বাঘ সংরক্ষণের দায়িত্ব আমাদেরই হাতে
আরাফাত রহমান । শনিবার, ৩০ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১২:১৫
বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকায় যে সুদর্শন বাঘ দেখা যায় তা পৃথিবীব্যাপী রয়েল বেঙ্গল টাইগার নামে পরিচিত। রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাঘের একটি বিশেষ উপপ্রজাতি। রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাংলাদেশের জাতীয় পশু। এ ছাড়া নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার ও দক্ষিণ তিব্বতের কোনো কোনো অঞ্চলে এই প্রজাতির বাঘ দেখতে পাওয়া যায়। বাঘের উপপ্রজাতিগুলির মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যাই সর্বাধিক। সমগ্র বিশ্বে বাঘের সংরক্ষণের জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রতিবছর ২৯ জুলাই তারিখে পালন করা হয় বিশ্ব বাঘ দিবস। মুখ্য উদ্দেশ্য হল বাঘের প্রাকৃতিক আবাস রক্ষা করা এবং বাঘ সংরক্ষণের জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে এর সম্পর্কে থাকা ভুল ধারণা ও ভয় দূর করা।
১৯৭০ সাল পর্যন্ত দুই দফায় বনের জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করেন বন্যপ্রাণী তহবিলের ট্রাস্টি গাই মাউন্টফোর্ট। সে সময় বন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বনে বাঘের সংখ্যা তিনশটি। সুন্দরবনে প্রথমবারের মতো বাঘ শুমারি হয় ১৯৭৫ সালে। একটি বেসরকারি গবেষণায় জার্মান গবেষক হেন রিডসে জানান সুন্দরবনে তিনশ ৫০টি বাঘ রয়েছে। ১৯৮৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ পরিচালিত এক জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা তিনশটি উল্লেখ করা হয়। ১৯৯৮ সালে নেপালি বংশদ্ভূত এক আমেরিকান গবেষক সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য নিয়ে চালিত একটি প্রকল্প শেষে বাঘের সংখ্যা তিনশ ৫০টি বলে উল্লেখ করেন।
২০০৪ সালে একটি জরিপ শেষে বন বিভাগ জানায়, সুন্দরবনে বাঘ আছে চারশ ৪০টি। ২০১০ সালে বন বিভাগ এবং ওয়াইল্ড ট্রাস্ট অব বাংলাদেশ যৌথভাবে চালিত বাঘ শুমারির পর জানায়, বনে বাঘের সংখ্যা চারশ থেকে চারশ ৫০টি। ২০১৫ সালে বন বিভাগ অপর একটি জরিপ শেষে ঘোষণা দেয়, সুন্দরবনে বাঘ রয়েছে একশ ছয়টি। তবে ২০১৫ সালের জরিপটিতে অত্যাধুনিক ক্যামেরা ট্রাপিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও আগের প্রায় জরিপই করা হয়েছিল পাগমার্ক বা পায়ের ছাপ পদ্ধতিতে। বাঘ গণনার ক্ষেত্রে যেসব পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় সেগুলোর মধ্যে ক্যামেরা ট্রাপিং পদ্ধতিই বিজ্ঞানভিত্তিক। সর্বশেষ ২০১৮ সালের জরিপ অনুযায়ী এ বনে বাঘের সংখ্যা ১১৪টি।
সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ অরণ্যের বেশিরভাগই বাংলাদেশে অবস্থিত। এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যে পৃথিবীখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারদের অবাধ বিচরণভূমি। তাদের এই অবাধ বিচরণে সীমান্তের কোনো বাধা নেই। ফলে এতদিন বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া মিলিয়ে গোটা সুন্দরবন এলাকায় মোট কতটি বাঘ আছে, তার প্রকৃত তথ্য পাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। বাঘ সংরক্ষণে বিশেষ অগ্রাধিকার কর্মসূচি ও আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরিত প্রটোকল অনুসারে সুন্দরবনের বাঘ রক্ষার জন্য বন বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। চলমান তথ্য-উপাত্ত ও বাঘ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষিতে জানা যায় বাংলাদেশ সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার কোনো সুযোগ নেই। তবে আন্তর্জাতিক ঘোষণা অনুসারে সুন্দরবনে বাঘ ও হরিণের সংখ্যা ধারণ ক্ষমতায় রেখে অবৈধ হরিণ শিকার বন্ধ, আবাসস্থলের উন্নয়ন ও নিয়মিত টহল প্রদান করে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য যথোপযুক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার মধ্যে উভয় সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ, বাঘ ও শিকারি প্রাণী পাচার বন্ধ, দক্ষতা বৃদ্ধি, মনিটরিং ইত্যাদির জন্য একটি প্রটোকল ও একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়েছে। লোকালয়ে আসা বাঘ চেতনানাশক ওষুধ প্রদান করে অন্যত্র স্থানান্তরকরণ ও সংরক্ষণের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে এবং উভয় দেশের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক ও তথ্যাদি আদানপ্রদান হচ্ছে। বাঘ সংরক্ষণে করণীয় কাজের মধ্যে বাঘ ও হরিণ শিকারি এবং ডাকাতের উপদ্রব বন্ধের জন্য র্যাাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড ও বন বিভাগ সমন্বয়ে সমগ্র সুন্দরবনে নিয়মিতভাবে যৌথ অভিযান পরিচালনা; চিহ্নিত বাঘ ও হরিণ শিকারিদের ধরার জন্য গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি; প্রতিটি এলাকায় বন বিভাগের টহল জোরদার; সুন্দরবনের আশপাশে সব ধরনের ভারী শিল্প ও কলকারখানা নির্মাণ বন্ধ রাখা; সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে নৌযান চলাচল হ্রাস করে বিকল্প পথে নৌযান চলাচলের ব্যবস্থা করা এবং বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্ব নিরসন করা উল্লেখযোগ্য।
লেখক- কলামিস্ট
ইউডি/অনিক

