আমেরিকা থেকে ইন্দোনেশিয়া: আনারকলি সমাচার

আমেরিকা থেকে ইন্দোনেশিয়া: আনারকলি সমাচার

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ০৫ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১০:৩০

ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তার বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে প্রত্যাহার হওয়া উপ-রাষ্ট্রদূত কাজী আনারকলি দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে বলা চলে খেলাই শুরু করেছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে তদন্ত। কিন্তু এটাই তার প্রথম অপরাধ নয় এর আগেও অপরাধমূলক কর্মকান্ডের অভিযোগ এসেছিলো। দেশের বাইরে এতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও একের পর এক অনৈতিক কর্মকান্ডে লিপ্ত ছিলেন এই কূটনীতিক। শুরুতেই তার বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়ার ফলই যেন পাচ্ছে মন্ত্রণালয়। বিস্তারিত লিখেছেন সাদিত কবির

আলোচিত কূটনীতিক কাজী আনারকলিকে নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। ঘটনা ইন্দোনেশিয়ার হলেও অতীত রেকর্ড ঘেটে দেখা যায় আগের কর্মস্থলগুলোতেও তার বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ ছিল। স্বেচ্ছাচারিতা, প্রভাব খাটানো, অর্থসহ নানা অনৈতিক কর্মকান্ডে অভিযোগ বহুবার এলেও স্থান পরিত্যাগ ছাড়া বড় ধরণের কোনো ক্ষতিই তার হয়নি। জার্কাতায় মাদক পাওয়ার ঘটনা বিব্রত করেছে পুরো বাংলাদেশ তথা পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়কে। তাইতো তার বিষয়ে কঠোর হচ্ছে তারা। কিন্তু তার অপরাধমূলক কর্মকান্ড গুলো আলোচনায় আসার পর তাৎক্ষণিকভাবে যদি পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নিতো তবে আজ জার্কাতায় এ ধরণের অনৈতিক কর্মকান্ড করার সাহস কিংবা সুযোগ কোনোটিই দেখাতে পারতেন না আনারকলি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বলছেন, আগের অপরাধের জন্য বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি আনারকলির বিরুদ্ধে। যে কারণেই অনেকটা ‘বেপরোয়া’ হয়ে ওঠেন তিনি।

আর সাবেক কূটনীতিকরা বলছেন, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কূটনীতিকদের নিজেদের কর্মকান্ড সম্পর্কে শুরুর দিকেই ওরিয়েন্টেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি কোনো অসদাচরণ করলে গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়ানো সম্ভব।

জাকার্তায় কী ঘটেছিলো: গত জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে দক্ষিণ জাকার্তায় আনারকলির বাসায় গত মাসের প্রথম সপ্তাহে হঠাৎ অভিযান চালায় ইন্দোনেশিয়া সরকারের মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ওই বাসা থেকে নিষিদ্ধঘোষিত মাদক (মারিজুয়ানা) উদ্ধার করা হয়। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কূটনীতিক আনারকলি দায়মুক্তির আওতাধীন ছিলেন। তাই তাকে গ্রেফতার না করে দূতাবাসের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। বিষয়টি জানার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাৎক্ষণিক তাকে দেশে ফেরার আদেশ জারি করা হয়। তবে কাজী আনারকলি একজন নাইজেরিয়ার নাগরিকের সঙ্গে অ্যাপার্টমেন্ট শেয়ার করতেন। তিনি নাকি ওই নাইজেরিয়ার নাগরিক মাদক রেখেছিলেন, সে বিষয়ে এখনও জাকার্তার পক্ষ থেকে ঢাকাকে জানানো হয়নি।

আব্দুল মোমেন

‘সে ড্রাগ অ্যাডিক্ট, দেশের বদনাম করে ফেলেছে’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন গত মঙ্গলবার এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, আমি ইন্দোনেশিয়া গিয়েছিলাম। ওই সময় আমাদের রাষ্ট্রদূত পুরো ঘটনাটা বলেছেন। সে (আনারকলি) একজন ড্রাগ অ্যাডিক্ট। আমি তাকে দেশে ফেরত পাঠাতে বলেছি। রাষ্ট্রদূত তাকে ফেরত পাঠায়। তার অপকর্মের পুরোনো ইতিহাস আছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, তাকে রিহ্যাবে (মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র) পাঠানো দরকার। দেশের বদনাম করে ফেলেছে। ইন্দোনেশিয়ানরা খুব ভদ্রলোক। বিপুল পরিমাণ মারিজুয়ানাসহ হাতেনাতে ধরা পড়ার পরও তা বাইরে প্রকাশ করেনি। এখন রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে পুরো রিপোর্ট পাওয়ার অপেক্ষায় আছি। তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, লস অ্যাঞ্জেলেসে থাকাকালেও সে অপকর্ম ঘটিয়েছে। সেখান থেকে তাকে বের করে দেয়। সে মাদকাসক্ত, অসুস্থ। তার চিকিৎসা দরকার। সরকারের আইনে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আমেরিকায়ও ঘটিয়েছিলেন ‘অঘটন’ : এর আগে আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে বাংলাদেশ দূতাবাসের তৎকালীন কূটনীতিক কাজী আনারকলির বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছিলো। দীর্ঘদিন ধরে তার গৃহকর্মী নিখোঁজ ছিলেন। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে এ খবর গণমাধ্যমে আসে। এই ঘটনার মধ্যে ডেপুটি কনসাল জেনারেল কাজী আনারকলিকে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় বাংলাদেশ দূতাবাসের মিনিস্টার হিসেবে বদলি করা হয়। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, ২০১৭ সালে তার গৃহকর্মী শাব্বির স্টেট ডিপার্টমেন্টে গিয়ে আনারকলির বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন। যাতে দাবি করেন আমেরিকার ভিসার জন্য সে বিপুল অর্থ আনারকলিকে দিয়েছে। সেখানকার আইনে এটি মানব পাচারের অভিযোগ। তাই এই অভিযোগ নিয়ে নড়েচড়ে বসে তখনকার আমেরিকার প্রশাসন। সে সময় গ্রেফতার এড়ানোর জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনারকলিকে কয়েক ঘণ্টার নোটিশে আমেরিকা থেকে সরিয়ে নেয় ও দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তখনও কাজী আনারকলির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি বলে জানা গেছে।

স্বেচ্ছাচারিতা দিয়েই শুরু: কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, আনারকলি ২০০১-২০০৩ সালে মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব পদে ছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সফরসঙ্গী হিসেবে বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন আনারকলি। সে সময় স্কলারশিপ নিয়ে ব্রিটেনে পড়তে যান তিনি। পড়াশোনা শেষে তাকে হংকংয়ে ভাইস কনসাল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেখানে আনারকলি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীর সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়লে তাদের মধ্যে উপ-দূতাবাসেই হাতাহাতি, মারামারির ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ আছে। পরবর্তীতে আনারকলিকে দায়মুক্তি দিয়ে রোমে পোস্টিং দেওয়া হয়। অন্যদিকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে শাস্তি দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনা হয় বলে জানা গেছে। এদিকে ২০১২ সালে দেশে ফেরার পর চার বছর মন্ত্রণালয়ে ছিলেন আনারকলি। সে সময় আনারকলির বিরুদ্ধে সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অযথা হয়রানি, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ ওঠে। এই অবস্থার পরও ২০১৬ সালে কাজী আনারকলিকে আমেরিকায় লসঅ্যাঞ্জেলেসে ডেপুটি কনসাল জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

দুর্ভাগ্যজনক ও বিব্রতকর’ বলছে মন্ত্রণালয়: এদিকে, এ আনারকলিকে প্রত্যাহারের ঘটনাকে ‘দুর্ভাগ্যজনক ও বিব্রতকর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে এই কূটনীতিকের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, পররাষ্ট্র ক্যাডারের যে হাই স্ট্যান্ডার্ড, এটার সাথে আমরা কখনোই কমপ্রোমাইজ করব না। তদন্তে যদি সে দোষী সাব্যস্ত হয়, অবশ্যই তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এ বিষয়ে এটুকু বলতে পারি। আর পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন এমন কর্মকাøকে ব্যক্তিগত স্খলন হিসেবে মন্তব্য করেছেন। তদন্ত শেষে দোষী হলে আনারকলির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবেও জানিয়েছেন তিনি।

চূড়ান্ত প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা: জানা গেছে, কাজী আনারকলির এবারের অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে তদন্ত কমিটি। বিশেষ করে গণমাধ্যমে ফলাও করে খবর প্রকাশিত হওয়ায় টনক নড়েছে মন্ত্রণালয়ের। তবে এ জন্য তার বিরুদ্ধে নিতে জাকার্তা থেকে চূড়ান্ত প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছে মন্ত্রণালয়।

উত্তরদক্ষিণ । ০৫ আগস্ট ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

দেশের ভাবমূর্তির প্রশ্নে কোনো ছাড় নয়: এ ঘটনা নিয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির গণমাধ্যমকে বলেন, যেহেতু তদন্ত হচ্ছে তাই আগেই কূটনীতিকের বিষয়ে কথা বলা ঠিক হবে না। দেখি তারা কী তথ্য পায়, কী ব্যবস্থা নেয়। তবে এমন কর্মকান্ডে দেশের ভাবমূর্তি অবশ্যই ক্ষুণ্ন হয়েছে। তাই বিষয়টি নিয়ে সিরিয়াসলি কাজ করতে হবে। তদন্তে দোষী হলে কি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেক ধরণের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। তবে সব কিছু অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী হবে। হতে পারে প্রমোশন বন্ধ করা। আবার অপরাধ গুরুতর হলে চাকরিচ্যুতিরও উদাহরণ আছে।
তাই বিশেষজ্ঞদের মতে আনারকলির বিচার এমন হওয়া উচিৎ যেন এই বিচার উদাহরণ হয়ে থাকে। এ ধরণের কর্মকান্ড করে দেশের ভাবমূর্তিতে কেউ যেন ভবিষ্যতে আগাত হানার সাহসও না দেখায়। একজন আনারকলি কেন ১৬ কোটি মানুষের সম্মানে আঘাত হানবে। বহির্বিশ্বে সম্মান কুড়ানোর জন্য তাদের রাষ্ট্র সেখানে পাঠায়, এ ধরণের কর্মকান্ড কোনো অর্থেই বরদাস্ত করা সমীচিন হবে না।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading