নিরাপদ পানি সংকটের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
আরিফুল পাটোয়ারী । শনিবার, ৩০ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১২:০০
এশিয়া অঞ্চলে সবথেকে নিরাপদ পানি ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশের ৭৩ শতাংশ মানুষ অনিরাপদ পানি পান করছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে ভূগর্ভস্থ পানি কমে গেছে এবং লবণাক্ত পানির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশনে বসবাসরত বেশির ভাগ মানুষ অনিরাপদ পানি পান করছেন। নিরাপদ পানির গুরুত্ব উপলব্ধি করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৭টির মধ্যে প্রথমটিই নির্ধারিত হয়েছে পানিসংশ্লিষ্ট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে বাংলাদেশের মানুষ। বিশুদ্ধ পানির নামে রাস্তাঘাট ও বাজার থেকে আমরা যে পানি কিনে পান করছি তার বেশির ভাগই দূষিত।
আমাদের দেশের প্রায় ৮০ ভাগ পানি শহর ও শিল্পাঞ্চল গুলোর বর্জ্য দ্বারা সরাসরি দূষিত। সাম্প্রতিক সময় গবেষণায় উঠে এসেছে এক কঠিন তথ্য। সেই গবেষণায় জানা গেছে, ঢাকা শহরে ৯৯ শতাংশ ও সারাদেশে ৭৩ শতাংশ মানুষ অনিরাপদ পানি পান করছে। জাতীয় জীবনে টেকসই অর্থনীতি গড়তে গেলে গৃহস্থলীর পানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক পানি নিরাপত্তা, পরিবেশগত পানি নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ সহিষ্ণুতা রোধে পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। নদী দূষণের প্রধান কারণগুলো হলো কলকারখানার বর্জ্য, কৃষিজমিতে অতিমাত্রায় সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা, নদীতে অনিয়ন্ত্রিত বাঁধ নির্মাণ করার ফলে নদীর স্বাভাবিক গতি প্রবাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা সিটির বর্জ্য অপসারণের জন্য খাল গুলো দখল দূষনে জর্জরিত। যদিও বেশ কিছু খাল পুনরুদ্ধার করা হয়েছে কিন্তু প্লাস্টিক পণ্য ও বিভিন্ন বর্জ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গা নদী সহ ঢাকার চারপাশের নদীতে গিয়ে পড়ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নদীর রক্ষা কমিশনকে পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ ও লোকবল নিয়োগের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি পানি দূষণ বন্ধে সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, পরিবেশ অধিদপ্তর, শিল্প মন্ত্রণালয়, নদী রক্ষা কমিশন ও নৌ মন্ত্রণালয় কে একত্রিত করে শক্তিশালী পরিচালনা পরিষদ গঠন করতে হবে।
আমরা মনে করি, বৃহত্তর ব্যবস্থাপনার আগে সুপেয় পানির সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই হবে। সেই পানি নিয়েই এখন চলছে প্রতারণা ও বাণিজ্য। ওয়াসা নগরবাসীর জন্য যে পানি সরবরাহ করছে তার মানও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। ঢাকা ওয়াসা যে পানি সরবরাহ করে থাকে, তাকে পুরোপুরি সুপেয় পানি বলা যাবে না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, ওয়াসা যেসব জায়গাকে পানির উৎস হিসেবে ব্যবহার করে, সেগুলো এতটাই দূষিত যে, পরিশোধনের পরও স্বাভাবিক অবস্থায় আসে না। এছাড়া ওয়াটার ট্রিটমেন্ট পস্নান্টেও (পানি শোধনাগার) পানি সঠিকভাবে পরিশোধন হয় না। আর দুর্গন্ধযুক্ত করতে যে কেমিকেল ব্যবহার করা হয় তা নিয়েও আছে সমস্যা। পরিমাণে বেশি ব্যবহার করলে পানিতে কেমিকেলের গন্ধ থাকে, আর পরিমাণে কম দিলে পানিতে দুর্গন্ধ থাকে। সবকিছু মিলিয়ে পানি সরবরাহের বিষয়টি নিয়ে ওয়াসার আরও যুগোপযোগী চিন্তাভাবনা করার এখনই সময়।
আবার পুরনো পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করায় পানিতে অনেক সময় দুর্গন্ধ পাওয়া যায়। কিছু এলাকায় পাইপলাইনে ফুটা করে অবৈধভাবে পানির লাইন দেয়া হয়েছে। সেসব ফুটা দিয়ে ময়লা-আবর্জনা প্রবেশ করে পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে ফোটানোর পরও সেই পানি বিশুদ্ধ করা যাচ্ছে না।
যদিও ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বরাবরই তাদের সরবরাহ করা পানির মান নিয়ে সব আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়। ওয়াসার পানির পাইপলাইন লিকেজ হয়ে তাতে স্যুয়ারেজ লাইনের ময়লা পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা থাকায় আমরা সাধারণ মানুষ অনেকেই নিরাপদ ভেবে ব্যবহার করছি জারের পানি। কিন্তু সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে, জারের পানি বিক্রি করে বিভিন্ন পানি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান দুই হাতে টাকা আয় করলেও এ পানি জনস্বাস্থ্যের জন্য মোটেই নিরাপদ নয়। আমরা জানি, সব মরণব্যাধির জন্ম দেয় দূষিত পানি। ডায়রিয়া, কলেরা, ক্যানসার, হেপাটাইটিস, টাইফয়েড, ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগের মূল কারণ এই দূষিত পানি। নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা মূলত সরকারের দায়িত্ব। পানির ন্যূনতম মান বজায় রাখতে পানি পরিশোধন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো ও নজরদারির বিকল্প নেই। চালাতে হবে জনসচেতনতামূলক প্রচারণাও। এর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: সমাজ গবেষক
ইউডি/অনিক

