রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ: সংকটের সমাধান কোন পথে
রায়হান আহমেদ । সোমবার, ০১ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১০:২০
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে সারা বিশ্বেই জ্বালানি থেকে ভোজ্যতেল-সবকিছুরই দাম ঊর্ধ্বমুখী। ইউক্রেনের ৬৯ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। রাশিয়া হুমকি দিয়েছিল, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই কিয়েভ দখল করে তাঁবেদার সরকার গঠন করবে। কিন্তু রাশিয়া কিয়েভ দখল করতে পারেনি। পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুসারে, ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিরোধের মুখে রাশিয়া কিয়েভ দখলের পরিকল্পনা থেকে পিছু হটেছে। কিন্তু সর্বশেষ যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে মনে হচ্ছে, রাশিয়া কিয়েভ দখল করতে পারেনি না বলে বলা উচিত কিয়েভ দখল করেনি। আদৌ কিয়েভ দখলের পরিকল্পনা ছিল মনে হচ্ছে না। প্রকৃতপক্ষে রাশিয়ার ফাঁদে পা দিয়েছে পশ্চিমারা। ইউক্রেনের যুদ্ধ নিয়ে এমন নানা ধরনের তথ্য পাই আমরা।
সবকিছু বিবেচনা করেই রাশিয়া কৃষ্ণসাগরে ন্যাটোর প্রভাব আর বাড়তে দিতে রাজি না। ইতোমধ্যেই কৃষ্ণসাগরের তীরবর্তী দেশ রোমানিয়া ও বুলগেরিয়া ন্যাটোভুক্ত হয়েছে। ইউক্রেনের অন্তর্ভুক্তি রাশিয়াকে আরো কোণঠাসা করে দেবে। তাই রাশিয়া কিয়েভ দখলের হুমকি দিলেও কার্যত ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চল দখল করেছে। ওই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে এখন ওডিসার দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। এ মুহূর্তে আজভ সাগর এবং কৃষ্ণসাগর বরাবর দক্ষিণাঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকা রাশিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে। যদি রাশিয়া ক্রিমিয়ার মতো এই অঞ্চলটিকেও নিজের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারে, তাহলে পশ্চিমের খেরাসন থেকে মারিউপোল এবং সীমান্তের ওপারে রুশ শহর রোস্তভ-অন-দন পর্যন্ত বিস্তৃত শহরগুলোকে সংযুক্ত করবে। যে প্রধান শহরটি এখন পর্যন্ত রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে নেই কিন্তু যার নিয়ন্ত্রণ নিতে রাশিয়া মরিয়া হয়ে উঠেছে, সেটি হলো ওডিসা। মারিউপোল দখল করার পর লুহানস্ক এবং দনবাস অভিযানের সময় রুশ বাহিনী শুধু দক্ষিণে খেরসনের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকায় একটি অভিযান পরিচালনা করেছে। কিন্তু রাশিয়ার জন্য দনবাসকে সংযুক্ত করতে আরো বড় ধাক্কা দিতে হবে। ওডিসার ওপর স্থল আক্রমণের সম্ভাবনা বাড়াতে হবে। এটি বুঝেই ইউক্রেন দক্ষিণাঞ্চলে রুশ পদক্ষেপ ঠেকাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী রাশিয়ান কমান্ড সেন্টার এবং অস্ত্র ডিপোতে ভয়ংকর এইচআইএমএআরএস আক্রমণ চালিয়েছে। তবে ইউক্রেনের রিপোর্ট অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের প্রায় ৮০ শতাংশ সামনের সারির (ফ্রন্টলাইন) যোদ্ধা নিহত, আহত বা যুদ্ধ থেকে ছিটকে পড়েছে। প্রেস রিপোর্ট বলছে, ইউক্রেনের যুবকদের মধ্যে সামরিক বাহিনীতে যোগদানের উৎসাহ কম। অনেকেই দেশ ছেড়েছেন। নতুন যাদের সেনা হিসেবে আনা হচ্ছে, তাদের মূল যোদ্ধাদের মতো প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা নেই। একইভাবে যুদ্ধে নিহত বিপুলসংখ্যক রাশিয়ান সেনার স্থলে রাশিয়া যাদের প্রতিস্থাপন করছে, তারাও আনাড়ি গোছের সেনা। যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে যুদ্ধে টিকে থাকার এবং মস্কোর সঙ্গে আলোচনা না করার জন্য উৎসাহিত করে চলেছে। এ অবস্থায় মনে হচ্ছে রাশিয়া লুহানস্ক এবং দনবাসকে একীভূত করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে এবং তা করতে পারলে তারা সেই অঞ্চলগুলোকে রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করবে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এই মুহূর্তে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের রূপ নেওয়ার প্রবল শঙ্কা রয়েছে। যদি কোনোভাবে ইউক্রেনীয়রা রাশিয়ান সেনাবাহিনীকে কাবু করতে পারে, তাহলে দখল করা শহরগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখাও তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে। সময়ের সাথে সাথে ও পশ্চিমাদের সহায়তায় ইউক্রেনের বাহিনী আরো কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। বহু বছরের যুদ্ধের পর ইউক্রেন ছাড়তে বাধ্য হবে রাশিয়ান বাহিনী। পরাজয়ের মুখোমুখি হয়ে ভ্লাদিমির পুতিন যদি মলদোভা ও জর্জিয়ার মতো ন্যাটোর বাইরে থাকা সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোতে সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন, তবে সেক্ষেত্রে এই যুদ্ধ সমগ্র ইউরোপব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে। অথবা শুধুনাত্র হিসেবে গরমিলের কারণেও যুদ্ধ গড়াতে পারে আরো বাজে পরিস্থিতির দিকে। ভ্লাদিমির পুতিনের আলোচনার টেবিলে বসার সিদ্ধান্ত থেকে আন্দাজ করা যায় যে তিনি অন্তত সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে প্রস্তুত আছেন। যুদ্ধের ফলাফল যদি তার বিরুদ্ধে যায়, তাহলে পরাজয়ের লজ্জা বহন করা তার জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে শ্রেয় হতে পারে, এমন ভেবে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের দিকে অগ্রসর হতে পারেন।
লেখক: গবেষক।
ইউডি/সুস্মিত

