ওষুধের বাজারমূল্য জনগণের নাগালের মধ্যে থাকুক
আবু জাফর সাদেক । বৃহস্পতিবার, ০৪ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১০:৫০
দ্রব্যমূল্যের বাজার অনিয়ন্ত্রিত। বাজারে কোনো পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল নেই। সব ধরনের পণ্যমূল্য নাগালের বাইরে। যতই দিন যাচ্ছে সাধারণ জনগণের খেয়েদেয়ে বেঁচে থাকা অনেকটা কষ্টকর হচ্ছে। আয় ও ব্যয় কোনোভাবেই হিসাব মেলাতে পারছে না জনগণ। শিল্পপতি ব্যবসায়ী আর সরকারি চাকরিজীবীরা ভালো আছে বলে মনে হয়। মধ্যবিত্ত পরিবার, নিম্নবিত্ত মধ্যম আয়ের মানুষগুলো মোটেও ভালো নেই। নিম্নবিত্ত মানুষ, দিনমজুর রোজগারকারী জনগণ বাজারে গেলে পরিস্থিতি দেখে হিমশিমের মধ্যে পড়ে যায়। চাল কিনলে ডাল কিনতে পারে না। তেল কিনলে মাংস কিনতে পারে না। সাধারণ মানুষের কষ্টের জীবন বাজারে গেলে বোঝা যায়।
এর মধ্যে ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি বাজারে বাস্তবায়ন হয়ে গেছে। ১০ টাকার ওষুধের মূল্য ১৫ টাকা। ৫৫ টাকার ১০টি ট্যাবলেটের মূল্য ৭৫ টাকা। এভাবে সব ধরনের রোগের ওষুধের মূল্য ফার্মেসিগুলো বাড়িয়ে নিচ্ছে। রোগের জন্য ওষুধ খেতেই তো হয়। জটিল ও কঠিন রোগের মানুষের জন্য ডাক্তারের চিকিৎসামতো ওষুধ খাওয়ার বিকল্প কিছু নেই। কিন্তু ইতোমধ্যেই কোনো কোনো ওষুধ ক্ষেত্র বিশেষে দ্বিগুণ পর্যন্ত করা হয়েছে। যা মারাত্মক অন্যায়। প্রতিবেদনে প্রকাশ, স্বাস্থ্যসেবায় বহুলভাবে ব্যবহারযোগ্য ৫৩টি ব্র্যান্ডের ওষুধের দাম বাড়ানো হয়েছে। প্যারাসিটামলজাতীয় ওষুধের দাম শতভাগ বাড়ানো হয়েছে। এভাবে প্রায় সব ধরনের ওষুধের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।
গবেষণায় প্রকাশ, সারা বিশ্বেই বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ মনে করেন, ওষুধের প্রকৃত মূল্য যা হওয়া উচিত, বিক্রিমূল্য তার চেয়ে অনেক বেশি। আর ওষুধ প্রস্তুতকারীরা বলেন, অন্য অনেক শিল্পের তুলনায় গবেষণা ব্যয় বেশি হওয়ায় আপাতদৃষ্টিতে ওষুধের মূল্য বেশি মনে হলেও তা যুক্তিসংগত।
এদেশের একজন ভোক্তা হিসাবে ওষুধের মূল্যবৃদ্ধিতে আমিও উদ্বিগ্ন। আমাদের চিকিৎসা ব্যয়ের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ নিজেদের পকেট থেকে ব্যয় হয়, বাকি ৩০ বা ৪০ শতাংশ আসে সরকার বা অন্যান্য উৎস থেকে। দেশে পরিবারপ্রতি যা আয় হয়, তার প্রায় ৭ থেকে ১০ শতাংশ চিকিৎসা খাতে ব্যয় হয়, অর্থাৎ অতিপ্রয়োজনীয় ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ব্যক্তি আয়ের ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব রাখবে।
এ ব্যাপারে দেশের ওষুধ শিল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামাল, মোড়ক সামগ্রী ও এক্সসিপিয়েন্টসের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, আকাশ ও জলপথে আকাশচুম্বী পরিবহণ ব্যয়, ডলারের দামবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে তাদের পক্ষে মূল্যবৃদ্ধি ছাড়া বিকল্প নেই। যেহেতু কাঁচামাল শিল্পে আমরা এখনো আঁতুড়ঘড়েই আছি, তাই আপাতত এ অবস্থা মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প দেখছি না। আগামীতে আমরা যখন একটি পরিপূর্ণ কাঁচামাল শিল্প পাব, তখন ওষুধের দাম অনেকটাই নাগালের মধ্যে চলে আসবে।
যা হোক, এ শিল্পের সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত থাকার সুবাদে অন্য আরেকটি বিষয় আরও বেশি ভাবাচ্ছে, যা হলো আগামীতে দেশের এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী ওষুধের দাম। স্বল্পোন্নত দেশ হিসাবে আমরা দীর্ঘদিন ওষুধের মেধাস্বত্ব আইনের আনুকূল্য পেয়ে আসছি, অর্থাৎ কোনো দেশে কোনো ওষুধ আবিষ্কৃত হলে এবং তা পেটেন্টেড থাকলেও বাংলাদেশে ওই ওষুধ তৈরি ও বাজারজাত করা যাবে। সাধারণভাবে এই মেধাস্বত্ব আনুকূল্য ২০৩৩ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকার কথা; তবে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসির পরবর্তী ধাপে গেলে কী হবে তা এখনই বলা কঠিন।
মেধাস্বত্ব আইনের আনুকূল্য উঠে গেলে চাইলেই বাংলাদেশ সহজে কোনো পেটেন্টেড ওষুধ তৈরি ও বাজারজাত করতে পারবে না। এজন্য আবিষ্কারক কোম্পানির অনুমতি নিতে হবে, যেখানে উচ্চমূল্যের রয়ালটির প্রশ্ন থাকবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে আনুমানিক প্রতি পাঁচটি ওষুধের একটি অন্য কোনো দেশে পেটেন্টেড। এ অবস্থা দেশে নির্দিষ্ট রকমের ইনসুলিন, বায়োলজিক, হরমোন, কার্ডিওভাসকুলারসহ অনেক জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দামবৃদ্ধি ও রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এজন্য অতি দ্রুত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
এ সমস্যার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হিসাবে অফ পেটেন্টেড প্রোডাক্ট বা নিউট্রাসিউটিক্যাল প্রোডাক্টের ওপর বিশেষ মনোনিবেশ করলে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। কারণ এ দুটি ক্ষেত্রে নিয়মনীতি অপেক্ষাকৃত শিথিল। সরকার চাইলে কম্পালসরি লাইসেনসিংয়ের ব্যাপারেও কথা বলতে পারে। উল্লেখ্য, কম্পালসরি লাইসেনসিং হলো একটি বিশেষ ব্যবস্থা, যেখানে সরকার প্রয়োজন অনুসারে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে পেটেন্টেড কোনো ওষুধ পেটেন্টসংশ্লিষ্ট কোম্পানির অনুমোদন ব্যতিরেকে উৎপাদনের অনুমতি দিতে পারে। স্থানীয় জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি ও সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষণানির্ভর কোম্পানির সঙ্গে যৌথ অংশীদারি ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে, যা দুই পক্ষের জন্যই লাভবান হবে।
সাধারণ মানুষের আয়-ইনকামের চিন্তা করে অপরাপর প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের মতো ওষুধের বাজারমূল্য অবশ্যই জনগণের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে। সরকারকে অনুরোধ করব আমজনতার চিকিৎসা এবং ন্যায্যমূল্যে ওষুধ সরবরাহ ও প্রাপ্তিতে যেন জনগণের কথা চিন্তা করা হয়। সঙ্গে ভেজাল ও মানহীন মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। স্বাস্থ্য সুখের মূল। সুন্দর জাতি, সুস্থ জাতি দেশের সম্পদ এ প্রতিপাদ্য বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জনমতের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি প্রতিহত করতে হবে।
লেখক: ফার্মাসিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

