মাঙ্কিপক্স: পুরোনো রোগের নতুন বৈশ্বিক প্রাদুর্ভাব

মাঙ্কিপক্স: পুরোনো রোগের নতুন বৈশ্বিক প্রাদুর্ভাব

আবিদুর রহমান । সোমবার, ০১ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১০:৫০

মাঙ্কিপক্স একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। এর প্রকোপ দেখা যায় মূলত আফ্রিকা মহাদেশের কিছু দেশে। মে মাসের শুরুতে যুক্তরাজ্যে নাইজেরিয়াফেরত এক ব্যক্তির শরীরে মাঙ্কিপক্স ভাইরাস ধরা পড়ে। মে মাসের শেষ পর্যন্ত আফ্রিকার বাইরের কমপক্ষে ২০টি দেশে নিশ্চিত এবং সম্ভাব্য মিলিয়ে চার শতাধিক মাঙ্কিপক্স রোগীর খবর পাওয়া যায়। ১৯৭০ সালে মানবদেহে মাঙ্কিপক্স প্রথম শনাক্ত হয়। তখন থেকে এ পর্যন্ত আফ্রিকার বাইরে এটিই এ রোগের সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব।

১৯৫৮ সালে ল্যাবরেটরিতে বানরের শরীরে এই ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয়। এ জন্যই এর নাম দেওয়া হয়েছিল মাঙ্কিপক্স। কিন্তু বানর থেকে নয়, ধারণা করা হয়, ভাইরাসটি মানুষের দেহে আসে ইঁদুরজাতীয় প্রাণী বা অন্যান্য বন্য প্রাণী থেকে। প্রতিবছর মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকায় কয়েক হাজার ব্যক্তি মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত হন। আফ্রিকার বাইরেও সংক্রমণ হতো। কিন্তু তার সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সেসব রোগীর প্রায় সবাই আফ্রিকাভ্রমণে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু এ বছর আর এই হিসাব মিলছে না। বেশির ভাগই আফ্রিকায় না গিয়েই আক্রান্ত হয়েছেন। আফ্রিকার বাইরে মাঙ্কিপক্সের এই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারটাই বিশেষজ্ঞদের কপালে ভাঁজ এনে দিয়েছে।

মাঙ্কিপক্স ভাইরাস অর্থোপক্সভাইরাস গণের সদস্য। এই গণের অন্যতম সদস্য গুটিবসন্তের ভাইরাস। মাঙ্কিপক্সের দুটি স্ট্রেইন দেখা যায় পশ্চিম আফ্রিকান স্ট্রেইন আর মধ্য আফ্রিকান বা কঙ্গো বেসিন স্ট্রেইন। মে মাসে আফ্রিকার বাইরে পাওয়া ভাইরাসের জিন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ওই ভাইরাসের পশ্চিম আফ্রিকান স্ট্রেইনের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। এই স্ট্রেইনে লক্ষণ যেমন মৃদু, তেমনি মৃত্যুহার ১ শতাংশের কম। অন্যদিকে মধ্য আফ্রিকান স্ট্রেইনের ক্ষেত্রে মৃত্যুহার ১০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বেশির ভাগই শিশুমৃত্যু। অন্যান্য পক্স বা বসন্ত রোগের ভাইরাসের মতোই মাঙ্কিপক্স। এর অন্যতম লক্ষণ হচ্ছে র‌্যাশ বা ফুসকুড়ি। ভাইরাস সংক্রমণের ৫ থেকে ২১ দিন পর দেখা দেয় জ্বর, মাথাব্যথা, লসিকাগ্রন্থি ফুলে যাওয়া, মাংসপেশিতে ব্যথার মতো লক্ষণ। জ্বর শুরুর এক থেকে তিন দিনের মধ্যে প্রথমে মুখে এবং পরে সারা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা যায়। সেগুলো ধীরে ধীরে বড় হয় এবং তরলে পূর্ণ হয়ে ওঠে। এই তরলে প্রচুর ভাইরাস থাকে। মাঙ্কিপক্সের ক্ষেত্রে ফুসকুড়িগুলো প্রায় একই সঙ্গে বড় হতে থাকে।

মাঙ্কিপক্স ছড়ায় মূলত রোগীর ফুসকুড়ি থেকে। রোগীর ফুসকুড়ি ওঠা থেকে শুরু করে সেটি বড় হওয়া এবং দুই থেকে চার সপ্তাহ শেষে সেটি পুরোপুরি শুকিয়ে গিয়ে নতুন করে চামড়া ওঠার আগপর্যন্ত মাঙ্কিপক্স রোগী থেকে এই রোগ ছড়াতে পারে। এ ছাড়া রোগীর কফ ও লালা থেকেও এ রোগ ছড়ায়। রোগীর সরাসরি সংস্পর্শে আসা ছাড়াও রোগীর ব্যবহার্য জিনিসপত্র, যেগুলো রোগীর ফুসকুড়ি, কফ, লালার সংস্পর্শে আসে, সেগুলো থেকেও অন্য কেউ আক্রান্ত হতে পারে। তা ছাড়া মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত প্রাণী থেকেও কোনো ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারেন। আবার মানুষ থেকে অন্য প্রাণীতেও সংক্রমণ সম্ভব। তাই মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত ব্যক্তি যত দিন রোগের লক্ষণ প্রকাশ করছেন, তাঁকে আলাদা করে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁর ব্যবহার্য জিনিসপত্র, বিছানার চাদর আলাদাভাবে পরিষ্কার করতে হবে এবং ঘরে পোষা প্রাণী থাকলে সেগুলোকেও রোগী থেকে দূরে রাখার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

কোভিড-১৯ পরিস্থিতি বিশ্বকে কতটা বিপর্যস্ত করেছে বলার অপেক্ষা রাখে না। সাম্প্রতিক সময়ে আবার নতুন আতঙ্ক ছড়িয়েছে মাঙ্কিপক্স সংক্রমণ- যা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের। এ ক্ষেত্রে বলা দরকার, মাঙ্কিপক্স আক্রান্ত কোনো রোগী এখনো দেশে পাওয়া যায়নি। কিন্তু আমলে নেওয়া জরুরি যে, পাশের দেশ ইন্ডিয়ায় এই রোগে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। এছাড়া এটাও বিশেষভাবে লক্ষণীয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও ইতোমধ্যে সতর্কতা জারি করেছে। বাংলাদেশের প্রতিটি স্থল ও বিমানবন্দরগুলোতে সতর্কতা জারি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক ও সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা সিডিসি। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোকে সন্দেহভাজন রোগীদের আইসোলেশনে রাখার নির্দেশনা দিয়েই নিজেদের কাজ শেষ করেছে তারা। আমরা মনে করি, সামগ্রিক পরিস্থিতি আমলে নিয়ে যত দ্রম্নত সম্ভব যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে সংশ্লিষ্টদেরই।

লেখক: শিক্ষার্থী, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading