পাচারকারীদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকতে হবে
শরিফুল হাসান । শুক্রবার, ০৫ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১০:৫০
ভাবুন তো একবার, এত বড় এই পৃথিবীর কোনো এক শহরের ছোট্ট এক কক্ষে বন্দি আপনি। যেকোনোভাবে হোক, আপনি পাচারের শিকার। স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার তো নেই-ই, উল্টো নিয়মিত নিপীড়ন করা হয়। কখনো সেটা শ্রম শোষণ, কখনো বা যৌন নিপীড়ন বা অন্য কোনোভাবে নিপীড়ন।
মানবাধিকারের কী চরম লঙ্ঘন, তাই না?
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস রিপোর্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, আজকের পৃথিবীর অন্তত আড়াই কোটি মানুষকে এই ভয়ানক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে, যারা কোনো না কোনোভাবে মানবপাচারের শিকার। আর এই মানবপাচারকে ঘিরে পৃথিবীতে লাখো কোটি টাকার বাণিজ্য চলছে। কমবেশি কিছু উদ্যোগ নিলেও মানবপাচার রোধে ন্যূনতম যা করা প্রয়োজন, এই পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশ সেটি করতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, বর্তমানে দুই কোটিরও বেশি মানুষকে জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে শোষণ করা হচ্ছে, যার মধ্যে অন্তত ৫০ লাখ যৌন শোষণের শিকার। এসবের মাধ্যমে কয়েক শ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা চলছে।
বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কমবেশি পাচারের সমস্যা থাকলেও আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, বিশেষ করে যেখানে দারিদ্র্য ও সহিংসতা বেশি, সেখানে পাচারের ঝুঁকি অনেক বেশি। পাচারকারীরাও সেখানে অনেক বেশি সক্রিয়। করোনার বৈশ্বিক মহামারি মানুষকে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে ফেলেছে। ফলে মানবপাচারের ঝুঁকিও বেড়েছে।
দুঃখজনক হলো, বিশ্বে পাচারের শিকার মানুষের মধ্যে ৭০ শতাংশই নারী ও কিশোরী। মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের এক-তৃতীয়াংশই আবার শিশু। নিম্ন আয়ের দেশগুলো ধরলে সেখানে পাচারের শিকারের অর্ধেকই শিশু, যাদের বেশির ভাগকে জোরপূর্বক শ্রমের জন্য কিংবা যৌন শোষণের জন্য পাচার করা হয়।
এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার একাধিক অঞ্চলে চলমান সশস্ত্র সংঘাত এবং দরিদ্র সামাজিক অবস্থাই মানবপাচারের পেছনের কারণ। এই অঞ্চলের অনেক দেশ থেকে নারীদের সাধারণত ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোতে পাচার করা হয়। সেখানে তাদের যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করা হয়।
বৈশ্বিক এই আলোচনা থেকে ফিরি বাংলাদেশে। একসময় মানবপাচারের উৎস দেশ হিসেবে পরিচিত থাকলেও এখন ট্রানজিট ও গন্তব্য দুই হিসাবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের তিন দিকে ভারত। অন্তত ৩০টি জেলা আছে যার এক পাশে ভারত আরেক পাশে বাংলাদেশ। ফলে খুব সহজেই বাংলাদেশের নারী ও কিশোরীদের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পাচার করে ভারতে নিয়ে যায় পাচারকারীরা।
বাংলাদেশের আরেক দিকে মিয়ানমার। সেখান থেকে অন্তত ১৫ লাখ রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে। এই রোহিঙ্গারাও এখন পাচার হচ্ছে। ২০১৫ সালে সমুদ্রপথ দিয়ে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিদের মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাচার এবং গণকবরের কথা তো সারা বিশ্বে আলোচিত।
বাংলাদেশের এক কোটিরও বেশি মানুষ এখন বিদেশে। লোকজন ভাবে, বিদেশে চলে গেলেই ডলার কিংবা রিয়াল আয়। এই লোভের কারণে শ্রম অভিবাসনের নামে পাচার বাড়ছে। শুনে অবাক হতে পারেন, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে যে দেশগুলোর লোক ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছে বাংলাদেশ এখন সেই তালিকায় তৃতীয়। ২০২২ সালের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ১২ হাজার ৬৩৬ জন বাংলাদেশি এভাবে ইউরোপে প্রবেশ করেছে। আর গত এক যুগে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশ করেছে প্রায় ৬৫ হাজার বাংলাদেশি।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন হওয়ার পর শুধু ওই আইনেই সাড়ে ছয় হাজারেরও বেশি মামলা করা হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ মামলারই কোনো নিষ্পত্তি হয়নি।
সমস্যা হলো, সমাধান কী? মানবপাচার এমন একটি সংকট, যেটি কোনো দেশের একার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। পাচার প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি সবার কাজে সমন্বয়ও দরকার।
একই ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশেও। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রগ্রাম এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের এক গবেষণায় আমরা দেখেছি, পাচারকারীরা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সংকটে থাকা পরিবারের শিশু-কিশোরীদের পাচারের জন্য টার্গেট করছে। ফেসবুক, টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগের নানা মাধ্যম অনেক বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে চাকরি কিংবা নায়িকা বা মডেল বানানোর লোভ দেখিয়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে তাদের মানব পাচার চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
আর এই সমন্বয়টাই দরকার। অনলাইনে হোক কিংবা অফলাইনে, কী সরকারি সংস্থা কী বেসরকারি সংস্থা, হোক এশিয়ার কোনো দেশ কিংবা ইউরোপ, মানবপাচারের মতো ঘৃণ্য অপরাধ প্রতিরোধে সমন্বিতভাবে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই। সেই সমন্বয় যেমন হতে হবে দেশে দেশে, তেমনি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বেই সেই সমন্বয় থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, পাচারকারীরা যদি আমাদের চেয়ে এগিয়ে থাকে, তাহলে পাচার বন্ধ হবে না। কাজেই এগিয়ে থাকতে হবে আমাদেরই।
লেখক: শরিফুল হাসান, প্রগ্রাম হেড, মাইগ্রেশন প্রগ্রাম ও ইয়ুথ ইনিশিয়েটিভস, ব্র্যাক
ইউডি/সুস্মিত

