স্বর্ণ চোরাচালান : কার্যকর কঠোর উদ্যোগ কাম্য
হাসনাত করিম । শনিবার, ৩০ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১২:২৫
দেশে কোনোভাবেই স্বর্ণ চোরাচালান রোধ করা যাচ্ছে না। কিছুদিন পর পরই ধরা পড়ছে স্বর্ণের বার। এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এবার আবর্জনার ট্রলি থেকে ১০টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করেছে কাস্টমস। উদ্ধারকৃত স্বর্ণের বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি টাকা বলে জানায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে কাতারের দোহাফেরত বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটের আবর্জনার ট্রলি স্ক্যান করে বারগুলো উদ্ধার করা হয়।
আমাদের দেশের বিমানবন্দরে এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে স্বর্ণের ছোট বড় চালান আসছে, ফাঁক গলে বের হয়ে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে দু’একটি চালান ধরাও পড়ছে। শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেছেন, দেশে স্বর্ণের চাহিদা বছরে ১৬ থেকে ২৬ টন। কিন্তু এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি স্বর্ণ অবৈধ পথে দেশে আসছে। পাঁচটি স্বর্ণের চালান এলেও ধরা পড়ে মাত্র একটি। এ ক্ষেত্রে কাজ করছে বড় ধরনের দেশি ও বিদেশি সিন্ডিকেট। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক চক্র বাংলাদেশকে স্বর্ণ চোরাচালানের বড় ধরনের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। এর আগে এমন খবরও সামনে এসেছে, যাদের চোরাচালান রোধ করার দায়িত্ব তাদের মধ্যেও কেউ কেউ অবলীলায় জড়িয়ে পড়ছে স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের সঙ্গে। চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকটি চক্রের সন্ধান পেয়েছিল গোয়েন্দারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দেশে প্রতিবছর ২৬ টন স্বর্ণের চাহিদা রয়েছে। অথচ গত বছর মাত্র ১০ কেজি স্বর্ণ আমদানি হয়েছে। চাহিদা মেটানোর জন্য বাকি স্বর্ণগুলো অবৈধভাবে এসেছে। স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা শুল্ক গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন, ভ্যাট বেশি হওয়ার কারণে তারা আমদানিতে আগ্রহ পান না। ভ্যাট কমালে ব্যবসায়ীরা সহজে আমদানি করতে পারবে এবং স্বর্ণের দাম ক্রেতাদের ক্রয় ক্ষমতার ভেতরে থাকবে। কিন্তু ভ্যাট কমানোর বিষয়ে নারাজ শুল্ক গোয়েন্দা র্কর্তৃপক্ষ। দেশের উন্নয়নের স্বার্থে ভ্যাট বাড়ানো ছাড়া কমানোর সুযোগ নাই বলে গোয়েন্দারা জানিয়েছেন। শুল্ক গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, স্বর্ণের ওপর মাত্র ৫ শতাংশ ভ্যাট ধরা হয়েছে। অথচ আমদানি করা ওষুধের ওপর ১৭ দশমিক ২৪ শতাংশ ভ্যাট দেয়া হয়। কাপড় কেনা থেকে শুরু করে রেস্টুরেন্টে খাবার খেলেও ভ্যাট দিতে হয়। কিন্তু স্বর্ণে ভ্যাট দিতে চায় না কেউ। ভ্যাটের জন্য অনেকে আমদানি করে না।
বাংলাদেশকে যেভাবে স্বর্ণ চোরাচালানের রুট হিসেবে ব্যবহার করতে চোরাচালানকারীরা তৎপর তা বিভিন্ন সময়ের ঘটনা থেকেই স্পষ্ট হয়। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে বিভিন্ন সময়ে স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়েছে। প্যান্টের ভেতর, কম্বলের ভেতর কিংবা বিমানের টয়লেটে, এমনকি যাত্রীর জুতায়, মানিব্যাগে, লাগেজে, হ্যাঙ্গার গেটে সর্বত্রই পাওয়া গেছে স্বর্ণের বার বিভিন্ন সময়ে। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে তলস্নাশি চালিয়েও উদ্ধার করছে স্বর্ণের বার। দেশের সীমান্ত এলাকায়ও ধরা পড়ছে স্বর্ণের চোরাচালান। আমরা মনে করি, এ ধরনের ঘটনা রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও কঠোর হতে হবে। কেননা, এমন ঘটনা ঘটতে থাকলে তা দেশের জন্য বিপজ্জনক। এটা দেশের ভাবমূর্তিরও প্রশ্ন।
এবারের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। যারা স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত তারা রাতারাতি ধনী হতে চায় এবং তারা দেশ ও জাতির শত্রম্ন, মানুষের শত্রম্ন। কেননা, এর ফলে দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়। যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা মনে করি, এটা খুবই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি এবং এ পরিস্থিতির অবসান হওয়া জরুরি। দেশ থেকে চোরাচালান একেবারেই বন্ধ হোক এমনটি সবার কাম্য। আর সে জন্য সক্রিয় হতে হবে সরকারসহ সংশ্লিষ্টদেরই। আমরা মনে করি, স্বর্ণ চোরাচালানসংক্রান্ত সামগ্রিক পরিস্থিতি আমলে নিতে হবে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সরকারের পরিকল্পিত ও কার্যকর কঠোর উদ্যোগই কেবল পারে স্বর্ণ চোরাচালান রোধ করতে।
লেখক: কলামিস্ট
ইউডি/অনিক

