বায়ুদূষণ : কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণে ভাবতে হবে এখনই
অমিত মজুমদার । শনিবার, ৩০ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১২:৩৫
বায়ুদূষণ কতটা মারাত্মক তা আমাদের ইতোমধ্যে অজানা নয়। কারণ আমরা বায়ুদূষণের সঙ্গে যুদ্ধ করেই এখন বেঁচে আছি। বাংলাদেশ বায়ুদূষণের তালিকায় শীর্ষস্থান অথবা দ্বিতীয়তম অবস্থানে থাকেই। এপ্রিল মাসে প্রথমস্থান হয়েছে বাংলাদেশ। আর শহর হিসেবে ঢাকাও একই আচরণ করে। কখনো দিলিস্নর সঙ্গে পালস্না কখনো পেশওয়ারের সঙ্গে। মোটামুটি প্রথম-দ্বিতীয় অবস্থানে থাকেই। এ থেকে উত্তরণের উপায় কি তাও আমাদের হর্তাকর্তারা আজ বের করতে পারছে না। এখন প্রতিটা শহরে শহরে কাজ করতে হবে বায়ুদূষণ রোধ করার জন্য।
বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ হচ্ছে যানজট। যানজটের মাধ্যমে শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ দুটোই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া অপরিকল্পিতভাবে শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠার মাধমেও বায়ুদূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সঙ্গে রাস্তার ধুলোবালু আছেই। যা বাতাসের সঙ্গে মিশে গিয়ে আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসে চলে যায়। এ ছাড়া সড়কের গাড়িগুলোতে এখনো রয়েছে কালো বিষাক্ত ধোঁয়া। যা বায়ুদূষণে মারাত্মক প্রভাব রাখে। বায়ু দূষণের কারণে পরিবেশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যাচ্ছে, সেই গরম ঠান্ডা করার জন্য মানুষ অতিরিক্ত এসি ব্যবহার করছে, আবার তাতেও বায়ুদূষণ বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি বায়ুদূষণের ফলে স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, হার্ট অ্যাটাক, ফুসফুস ক্যানসার এবং ফুসফুসের রোগে বছরে প্রায় লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। বায়ুদূষণের ফলে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে অন্তত ১.২৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্বজুড়ে একযোগে প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৯’ প্রতিবেদন তৈরি করার সময় ১৯৯০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিশ্বে বায়ুর গুণগতমান বিষয়ক তথ্য নিয়ে এ গবেষণা করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণযুক্ত পরিবেশে কোনো শিশু বেড়ে উঠলে তার গড় আয়ু ৩০ মাস (২.৫ বছর) পর্যন্ত কমে যেতে পারে। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত এলাকা রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়। মৃত্যুযঝুঁকির অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে বিশ্বব্যাপী বায়ুদূষণ মৃত্যুর জন্য অধিকতর দায়ী। বায়ুতে যে সব ক্ষতিকর উপাদান আছে, তার মধ্যে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক উপাদান হচ্ছে পিএম ২.৫ (২.৫ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়ে ছোট ব্যাসের বস্তুকণা)। এশিয়ায় বায়ুর গুণমান অনেক খারাপ। বিশেষ করে বাংলাদেশের জনগণ ১৯৯০ সাল থেকে পিএম ২.৫ মাত্রার মধ্যে বসবাস করছে। বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ ৭৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পরিবেশ বিষয়ক এক সেমিনারে তথ্য পাওয়া যায়। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনসহ পরিবেশ নিয়ে কাজ করা কয়েকটি বেসরকারি সংগঠন আয়োজিত ওই সেমিনারে বায়ুদূষণজনিত কারণে বাংলাদেশের মানুষের মৃত্যুর এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বায়ুদূষণের ফলে শুধু এশিয়াতেই প্রতিবছর মৃত্যুবরণ করেন ২৬ লাখ মানুষ। এবং এই কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতি ৮ জনের মধ্যে ১ জনের মৃত্যু হয়ে থাকে। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের পর সবচেয়ে বায়ুদূষণে দূষিত দেশ বাংলাদেশ। এ গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুতে পিএম ২.৫ উপাদানের কারণে বিশ্বে তিন মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণের কারণে মানুষের তৎক্ষণাৎ বা দ্রম্নত মৃত্যু হয় না। বরং এটা এক ধরনের নীরব ঘাতক। মানুষের মৃত্যুর দশটি কারণের মধ্যে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে এই বায়ুদূষণ। গত ৩০ বছরে পানি এবং পয়ঃনিষ্কাশনজনিত মৃত্যুহার কমলেও বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুহার বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বায়ুদূষণের কারণে আমাদের দেশের অর্থনীতিতেও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে বিশেষ করে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে। তাই বায়ুদূষণ থেকে দেশকে এবং দেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে অবশ্যই এ বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে ভাবতে হবে প্রত্যেককেই। ঢাকাকেন্দ্রিক ভাবনা বাদ দিয়ে চট্টগ্রামসহ দেশের সব জেলার পরিবেশ নিয়ে ভাবতে হবে। ঢাকার পরে বায়ুদূষণ চরম আকার ধারণ করেছে চট্টগ্রামে। তাই এটাকে সহজ বিষয় হিসেবে না নিয়ে এ দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। এ ছাড়া পরিবেশবাদী সব সংগঠনের প্রতি অনুরোধ লোক দেখানো কাজ বাদ দিয়ে আপনার এলাকার পরিবেশ সার্বক্ষণিক সুন্দর দূষণমুক্ত রাখুন আগে। একদিনের সৌন্দর্য দিয়ে কিছুই হয় না। মানুষকে বায়ুদূষণ নিয়ে সচেতন এবং কঠোর হতে পরামর্শ দিতে হবে।
বায়ুদূষণ রোধে জনসচেতনতাই মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারে। যেহেতু দেশ আমাদের, তাই দূষণ রোধের দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে। সারাদেশে পরিবেশ অধিদপ্তর আছে, পরিবেশবাদী সংঘঠন আছে, স্থানীয় প্রশাসন রয়েছে, রয়েছে পাড়া-মহলস্না-ওয়ার্ডভিত্তিক সামাজিক কমিটি। এই দায়িত্ব তো তাদের। এখানে সামাজিক আন্দোলন আর প্রতিরোধের বিকল্প নেই। সামাজিক সংঘঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে দূষণের বিরুদ্ধে এবং প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। এ সব আন্দোলনে পরিবেশবাদী ও প্রশাসনকে সহযোগিতা দিতে হবে। তাহলে কিছুটা হলেও আশা করা যায় দূষণের যন্ত্রণা থেকে সমাজ ও মানুষ রেহাই পাবে। সবাই যদি সচেতন হই, তবে দূষণমুক্ত দেশ গড়াও অসম্ভব কিছু নয় বলে আমার বিশ্বাস। সেই সঙ্গে কঠোর হাতে আইনের প্রয়োগ করতে হবে যাতে বায়ুদূষণের মাত্রা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়। তাই এ বিষয়ে প্রশাসন এবং সরকারের বিশেষ ভূমিকা থাকা আবশ্যক।
লেখক- কলামিস্ট
ইউডি/অনিক

