন্ত্রাসের বিস্তৃতি ঘটছে।

এসিড সহিংসতার বিরুদ্ধে কাজ করা এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন (এএসএফ) নিজেদের মনিটরিং সেল, সংবাদ মাধ্যম, বিভিন্ন এনজিও ও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৯৯ সাল থেকে এই অপরাধমূলক ঘটনার পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করে আসছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৪২২টি এসিড হামলার ঘটনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৮০২ জন। এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, এসিড সহিংসতার শিকার ৯৯ শতাংশ নারী হলেও গত কয়েক বছরে পুরুষও আক্রান্ত হচ্ছেন। এছাড়া মোট ভুক্তভোগীর এক-চতুর্থাংশ শিশু; যারা ঘটনার সময় মায়ের কোলে বা কাছাকাছি থাকায় এ ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে। এসিড সহিংসতায় আক্রান্তদের বেশিরভাগের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।

এএসএফের ভাষ্য মতে, পারিবারিক কলহ, যৌতুক, জমিসংক্রান্ত বিরোধ, বিয়ে বা প্রেম প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়া, স্বামীকে তালাক এবং স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েতে বাধা দেয়ার কারণে বরাবরই নারীরা এ ধরনের সহিংসতার শিকার হন। এদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, যৌন সম্পর্কে রাজি না হলেও নারীকে জব্দ করতে এসিড নিক্ষেপ করা হয়। ২০০২ সালে এক বছরেই ৪৯৪টি এসিড সহিংসতার ঘটনা রেকর্ড করেছিল সংস্থাটি। এর আঠারো বছর পর ২০২২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ২১টি ঘটনা রেকর্ড করেছে তারা। এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী উচ্চ আদালত ও বিচারিক আদালত মিলিয়ে এসিড সহিংসতার প্রায় ৬০০ মামলা বিচারাধীন।

২০০২ সালে এসিড হামলার ঘটনা ছিল গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে এসিড অপরাধ দমন আইন করে সরকার। আইন অনুযায়ী এসিডসংক্রান্ত অপরাধের বিচার এসিড অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে হয়ে থাকে। এই বিচার প্রক্রিয়া শেষ হতে হবে ৯০ কর্মদিবসের মধ্যে। এই আইনের ১৬ ধারায় বলা আছে, ট্রাইব্যুনালে কোনো মামলার শুনানি শুরু হলে শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি কর্মদিবসে টানা চলে এর বিচার প্রক্রিয়া। এসিড অপরাধ দমন আইনে এ ধরনের সহিংসতার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসিড নিক্ষেপের মামলায় গত আঠারো বছরে (২০০২ সালে এসিড অপরাধ দমন আইন প্রণয়নের পর) ১৪ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এসিড নিয়ন্ত্রণ আইনের একটি উদ্দেশ্য ছিল, এসিডের অবাধ কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণ। এসিড বিক্রিতে যেসব নিয়ম-নীতি অনুসরণ করতে হয় সেগুলো সবসময় মানা হয় না, ফলে অনেক অনিরাপদ হাতে চলে যায় দাহ্য এই তরল। এসিড নিয়ন্ত্রণ আইনের উদ্দেশ্য পূরণে জাতীয় এসিড নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। এসিডের উৎপাদন, পরিবহন, মজুত, বিক্রয় ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, এসিডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও আইনগত সহায়তা দিতে এ কাউন্সিল কাজ করছে। এছাড়া সরকার নারী ও শিশুর উন্নয়নে বেশকিছু আইন, নীতি ও বিধিমালা তৈরি করেছে।

সরকার সমাজকল্যণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এসিডদগ্ধ ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছে। এছাড়া এসিডদগ্ধদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করাসহ তার পরিবারকে ক্ষুদ্রঋণ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এসিডদগ্ধ দরিদ্র ব্যক্তিকে এককালীন ৫ হাজার টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অনুদান প্রদান করছে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি এসিড হামলার মতো প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে সমাজের বিবেকভান মানুষ, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, সমাজকর্মী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও গণমাধ্যমকর্মীদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। গণপ্রতিরোধ ও গণসচেতনতা সৃষ্টি করে এসিড অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট করার পাশাপাশি তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে শোবাঈকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সামাজিক সুখ, শান্তি ও অগ্রগতি ব্যাহত করে এসিড সন্ত্রাস। সরকারের পাশাপাশি আমাদের সবাইকে এসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা আর সহযোগিতায় নিশ্চয়ই একসময় এসিড সন্ত্রাস সমূলে নির্মূল করা সম্ভব হবে।

লেখক: সমাজ বিশ্লেষক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading