সঞ্চয়ের হার হ্রাস অর্থনীতির জন্য শুভ লক্ষণ নয়

সঞ্চয়ের হার হ্রাস অর্থনীতির জন্য শুভ লক্ষণ নয়

মাহবুব উল্লাহ্ । সোমবার, ০১ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১১:১০

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে একটি দেশের জাতীয় সঞ্চয়ের ওপর। জাতীয় আয়ের যে অংশ ভোগ করা হয় না, সেটাই সঞ্চয়। সঞ্চয় না থাকলে বিনিয়োগ করাও সম্ভব হয় না। সঞ্চয়কে একটু ভিন্নভাবে দেখা হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান ভোগ হ্রাস ভবিষ্যতে ভোগ বৃদ্ধির জন্য কাজে আসে। ভোগ হ্রাসের পন্থা দুরকমের হতে পারে। বর্তমান আয় থেকে স্বাভাবিকভাবে যে উদ্বৃত্ত তৈরি হয় সেটি আমরা ব্যবহার করতে পারি বিনিয়োগ করে। বিনিয়োগ করার ফলে যে আয় হয়, সেই আয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ঘটায়। আবার অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে যে উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হয় তার পরিমাণ ভোগের মাত্রা হ্রাস করে সঞ্চয় বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়। এরকম ক্ষেত্রে বাড়তি সঞ্চয় অধিকতর বিনিয়োগের মাধ্যমে অধিকতর প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যায়।

সঞ্চয়ের হার কী হবে বা কতটুকু হবে তা নির্ভর করে জাতীয় বৈশিষ্ট্যের ওপর। আমরা আগাখানী বা ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ের কথা জানি। এই সম্প্রদায়টি প্রধানত ব্যবসানির্ভর। ব্যবসায় টাকা খাটিয়ে এরা আয়-রোজগার করে। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ের ভোগস্পৃহা সম্পর্কে এক ধরনের প্রবাদ আছে। তারা বাসস্থানের জন্য নিজ আয় ব্যবহার করতে চায় না। তারা মনে করে, যে অর্থ বাড়ি নির্মাণে ব্যবহার করতে হয় সেই অর্থ ব্যবসার কাজে লাগালে বেশি করে আয়-লাভ সম্ভব হয়। দেখা গেছে তারা ভাড়া বাড়িতে বাস করে। সমাজতাত্ত্বিকরা দেখতে পেয়েছেন, অভিবাসী গোষ্ঠী একদিকে যেমন উদ্যোগী হয়, অন্যদিকে তেমনি বিনিয়োগ করে নিজেদের আয় বৃদ্ধি করে। বিশ্বের ইহুদি সম্প্রদায়ের নিজস্ব কোনো আবাসভূমি ছিল না। তাদের আবাসভূমি হিসাবে ফিলিস্তিনের একটি অংশ দিয়ে ইসরাইল রাষ্ট্রটি তৈরি করা হয়েছে। ইসরাইলিরা ফিলিস্তিনিদের ওপর বর্বর অত্যাচার অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে! ইসরাইল রাষ্ট্রটি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ।

২০২১-২২ অর্থবছরে সঞ্চয়ের হার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাওয়ায় ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিনই হবে। প্রবৃদ্ধির হার আবার পুঁজি-উৎপাদনের অনুপাতের ওপর নির্ভর করে। যেসব দেশ দক্ষভাবে পুঁজি ব্যবহারে সক্ষম, সেসব দেশ উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায় এটা হলো ক্যাপিটাল-আউটপুট রেশিও। বাংলাদেশে পুঁজির সর্বোত্তম ব্যবহার হয় না। এর কারণ অতিমাত্রায় সম্পদের অপচয় ও দুর্নীতি। পুঁজি ব্যবহার ব্যবস্থাপনায়ও অনেক ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে। যদি অপচয় রোধ করা যায়, দুর্নীতি প্রতিহত করা যায় এবং ব্যবস্থাপনার মান উন্নত করা যায়, তাহলে এক বা দুই শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে। এক কথায় বলা যায়, প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছে। প্রকৃত আয় হ্রাস পাওয়ার ফলে সঞ্চয়ও কমে গেছে। সঞ্চয় সম্পর্কে আমরা কিছু ধারণা পেতে পারি সঞ্চয়পত্র বিক্রি এবং ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ থেকে। পূর্ববর্তী বছরের জুলাই মাস থেকে পরবর্তী বছরের ২০২১ সালে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল ৩৭,৩৮৫ কোটি টাকার। পরবর্তী ২০২২-এর একই সময়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল ১৮,১৫৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ সঞ্চয়পত্র বিক্রি হ্রাস পেয়েছে ৫০ শতাংশের মতো।

একইভাবে পূর্ববর্তী বছরের জুলাই থেকে মে ২০২২ পর্যন্ত আমানত ৮৬,১১১ কোটি টাকার নতুন আমানত সৃষ্টি হয়। প্রবৃদ্ধির হার মাইনাস ৩৯.৯৭ শতাংশ। এসব তথ্য থেকে বিশেষ করে ব্যক্তি খাতে সঞ্চয়ের পরিমাণ সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায় না। ব্যাংক আমানত এবং সঞ্চয়পত্রের বাইরে ব্যক্তি, পরিবার এবং সংস্থার হাতেও সঞ্চয় থাকে। বাংলাদেশের মতো দেশে সঞ্চয়ের স্বরূপ বিচার করতে গেলে দেখা যাবে এদেশের মানুষ বহু ধরনের অ-অর্থায়িত সঞ্চয় করে থাকে। সর্বশেষ হিসাব থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৪৬৫ বিলিয়ন ডলার। দেখা যাচ্ছে, জিডিপির আকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে জাতীয় সঞ্চয় বাড়েনি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন সঞ্চয়ের হার বৃদ্ধি, অপচয় ও দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং প্রাপ্ত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার। সঞ্চয় কেন কমছে, তার একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা প্রয়োজন। সেই ব্যাখ্যা আসতে পারে সুচিন্তিত গবেষণা থেকে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading