বন্যা: আমাদেরকে মানিবক হওয়ার সতর্কবার্তা
শহিদুল হায়দার । শুক্রবার, ২৯ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১৬:৩৫
নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষ ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা, টর্নেডো ও সাইক্লোনের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেই জীবন তরী নিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। গাঙ্গেয় উপদ্বীপের অতীত ইতিহাস খুব বেশি সুখকর না হলেও সাম্প্রতিক কয়েক বছরে সিডর এবং আইলার পর বড়ো আকারের কোনো দুর্যোগের কবলে এ দেশের মানুষকে পড়তে হয়নি। আইলার ক্ষয়ক্ষতি এখনো বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলের মানুষ পুষিয়ে উঠতে পারেনি। বিগত কয়েক বছরে বন্যার পানিতে সবকিছু ডুবে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেনি। এবারে সিলেট অঞ্চলে তৃতীয় ধাপে বন্যার পানি মারাত্মক আকার ধারণ করে।
আমরা বলতে চাই, সামগ্রিকভাবে বন্যায় যে বিপর্যস্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এবং আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি সামনে আসছে- তা আমলে নেওয়া জরুরি। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কর্তব্য হওয়া দরকার ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের (সম্পূর্ণ) আনুমানিক আর্থিক মূল্য ১ হাজার ২৫৮ কোটি ৫৩ লাখ ৯১ হাজার ১১২ টাকা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের (আংশিক) আনুমানিক আর্থিক মূল্য ৫৫ হাজার ৯৫৭ কোটি ২১ লাখ ২০ হাজার ৫০৮ টাকা। ৩৬৪ কোটি ৮৪ লাখ ৫০ হাজার ৪৩ টাকা (সম্পূর্ণ) এবং ১ হাজার ৩৫৫ কোটি ৩ লাখ ১০ হাজার ৫৫৫ টাকার (আংশিক) ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ব্রিজ/কালভার্ট পাকা সড়ক, ইট নির্মিত সড়ক, কাঁচা সড়ক, প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা, কমিউনিটি স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির এবং বাঁধের সম্পূর্ণ ও আংশিক মিলিয়ে বন্যায় সারাদেশে আনুমানিক সর্বমোট ৮৬ হাজার ৮১১ কোটি ৬৫ লাখ ৫৯ হাজার ৮৭২ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
সারাদেশে বন্যায় পানিবাহিতসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ২৪ হাজার ৮৩৮ জন ও ১৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে দেশের বন্যা পরিস্থিতি বিষয়ক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, সারাদেশে বন্যাজনিত বিভিন্ন রোগে মোট আক্রান্ত হয়েছে ২৪ হাজার ৮৩৮ জন এবং এ পর্যন্ত ১৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়েছেন ১৪ হাজার ৪৯৫ জন এবং একজন মারা গেছেন। চোখের রোগে আক্রান্ত এক হাজার ৩৮৭ জন। বজ্রপাতের শিকার হয়েছেন ১৬ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের। বিভিন্ন সাপের দংশনের শিকার হয়েছেন ৩৩ জন এবং দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও পানিতে ডুবে ১০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
একই সময়ে চর্ম রোগে আক্রান্ত তিন হাজার ৫০ জন। চোখের প্রদাহজনিত রোগে ৪২৪ জন এবং নানাভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন ৭১০ জন। এছাড়া অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়েছেন চার হাজার ৭৮১ জন এবং তাদের মধ্যে নয়জন মারা গেছেন।
আমরা বলতে চাই, যে ক্ষতির পরিমাণ সামনে আসছে তা আমলে নিতে হবে এবং এ কথা ভুলে যাওয়া যাবে না, বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। সঙ্গত কারণেই প্রতি বছরই বন্যাসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মোকাবিলা করতে হয়। ফলে আগাম প্রস্তুতির বিষয়টিও সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এটা ঠিক যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগকে এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু যথাযথ পরিকল্পনামাফিক প্রস্তুতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এছাড়া বলা দরকার, এবারের বন্যায় প্রাণহানির ঘটনা যেমন ঘটেছে, তেমনি নানা ধরনের রোগবলাই থেকে শুরু করে, বিশুদ্ধ পানির সংকট, ত্রাণ সংকটের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছিল। ফলে সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে যথাযথ উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে।
দেশের প্রায় সব নদীর তলদেশ পলিতে ভরাট হয়ে উঁচু হয়ে গেছে। সে তুলনায় ড্রেজিং কার্যক্রম খুবই কম। নদীমাতৃক বাংলাদেশের সব নদী এখনই ড্রেজিং করতে হবে, সে কথা বলা হচ্ছে না। যেসব নদীর কারণে বন্যা হয়, সেগুলো চিহ্নিত করে ক্যাপিটাল ড্রেজিং ও পরে পরিকল্পিত নিয়মিত ড্রেজিং জরুরি। এজন্য প্রয়োজনে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং চিহ্নিত নদীগুলোয় ড্রেজিংয়ের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। সফলভাবে ড্রেজিং করা হলে স্থায়ীভাবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। সর্বোপরি বলতে চাই, নানা দুর্ভোগে বিপর্যস্ত হয়েছে বানভাসিদের জীবন। ফলে যে ক্ষতির বিষয়টি সামনে আসছে তা আমলে নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি সব ধরনের পদক্ষেপ জারি রাখতে হবে। বিভিন্ন সময়ে ত্রাণ সংকট থেকে শুরু করে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এছাড়া বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে নানা সময়ে- যা আমলে নিতে হবে। সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে বন্যাসহ যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সব ধরনের পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে এমনটি কাম্য।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

