চীন-আমেরিকা মুখোমুখি: তাইওয়ান নিয়ে কী পরবর্তী যুদ্ধ?

চীন-আমেরিকা মুখোমুখি: তাইওয়ান নিয়ে কী পরবর্তী যুদ্ধ?
উত্তরদক্ষিণ । ৩০ জুলাই ২০২২

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ৩০ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১২:১০

তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের সঙ্গে আমেরিকার দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনা চলছে। সম্প্রতি আমেরিকার তৃতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরে যাওয়ার খবর ঘিরে দুদেশের মধ্যে উত্তেজনার পরদ তুঙ্গে। গত বৃহস্পতিবার দুই প্রেসিডেন্টের এই ইস্যুতে হুঁশিয়ারি ও পাল্টা হুঁশিয়ারিতে যেনো যুদ্ধের আবহই তৈরি হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেই এমন ইঙ্গিত বিশ্বের জন্য ভিন্ন এক বার্তা বয়ে আনছে। বিস্তারিত লিখেছেন আসাদুজ্জামান সুপ্ত

বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বিশ্ব পরিস্থিতি এমনিতেই বিপর্যস্ত। জ্বালানি তেল, গ্যাস সংকটে ভুগছে বিশ্বে ছোট-বড়, প্রভাবশালী বহু দেশ। এমনি পরিস্থিতিতে তাইওয়ান ইস্যু যেনো পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। তাইওয়ানকে ঘিরে বিশ্বের দুই মোড়ল আমেরিকা-চীন নিজেদের নীতিতে অটল থাকাই যেনো কাল হয়ে উঠেছে। আর তাদের মধ্যকার হুঁশিয়ারি-পাল্টা হুঁশিয়ারি ডেকে আনছে মহাবিপদ তথা যুদ্ধের বার্তা। বিশ্ব পরিস্থিতির বর্তমান সংকটময় অবস্থায় যা ভয়াবহ বিপর্যয়ের শঙ্কা জাগাচ্ছে।

জো বাইডেন

নিজেদের নীতিতে অটল চীন-আমেরিকা: আমেরিকা-চীন সম্পর্কের অবনতি হতেই চলেছে। বাইডেন ক্ষমতায় আসার পরেও তার উন্নতি হয়নি। বরং ইউক্রেন যুদ্ধকে সামনে রেখে সম্পর্ক আরো জটিল হয়েছে। কিন্তু আমেরিকা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সম্পূর্ণ শেষ করে দিতে চায় না। ফলে বার বার সংকটকালে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনার রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবারও সেই উদ্দেশ্যেই বৈঠক হয়েছে বলে হোয়াইট হাউস সূত্র জানিয়েছে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, এদিনের আলোচনার মূল বিষয় ছিল তাইওয়ান। সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার ন্যানসি পেলোসি জানিয়েছেন, তিনি তাইওয়ান সফরে যাবেন। চীন এর তীব্র প্রতিবাদ করেছিল। এদিনের বৈঠক সেখান থেকেই শুরু হয়। বাইডেন শি জিনপিংকে জানান, তাইওয়ানকে আমেরিকা কূটনৈতিকভাবে কীভাবে দেখে। উত্তরে শি বলেছেন, তিনি চাইবেন, আমেরিকা যেন আগুন নিয়ে না খেলে। কারণ আগুন নিয়ে খেললে হাত পুড়বেই। শি জানিয়েছেন, চীন ওয়ান চায়না নীতি নিয়ে চলে। তারা চায়, অন্য দেশগুলিও চীনের এই নীতি মেনে চলুক। চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তারা যেন নাক না গলায়। বাইডেন অবশ্য তাদের বক্তব্য স্পষ্ট করে জানিয়েছেন বলে হোয়াইট হাউসের দাবি। তাইওয়ানের শান্তির জন্য আমেরিকা তাদের নীতির থেকে সরবে না বলে শি-কে জানিয়েছেন বাইডেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট জিনপিং (জো বাইডেনকে) বলেছেন, যারা আগুন নিয়ে খেলবে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। এখন এটা আশা করা যায় যে, আমেরিকা এই বিষয়ে এবার পরিষ্কার ধারণা পাবে।

সাই ইং-ওয়েন

বাইডেন-জিনপিং সরাসরি বৈঠকের ইঙ্গিত: এদিকে, ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই প্রথমবারের মতো মুখোমুখি বৈঠকে বসতে সম্মত হয়েছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। গত বৃহস্পতিবার (২৮ জুলাই) টানা দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা ফোনালাপে উভয় নেতা এই ইস্যুতে সম্মত হন। তবে প্রথমবারের মতো তাদের মুখোমুখি সেই বৈঠকের সময় বা অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার কাছে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, জো বাইডেন এবং শি জিনপিং মুখোমুখি বৈঠকের উপকারিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং এ বিষয়ে উভয়পক্ষের কাছে সুবিধাজনক একটি সময় খুঁজে বের করার বিষয়ে নিজ নিজ টিমকে নির্দেশ দিতে সম্মত হয়েছেন।

শি জিনপিং

ন্যান্সি পেলোসির সম্ভাব্য তাইওয়ান সফর ‘অস্পষ্ট’: সম্প্রতি খবর এসেছে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার এবং দেশটির তৃতীয় ক্ষমতাধর রাজনীতিক ন্যান্সি পেলোসি তাইওয়ান সফরে যাবেন। আর তখন থেকেই চীন এ খবরের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা বলেছে পেলেসি যদি তাইওয়ান আসে তবে অবস্থা ভয়ঙ্কর হবে। মূলত ন্যান্সি পেলোসি আমেরিকার সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনীকিকদের একজন। দেশটির প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্টের পরেই তার অবস্থান। ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাট দলের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন নেতা তিনি। মার্কিন রাজনৈতিক মহলে সবসময়ই তাকে কট্টর চীন-বিরোধী হিসাবে দেখা হয়। চীনের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে পেলোসি বরাবরই সোচ্চার। তবে আমেরিকান প্রশাসনের মধ্যে বিতর্কিত এই সফর নিয়ে দোটানা স্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট বাইডেন গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের বলেছেন, সেনা কম্যান্ডাররা মনে করছেন এই মুহূর্তে স্পিকার পেলোসির তাইওয়ান সফর ইতিবাচক হবে না। আমেরিকার সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, হোয়াইট হাউস এবং পেন্টাগনের পক্ষ থেকে স্পিকারের অফিসের সাথে গোপনে যোগাযোগ করে পেলেনিকে এই সফর স্থগিত করতে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

ন্যান্সি পেলোসি

‘এক সফর বহু ভয়াবহতার কারন হতে পারে’: পেলোসি তাইওয়ান সফর করলে কি পরিণতি হতে পারে তা নিয়ে অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ মুখ খুলতে শুরু করেছেন। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার কিছু প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্টেই তাইওয়ানে সফরে যেতে পারেন পেলোসি। তার এ সফর হবে নাটকীয়। তবে নজিরবিহীন কিছু নয়। দ্বীপটির প্রতি আমেরিকার সমর্থনের বিষয়টি জানাতে পেলোসির এ সফর। রিপাবলিকান নিউট গিংরিচ ১৯৯৭ সালে তাইওয়ান সফরকারী সর্বশেষ হাউস স্পিকার ছিলেন। কয়েকজন বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন, সম্পর্কের টানাপোড়েনের সময় এ ধরনের সফর বড় ধরনের সংকটের সৃষ্টি করতে পারে। এমনকি পরিস্থিতি সংঘাতের দিকেও যেতে পারে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ তাইওয়ান নিয়ে চীন ও আমেরিকা সংঘাতের মুখে রয়েছে বলে মনে করেন না।অনেকটা বিরক্তির সঙ্গে রক্ষণশীল ‘হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের’ চীনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ দিয়ান চেং বলেন, দুঃস্বপ্নের অলীক কল্পনা আছে। সম্ভবত তারা স্পিকার পেলোসির উড়োজাহাজ ভূপাতিত করবে। যখন তিনি দ্বীপটিতে থাকবেন, সম্ভবত তখন তারা সেখানে আগ্রাসন চালাবে। আমরা টম ক্ল্যান্সির উপন্যাসের (সামরিক কল্পবিজ্ঞানের) জগতে নেই। চেং বলেন, খুব সম্ভবত চীন মধ্যরেখায় সামরিক ফ্লাইট বাড়াতে পারে। এই মধ্যরেখা ১৬০ কিলোমিটার বিস্তৃত তাইওয়ান প্রণালিকে বিভক্ত করেছে, যা চীনকে তাইওয়ান থেকে পৃথক করেছে। অথবা তাইওয়ানের ওপর আধিপত্য বোঝাতে চীনের যুদ্ধবিমানগুলো দ্বীপটি প্রদক্ষিণ করতে পারে।

‘চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মি প্রস্তুত’: আমেরিকার পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, ন্যান্সি পেলোসি (তাইওয়ানে এখনও) কোনো ধরনের সফরে যাওয়ার ঘোষণা দেননি। তবে আমেরিকার তৃতীয় ক্ষমতাধর এই রাজনীতিক তাইওয়ান সফর করলে ‘গুরুতর পরিণতি’ ভোগ করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে চীন। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান গত সোমবার বলেন, ‘সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগলিক অখণ্ডতা রক্ষায়’ কঠোর পদক্ষেপ নেবে চীন। তিনি বলেন, যেকোনো পরিণতির দায় নিতে হবে আমেরিকাকে। চীনে বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক যে ব্যাপারে সাধারণত কথা বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কিন্তু মার্কিন স্পিকারের প্রস্তাবিত সফর নিয়ে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কড়া হুমকি শোনা গেছে চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে। চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ট্যান কেফেই গত মঙ্গলবার চায়না ডেইলি সংবাদপত্রকে বলেন, ন্যান্সি পেলোসি তাইওয়ান গেলে চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) চুপ করে বসে থাকবে না, এবং তারা যে কোনো পরিস্থিতির জন্য ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’।

উত্তরদক্ষিণ । ৩০ জুলাই ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

তাইওয়ান ঘিরে এতো উত্তেজনার নেপথ্যে কী: তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের সঙ্গে আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনা চলছে। তাইওয়ান পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপ, যা তাইওয়ান প্রণালীর পূর্বে চীনা মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত। অবশ্য তাইওয়ানকে বরাবরই নিজেদের একটি প্রদেশ বলে মনে করে থাকে বেইজিং। গত বছরের অক্টোবরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছিলেন, মূল ভূখণ্ডের সাথে তাইওয়ানের পুনরেকত্রীকরণ অবশ্যই সম্পূর্ণ করতে হবে। এজন্য সামরিক পথে অগ্রসর হওয়ার বিষয়টিও খোলা রেখেছে বেইজিং। অন্যদিকে চীনের প্রদেশ নয়, বরং নিজেকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র বলে মনে করে থাকে তাইওয়ান। চীনা প্রেসিডেন্টের এমন মন্তব্যের জবাবে সেসময় তাইওয়ান জানায়, দেশের ভবিষ্যৎ তার জনগণের হাতেই থাকবে। তবে তাইওয়ানকে চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে বেইজিংয়ের চেষ্টার কমতি নেই। তাইওয়ান উপত্যাকার চারদিকে সামরিক কর্মকাণ্ড জোরদার করেছে চীন। এমনকি গত বছরের মতো চলতি বছরের শুরু থেকেই তাইওয়ানের এয়ার ডিফেন্স আইডেন্টিফিকেশন জোন (এডিআইজেড) লঙ্ঘন করে আসছে বৈশ্বিক এই পরাশক্তি দেশটি। প্রসঙ্গত, ১৯৪৯ সালে চীনে কমিউনিস্টরা ক্ষমতা দখল করার পর তাইওয়ান দেশটির মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যদিও তাইওয়ানকে বরাবরই নিজেদের একটি প্রদেশ বলে মনে করে থাকে বেইজিং। এরপর থেকে তাইওয়ান নিজস্ব সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading