টাইগারদের হতাশজনক পারফরম্যান্স: টি-টোয়েন্টি কী খুবই কঠিন?

টাইগারদের হতাশজনক পারফরম্যান্স: টি-টোয়েন্টি কী খুবই কঠিন?

উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ০৪ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১০:৩০

ক্রিকেটের সবচেয়ে নবীন ও আকর্ষণীয় ফরম্যাট হলো টি-টোয়েন্টি। দেশভিত্তিক ফ্র্যাঞ্চাইজি লীগের কল্যানে এই ফরম্যাটের জনপ্রিয়তা এতই বেড়েছে যে বিশ্বের বহু দেশ এখন ক্রিকেটে আগ্রহ দেখাচ্ছে। অথচ, ক্রিকেট বিশ্বের শীর্ষ দলগুলোর একটি হয়েও এই ফরম্যাটে যেন ধীরে ধীরে খেই হারিয়ে ফেলছে বাংলাদেশ। গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে সদ্য সমাপ্ত জিম্বাবুয়ে সিরিজ পর্যন্ত ১৫ ম্যাচে টাইগারদের মাত্র ২ জয় সেটাই জানান দেয়। তাহলে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট কী খুবই কঠিন, প্রশ্ন থেকে যায়। বিস্তারিত লিখেছেন আসাদুজ্জামান সুপ্ত

ক্রীড়াঙ্গনের সফলতা একটি দেশকে বিশ্বে তুলে ধরার ও পরিচয় বহন করার পাথেয় হিসেবে কাজ করে। বিশ্বের অনেক ছোট কিংবা অপরিচিত দেশকে আমরা খুব সহজেই চিনতে পেরেছি এই ক্রীড়াঙ্গন দ্বারাই। বাংলাদেশও ক্রীড়াঙ্গনের মাধ্যমে বিশ্বে ব্যাপকভাবেই নিজেদের পরিচয় জানান দিয়ে আসছে। এর মধ্যে আমাদের মূল মেরুদন্ড হচ্ছে ক্রিকেট। ক্রিকেট দিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় লাল-সবুজের পতাকা বারবার আলোচনায় এসেছে, সুনাম কুড়িয়েছে। বলা হয় অলিম্পিক ও ফুটবলের পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় খেলার আসর ক্রিকেট তথা আইসিসি বিশ্বকাপ। সেখানেও আমাদের দেশ ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। ক্রিকেটের সবচেয়ে প্রবীণ ফরম্যাট সাদা পোশাকের টেস্টের মর্যাদা পেয়েছি আমরা ২০০০ সালে। সেখান থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এই ফরম্যাটে আশানুরূপ কিছু করা না গেলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরম্যাট একদিনের ম্যাচে (ওয়ানডে) বিশ্ব ক্রিকেটের এক শক্তিশালী দল এখন বাংলাদেশ। কিন্তু বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফরম্যাট টি-টোয়েন্টিতে যে আমাদের পারফরম্যান্স খুবই নাজুক। আমাদের চেয়েও যারা কম ক্রিকেট খেলে কিংবা নতুন এসেছে তারাও এই ফরম্যাটে আমাদের চেয়ে ঢেড় এগিয়ে। তাহলে সমস্যা কোথায়, কেনই না বাংলাদেশ এই ফরম্যাটে ভালো করছে না। ক্রিকেট বিশ্লেষকরা বলছেন সঠিক পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের অভাবই হচ্ছে মূল কারন।

নাজমুল হাসান পাপন

২০০৬ থেকে ২০২২ যাত্রার আদ্যোপান্ত: ২০০৬ সাল থেকে টি-টোয়েন্টিতে নিয়মিত খেলছে বাংলাদেশ। অথচ খেলাটা এখনও আয়ত্তেই আনতে পারেনি। আয়ত্তে না আনার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ অধারাবাহিক পারফরম্যান্স এবং পরিকল্পনার বিরাট ঘাটতি। প্রতিপক্ষের চাপে খেলা ছেড়ে দিয়ে হারার আগে হেরে যাওয়ার যে প্রবণতা ফুটে ওঠে ২২ গজে। এই ফরম্যাটে এখন পর্যন্ত (সদ্য সমাপ্ত জিম্বাবুয়ে সিরিজ) টাইগাররা ম্যাচ খেলেছে ১৩১টি। জয়ের হাসি হেসেঠে ৪৫ ম্যাচে, পরাজয় বরণ করেছে ৮৩ ম্যাচে এবং তিনটি ম্যাচে কোনো ফলাফল হয়নি। এই ফরম্যাটে বড় দলগুলোর বিপক্ষে জয় এসেছে হাতেগোনা। সবচেয়ে বেশি জয় পেয়েছে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। তাদেরকে টাইগাররা হারিয়েছে ১২ ম্যাচে। এছাড়াও ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪ জয়, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আছে ৩ জয়। শক্তিশালী পাকিস্তানকে এই ফরম্যাটে দুবার হারিয়েছে বাংলাদেশ। উইন্ডিজের বিপক্ষে আছে ৫ জয়, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৪টি জয় পেয়েছে টাইগাররা। আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে আছে ৩টি করে জয়। ওমান ও নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে ২টি। এছাড়াও ইন্ডিয়া, নেপাল, কেনিয়া, পাপুয়া নিউগিনি, ইউএই’র বিপক্ষে একটি করে জয় পেয়েছে টাইগাররা। এই ফরম্যাটে লজ্জার হারও রয়েছে যেমন স্কটল্যান্ড, নেপাল ও নেদারল্যান্ডের মতো দুর্বল প্রতিপক্ষের সঙ্গে হারতে হয়েছে তাদের।

বাংলাদেশে ক্রিকেট বোর্ড

ঘরোয়া ক্রিকেটের উন্নতি জরুরি: টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট হচ্ছে ভয়ডরহীন ক্রিকেট। যেটা মোহাম্মদ আশরাফুল, আফতাব আহমেদরা খেলতেন। বর্তমান সময়ের লিটন দাস সেই পথেরই পথিক। কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটে দারুণ পারফরম্যান্স করে জাতীয় দলের জার্সিতে এসে একেবারেই নাজুক বনে যাচ্ছেন বর্তমান ক্রিকেটাররা। সমস্যা তাহলে ঘরোয়া ক্রিকেটেই। অতি সম্প্রতি মুনিম শাহরিয়ার, এনামুল হক বিজয়রা ঘরোয়া ক্রিকেটে যেমন পারফরম্যান্স করেছেন তাতে আন্তর্জাতিদক অঙ্গনে দাপট দেখানোরই কথা ছিলো। কিন্তু হলো এর পুরো ভিন্ন। পারফরম্যান্স ধারাবাহিক না হওয়ায় বিসিবি ঘনঘন দল পরিবর্তন করছে। তাতে পরীক্ষায় পড়ছেন ক্রিকেটাররা। বিশ্বকাপের পর হুট করে সাইফ হাসানকে খেলানো হয়। দুই ম্যাচে বাজে পারফর্ম করায় দল থেকে বাদও পড়তে হয় তাকে। জিম্বাবুয়েতে পারভেজ হোসেন ইমনকে নেওয়া হয়। শেষ টি-টোয়েন্টিতে অভিষেকও হয়েছিল তার। পরীক্ষায় ফেল করেছেন যুব বিশ্বকাপজয়ী ওপেনারও। মুনিম পরীক্ষায় ভালো না করায় তাকে দল থেকে বাদও দেওয়া হয়েছে। তাদের দলে আসা, জাতীয় দলের হয়ে পারফর্ম করতে না পারার কারণে ঘরোয়া ক্রিকেটের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। দেশে নিজেদের টুর্নামেন্টগুলোতে অনায়াসে রান করে নির্বাচকদের নজরে আসার পর জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে পারফর্ম করার বল নেই।

সাকিব আল হাসান

দল হয়েই উঠতে পারেনি টাইগাররা: এই ফরম্যাটে এখনও দল হয়েই উঠতে পারেনি লিটন-আফিফরা। কিভাবে টি-টোয়েন্টি খেলতে হবে, ম্যাচের টার্নিং পয়েন্টে কী করা চাই সব যেন লেজেগবুরে হচ্ছে। এখানে ক্রিকেটারদের চেয়েও ম্যানেজম্যান্টের দ্বায় বেশি। ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং পজিশন নিয়ে এলোমেলো সাজ তাদেরকে স্বাচ্ছন্দে কতটা খেলতে দিচ্ছে প্রশ্ন থেকে যায়। নাজমুল শান্ত, আনামুল বিজয়, আফিফ সবাই টপঅর্ডারে খেলে থাকে, তাদের এখানে নামতে হয় তিন, চার, পাঁচে। তাতে তার স্বভাবজাত খেলাই দূরহ হয়ে উঠে। এছাড়াও আচমকা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন, দল থেকে বাদ দেয়া ও দলে অর্ন্তভুক্ত করা ম্যানেজমেন্টের যেন নৈমিত্ত্যিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখান থেকে একটি দর হয়ে উঠা আর সম্ভব হয়ে উঠে নি লাল-সবুজ পতাকাধারীদের।

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ

সিনিয়রদের নিয়ে এতো জল্পনা কেনো: টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বাংলাদেশের ক্রিকেটে সিনিয়রদের নিয়ে যেন নাটক হচ্ছে। এই নাটকের সূত্রপাত বর্তমান ওয়ানডে কাপ্তান তামিম ইকবালকে নিয়ে। তার ধীরগতির ব্যাটিংয়ের কারনে সমালোচনার শিকার হতে হয়েছিলো তাকে, এরপর তিনি স্বেচ্ছায় ৬ মাসের ছুটিতে যান, পরবর্তীতে যা অবসর হিসেবেই ঘোষণা দেন। এর মধ্য দিয়ে টাইগারদের ওপেনিংয়ে সবচেয়ে ভরসার নাম কাটা হয়ে গেল। কেননা ওই জায়গায় তামিমের স্থলে এখন পর্যন্ত কোনো বিকল্প নেই, বিসিবিও পারেনি সেই জায়গা পূরণ করাতে। অনেককেই সুযোগ দেয়া হয়েছে। যেমন, নাঈম শেখ, শান্ত, সৌম্য, মুনিম, ইমরুল। কেউই আস্থার প্রতিদান দিতে সক্ষম হয়নি। সবশেষ ইমনকে যাচাই করছে বিসিবি। পরের নামটি আসে সাবেক কাপ্তান মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে ঘিরে। সবশেষ বিশ্বকাপে তার নেতৃত্ব ও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স এতটাই হতাশজনক ছিলো যে বলাই বাহুল্য। কিন্তু বিকল্প কে? উইন্ডিজ থেকে ফিরে ব্রিশ্রাম দেয়া হলেও সোহানের ইনজুরিতে তাকেই আবার মাঠে ফিরতে হলো। তাতে পরিস্কার ম্যানেজমেন্টর হাতে বিকল্প নেই। মুশফিকুর রহিম এখনও খেলে যাচ্ছেন, তবে পারফরম্যান্সে নেই সেই ঝলক। তবে বলতে হবে এই মুহূর্তে মিডলঅর্ডারে তারও বিকল্প সেই। সাকিব আল হাসান একমাত্র ছন্দে আছেন, তবে কবে কোন সিরিজে তিনি খেলবেন আর কোর সিরিজে খেলবেন না সেটা নিয়েই দ্বিধা থাকে সবার। তাইতো দল হয়ে উঠতেই ব্যর্থ টাইগাররা।

তামিম ইকবাল

আসছে এশিয়া কাপ ও বিশ্বকাপ: চলতি আগস্টেই এশিয়া কাপ খেলবে টাইগাররা। এবারের এশিয়া কাপ হবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের এই আসরে প্রথমে গ্রুপ পর্বে খেলবে ৬ দল। বাংলাদেশের গ্রুপে রয়েছে আফগানিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। সেরা দুই দল উঠবে সুপার ফোরে। আর যেহেতু টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট সেহেতু টাইগারদের সুপার ফোর নিশ্চিত করা নিয়েই রয়েছে সংশয়। কেননা আফগানিস্তান এই ফরম্যাটে অনেক শক্তিশালী দল, শ্রীলঙ্কারও রয়েছে দুর্দান্ত একটি স্কোয়াড। উপরিউন্তু শারজা কিংবা দুবাইতে ওই দুই দল বেশ দারুণ খেলে। সেখানে টাইগারদের পারফরম্যান্স কতটা আশা দেখাচ্ছে সময়ই বলে দেবে। অন্যদিকে, চলতি বছরের অক্টোবরেই মাঠে গড়াবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। অস্ট্রেলিয়ায় হবে এবারের আসর। সৌভাগ্যক্রমে টাইগাররা এবার সরাসরি সুপার টুয়েলভে খেলবে। সেখানেও তাদের দিতে হবে কঠিন পরীক্ষা।

কোন ধরনের পরিবর্তন আসবে কি: টি-টোয়েন্টিতে কোন ধরনের পরিবর্তন আসবে কি-না তা নির্ভর করছে সামনের দিনে কীভাবে পারফর্ম করছে খেলোয়াড়রা তার ওপরে। এমনটাই জানালেন বিসিবি বস নাজমুল হাসান পাপন। টেস্টের মতোই টি-টোয়েন্টির নেতৃত্ব সাকিব আল হাসানের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু তা নিয়েও পরিষ্কার করে কিছু বলেননি বিসিবি সভাপতি। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, আপনারা দেখেন, ক্যাপ্টেন কাকে করা হবে এই সিরিজে, প্রথম নামটাই আসছে লিটনের, মানে আপনি যদি ন্যাচারালই চিন্তা করেন। মেহেদী হাসান মিরাজের নামও আসছে, কারণ এরা একটু পুরনো। কিন্তু দেখেন, দেওয়া হয়েছে কী? -সোহান। এই প্রত্যেকটা জিনিসই অনেক ভেবেচিন্তে করা হয়েছে। একটু লঙ টার্মের কথা চিন্তা করে করা হচ্ছে এবং সব ফরম্যাটের কথা চিন্তা করে করা হচ্ছে। সো একটু ভেবেচিন্তে আগাচ্ছে, এখনই কিছু ফাইনাল হয়নি। প্লেয়ারদের পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করবে সব কিছু।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ লোগো


এদিকে, বিসিবি সভাপতির চাওয়া, নতুন দুটা-তিনটা ছেলে বেরিয়ে আসুক যাদের আমরা খেলাতে পারি। এখন হয়েছে কী, খেলাচ্ছি, কিন্তু আমরা নিজেরাই কনফিডেন্ট না। আসলে যার বদলে খেলাচ্ছি সে কি আসলে তার চেয়ে ভালো কী?-এই জিনিসটা বোঝার জন্যও তো একটা কনফিডেন্স লাগবে। আর এই প্রমাণটা ওদেরই করতে হবে, যারা সুযোগ পাচ্ছে।

উত্তরদক্ষিণ । ০৪ আগস্ট ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে টাইগারদের যেই ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ও দাপট সেটা যেন টি-টোয়েন্টিতেও দেখা যায় সেই প্রত্যাশাই করেন টাইগারপ্রেমীরা। তারা চান টাইগাররা আরও শক্তিশালী হোক এই ফরম্যাটে। ম্যাচে জয়-পরাজয় থাকবেই কিন্তু হারার আগেই যেন হেরে না যায় সেটাই চান দর্শকরা। আসন্ন এশিয়া কাপে টাইগাররা সেই প্রত্যাশা পূরণে লড়বেন আপ্রাণ এটাই চাওয়া।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading