খাদ্য ও জ্বালানি সংকটে উদ্বিগ্ন বিশ্ব: সরকারের ব্যয় সাশ্রয়ী নীতি প্রসঙ্গ

খাদ্য ও জ্বালানি সংকটে উদ্বিগ্ন বিশ্ব: সরকারের ব্যয় সাশ্রয়ী নীতি প্রসঙ্গ
উত্তরদক্ষিণ । ২৬ জুলাই ২০২২

উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ২৬ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১১:৪৫

চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক মানবিক জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব অব্যাহত রয়েছে। খাদ্য ও জ্বালানি সংকট উদ্ধিগ্ন করে তুলছে গোটা বিশ্বকে। এ থেকে বাংলাদেশও প্রভাবমুক্ত নয়। উন্নয়নের অপরিহার্যতায় অত্যাবশকীয় বিষয় সমূহের মধ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অন্যতম প্রধান বিষয়। এরই আলোকে সরকারের ব্যয় সাশ্রয়ীনীতি অনুসরণ সময়োচিত পদক্ষেপ। ব্যয়সাশ্রয়ী হতে ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিস্তারিত লিখেছেন মির্জামমতাজ উদ্দিন

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে যাপিতজীবনের ওপর কতটুকু প্রভাব ফেলতে পারে, সে কথা জানে বাংলাদেশের মানুষ। তা নতুন করে বলার আবশ্যকতা আছে বলে মনে হয় না। স্বাধীনতা যুদ্ধের অতিক্রান্ত পাচঁদশক সেই ভয়াবহতার ঘানি টেনেই এ পর্যায়ে পৌছতে হয়েছে দেশকে। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আজ ৪৬তম। বলতেই হয়, বিশ্বের অন্য দশটি উন্নয়নশীল দেশের মত বাংলাদেশ দাতাদেশ ও দাতা সংস্থার বৈদেশিক ঋণ সহায়তায় বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন শাসকরা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন করে আসছেন। দাতাদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে উন্নয়ন কাজ করা ও সময়মত পরিশোধ করা একটি উন্নয়ন নীতি যা বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত। এভাবেই বাংলাদেশ চলে এসেছে এতদিন। এই উন্নয়নের মাঝে নিহিত আমাদের স্বাধীনতার কাঙ্খিত মূল্যবোধ এবং জাতিসত্বার সকল অর্জন। অর্থনীতিবিদগণ বলছেন উন্নয়নধারা ধরে রাখতে হলে বৈশ্বিক সংকটে ঋণের ঝুঁকি মোকাবেলা করেই টিকে থাকতে হবে দেশকে। কাজেই এই সংকট কেবল দেশের সরকারের নয় আপামর জনতার। পরিস্থিতির এ পর্যায়ে গত ১৮ জুলাই দেশে চলমান জ্বালানি সংকট এবং অব্যাহত ভর্তুকির প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং জ্বালানি তেল আমদানি কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। পাশাপাশি ডিজেলচালিত সব বিদ্যুৎকেন্দ্র আপাতত বন্ধ রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের সুত্রে জানা যায়, দিনে এক ঘন্টা পরিকল্পিত লোড-শেডিং করলে দেশে ৯৭৩ মেগাওয়ার্ট বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব এবং তা দিয়ে সারাদেশে জ্বালানি ঘাটতি পূরণ করবে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। দেশে ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রাখলে প্রতিদিন এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরী হতে পারে। এক সপ্তাহের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বিদ্যুৎতের ঘাটতি পূরণে নতুন সিদ্ধান্তে এগিয়ে যাবে সরকার।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা । দৈনিক উত্তরদক্ষিণ

খরচ কমাতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা: ব্যয় কমাতে সরকারি প্রকল্পের খরচ কমানোসহ বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে কোন প্রকল্পের জন্য কত শতাংশ টাকা খরচ করা যাবে, তাও সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন তিনি। সোমবার (২৫ জুলাই) মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়। তিনি ভার্চুয়ালি সভায় যুক্ত হন। পরে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির বিষয়টি মাথায় রেখে আবার খরচ কমানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ জন্য ইতিমধ্যে প্রকল্পগুলোকে এ, বি ও সি এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এ শ্রেণির প্রকল্পগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সব টাকাই খরচ করা যাবে। বি শ্রেণির প্রকল্পগুলোর জন্য ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত টাকা খরচ করা যাবে। আর সি শ্রেণির প্রকল্পগুলো আপাতত স্থগিত থাকবে।এই শ্রেণিগুলো কিসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে এমন প্রশ্নে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, এগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ঠিক করবে। এটি হবে গুরুত্ব অনুযায়ী। যদি সংশ্লিষ্ট কোনো মন্ত্রণালয় মনে করে কোনো একটি প্রকল্পের শ্রেণি পরিবর্তন করা দরকার, তাহলে তারা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করবে। কেনাকাটার বিষয়েও নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়া গাড়ি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া, উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব। এসব বিষয়ে সবাইকে সহযোগিতা করার জন্য অনুরোধ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

সংকট মোকাবেলা করে টিকে থাকতে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ : বাংলাদেশে মূলত আমদানি নির্ভর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য দেখা দিয়েছে এ সংকট। এসব মেগা প্রকল্প গুলো নির্মিত হয়েছে বা নির্মানাধীন রয়েছে বৈদেশিক ঋণরে ওপর ভিত্তি করেই। বিশ্বের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ঋণ নেয়া ও পরিশোধের প্রবাহমান ধারায় দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমের পরিস্থিতি ছিলো স্বাভাবিক। বিশ্বমন্দার কারণে ওইসব প্রকল্প দেশের ওপর ঋণচাপ বাড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র থেকে জানা যায়, গত বছরের (২০২১-২২) মার্চ শেষে দেশের বিদেশী ঋণরে পরিমান ৯৩ দশমিক ২৩ বিলিয়ন (৯হাজার ৩২৩ কোটি) ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এ ঋণরে পরিমান দাঁড়ায় ৮ লাখ ৭৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকারও বেশি, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ২১ শতাংশ। ঋণরে ৭৩ শতাংশ সরকার ও বাকি ঋণরে ২৭ শতাংশ নিয়েছে দেশের বেসরকারি খাত। বিদেশী সকল ঋণরে দায়বদ্ধতা বর্তায় সরকারের ওপর। বর্তমানে দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার ৫২ শতাংশ। এদিকে বিশ্ববাজারে এলএনজি ও জ্বালানি তেলের চড়াদামের প্রেক্ষিতে পরিকল্পিত লোড-শেডিং ও অপচয়রোধ করে জ্বালানি ও বিদ্যুতের সাশ্রয়কে সমস্যা সমাধানের একটি বিকল্পপথ হিসেবে দেখছে সরকার। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমাতে বিভিন্নখাতে আমদানি নির্ভর পণ্য সরবরাহ কমানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। আর জ্বালানি খাতে ভর্তূকি লাগাম টানার কথা বলছে অর্থ বিভাগ। বিরাজমান বিশ্বপরিস্থিতিতে ইতিমধ্যে অনেক দেশের অর্থনৈতিক ভীত অনেকাংশে হয়ে পড়েছে নড়বড়ে। বাংলাদেশ বৈশ্বিক কিংবা যেকোন সংকট মোকাবেলা করে টিকে থাকতে দৃঢ়ভাবে আত্মবিশ্বাসী।

উত্তরদক্ষিণ । ২৬ জুলাই ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

সাশ্রয়ী নীতি বাস্তবায়ন অপরিহার্য: এদিকে সরকারের বক্তব্য হলো জ্বালানি ক্রয়ে অব্যাহত ভর্তূকি রোধে ব্যয় সাশ্রয়ীনীতি অনুসরণই সময়োচিত পদক্ষেপ। আমদানিকৃত জ্বালানি দাম স্থিতিশীল রেখে সরকারি ভর্তুকি সাশ্রয়ের কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এই পরিকল্পিত লোড-শেডিং। সময়ের পেক্ষাপটে সবাইকে কষ্টসহিঞ্চু হয়ে মানিয়ে নিতে হবে। সেই সাথে বিদ্যুৎ অপচয়রোধ রোধে উন্নয়ন কাজের সাথে যুক্ত সরকারের বিভিন্ন বিভাগের বিদ্যুৎ ব্যয়ের হিসেবটি খতিয়ে দেখে ব্যয়সাশ্রয়ী হতে ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বৈশ্বিকমন্দাত্বের বহুমাত্রিক প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে সরকারের এই ব্যয় সাশ্রয়ী নীতির বাস্তবায়ন শুরুটা জ্বালানি খাত থেকেই। পর্যায়ক্রমে এই ব্যয়সাশ্রয়ী নীতি বাস্তবায়নের আওতায় আনা হবে সকল সরকারি-বেসরকারি-স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান,রাষ্ট্রয়াত্বপ্রতিষ্ঠান এমনকি ব্যক্তি পর্যায়। সকল উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালন ব্যয় খতিয়ে সাশ্রয়ী নীতি বাস্তবায়ন অপরিহার্য। এটিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপদিতে পারলে হবে সবার জন্য মঙ্গলজনক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মিতব্যয়ী হওয়া একজন সুনাগরিকের ভাল গুণ। পারিবারিক-সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের এর কার্যকারিতার প্রয়োগ ঘটাতে পারলে দেশ ও দেশের জনগণ বহুগুণে উপকৃত হবে। অতীতে আমাদের দেশের কোন সরকার উন্নয়ন ব্যয় পর্যালোচনা করে মিতব্যয়িতার মাধ্যমে ব্যয় সংকোচ নীতি পুংখানু- পুংখানু ভাবে বিবেচনা করেছে কিনা তার ইতিহাস জানা নেই। তবে জনগণকে সংঙ্গে নিয়ে সরকারের পরিকল্পিত পরিকল্পনায় ব্যয়সাশ্রয়ী নীতি অনুসরণ পদক্ষেপ শেখ হাসিনা সরকার আমলেই প্রথম। দেশের কাজে দেশের জনগণের অংশগ্রহণ বড়ধরণের সাফল্যকে সহজ করে তোলে, নিজেদের অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ জাতিকে দেখিয়েছে সেই পথ। সংকটে বিচলিত নয় ; মোকাবেলায় আত্মবিশ্বাসী হওয়া চাই। এই আত্মবিশ্বাসী শক্তির উৎস হচ্ছে দেশপ্রেমিক জনগণ। আর সরকার হচ্ছে পথপ্রদর্শক। সকল সমালোচনাকে পিছে ফেলে দৃঢ়ভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে সংকট সমাধানের অভীষ্ট লক্ষে পৌছতে হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি ,আমাদের যে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রয়েছে, সর্বক্ষেত্রে আমরা যদি তার সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি তা হলে আমাদের দেশের অর্থনীতির ভীত আরও মজবুত হবে এবং সহজেই যে কোন সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব।

যেকোন সংকটমোকাবেলায় আত্মবিশ্বাসী মনোভাব জাতির বড়শক্তি। সেই শক্তির উম্মেষ ঘটিয়ে বাংলাদেশ এবং দেশের জনগণ সকল সাফল্যের দৃষ্টান্ত বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করার গৌরবদীপ্ত ইতিহাস রয়েছে। যুদ্ধ কিংবা মহামারীতেই নয় সকল সংকটে সুনাগরিক চেতনাবোধ জাগ্রত করে দায়িত্বশীল হওয়া জরুরী। দেশবাসীর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহবান সবাইকে দায়িত্বশীল ও মিতব্যয়ী হওয়ার। রাষ্ট্রীয় সম্পদ এর যথার্থব্যবহার একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের পক্ষেই সম্ভব। দেশপ্রেমের পরম মমতায় যেমন ইচ্ছা তেমনি করে গড়ে তোলবো, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষ মিলে মিশে স্বাধীন দেশে সহবস্থান করবো, রাষ্ট্রের সুফল সমভাবে ভোগ করবো। বাচঁতে হলে মাথা উচুঁ করে বাচঁবো। দেশের দুর্দিনে সম্মিলিতভাবে পাশে দাড়াবো। এই ইচ্ছা শক্তির জয় হোক।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading