সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব
রায়হান কবির চৌধুরি । মঙ্গলবার, ২৬ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১১:১৫
নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি দেশের নাগরিকের অধিকার। সভ্য দুনিয়া এ বিষয়ে আপসহীন। আমাদের মতো পশ্চাৎপদ দেশগুলোয় যেহেতু সভ্যতার সংকট প্রকট সেহেতু সাধারণ মানুষও বঞ্চিত নিরাপদ খাদ্য থেকে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যাদের কর্তব্য তাদের অনেকের মধ্যে মানবিক অনুভূতির অভাব থাকায় এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করেও কাক্সিক্ষত ফল মিলছে না। দেশে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফুড চেন শপ থাকলেও তাদের মধ্যে মান রক্ষার ব্যাপারে ঘাটতি রয়েছে। এক বছর আগে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরিদর্শক টিম বেশ কয়েকটি অভিজাত নামধারী খাদ্যের দোকান পরিদর্শন শেষে সেগুলোর গ্রেডিং নির্ধারণ করে। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে সংশ্লিষ্ট হোটেল-রেস্তোরাঁ-ফাস্টফুডের দোকানগুলো তাদের আগের মান রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।
করোনা মহামারি শুরুর আগে ২০১৯ সালে রাজধানীসহ আশপাশের হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোর মান নির্ধারণ কাজ শুরু করেছিল খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। প্রথম পর্যায়ে রাজধানীর ৫৭টি হোটেল-রেস্তোরাঁকে গ্রেডিং পদ্ধতির আওতায় আনা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ‘এ প্লাস’ পেয়েছিল ১৮টি এবং ‘এ’ গ্রেড ৩৯টি। রাজধানীর ২০০ হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে এগুলোকে নির্বাচিত করা হয়েছিল। খাবারের মান, রান্নার পরিবেশ, পণ্যের মান, পরিবেশনা, পরিবেশনকারী ও অবকাঠামোগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ আরো কিছু বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এ গ্রেডিং করা হয়। এ ক্ষেত্রে ‘এ প্লাস’, ‘এ’ ছাড়াও ‘বি’ ও ‘সি’ ক্যাটাগরিও রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, খাবারের মান, বিশুদ্ধতা, পরিবেশ, ডেকোরেশন, মনিটরে রান্নাঘরের পরিবেশ দেখা যাওয়ার ব্যবস্থা ও ওয়েটারদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ভিত্তিতে রেস্তোরাঁগুলোকে চার ক্যাটাগরিতে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেসব হোটেল-রেস্তোরাঁ ৯০ নম্বরের বেশি স্কোর পাবে তারা ‘এ প্লাস’, স্কোর ৮০-এর ঊর্ধ্বে হলে ‘এ’, ৫৫ থেকে ৭৯ পর্যন্ত হলে ‘বি’ এবং ৪৫ থেকে ৫৫ হলে ‘সি’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত হবে। এ প্লাস পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো উত্তম মানের এবং এ গ্রেড প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভালো মানের হোটেল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব হোটেলের সামনে ‘এ প্লাস’ হলে সবুজ, ‘এ’ হলে নীল, ‘বি’ হলে হলুদ ও ‘সি’ হলে কমলা রঙের স্টিকার লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমলা রঙের স্টিকারের অর্থ অনিরাপদ খাদ্য। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, এক মাসের মধ্যে মান ভালো না হলে সেগুলোর লাইসেন্স বাতিল করা হবে। কিন্তু কার্যত এতে কোনো সুফল অর্জিত হয়নি। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষকে আরো তৎপর হতে হবে। গড়ে তুলতে হবে জনসচেতনতা।
জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারের কোনো বিকল্প নেই। নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য যেমন শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, উল্টো দিকে অনিরাপদ খাদ্য হৃদরোগ, ক্যানসার, কিডনি রোগ, বিকলাঙ্গসহ অনেক রোগের কারণ হয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি, এসব রোগ বাংলাদেশে মহামারীর আকার নিয়েছে। বলতে গেলে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে এসব ঘাতক ব্যাধি। নতুন করে আর বলার অপেক্ষা রাখে না- খাদ্যে ভেজালই জনসংখ্যার বড় একটা অংশকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। বিশেষ করে ট্রান্স ফ্যাটি এসিড (টিএফএ) যুক্ত বিষাক্ত খাবার। যার প্রধান উৎস ডালডা বা বনস্পতি। বেকারি পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও ভাজা পোড়া খাবারে ব্যাপকভাবে ডালডা ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে হোটেল-রেস্তোরাঁয়।
এসব খাদ্যের কারণেই হৃদরোগে মৃত্যুর সর্বাধিক ঝুঁকিতে থাকা ১৫টি দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশ। দিনে দিনে সেই অবস্থার আরো অবনতি ঘটছে। কেননা নানাভাবে সচেতন করার পরও খাদ্যে ভেজালের পরিমাণ কমেনি। বাজারের বেশিরভাগ খাদ্যই এখন কম-বেশি ভেজালযুক্ত। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ খাবার পাওয়া ‘খড়ের গাদায় সুই খোঁজা’র মতো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও সরকার নিরাপদ খাদ্য আইনসহ বেশ কয়েকটি বিধিমালা ও প্রবিধিমালা করে বিএফএসএ-কে আরো সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু শুধু আইন আর বিধিমালা দিয়ে নিরাপদ খাদ্যর মতো এত ব্যাপক লক্ষ্যে পৌঁছানো খুবই কঠিন। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, এসব উদ্যোগে কোনো কাজই হয়নি। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সব শক্তি নিয়ে সরকারকে মাঠে নামতে হবে। তা না হলে খাদ্যে ভেজাল বন্ধ করা সম্ভব না।
লেখক: শিক্ষাবিদ।
ইউডি/সুস্মিত

