শেখ কামাল: বহুমাত্রিক অনন্য প্রতিভার অধিকারী সংগঠক
আনোয়ারুল ইসলাম । রবিবার, ০৭ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ০৯:৫০
শেখ কামাল। একাধারে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছেলে। ১৯৪৯ সালের ৫ আগস্ট পিতার মতো তিনিও জন্মেছিলেন বাইগার নদীর তীর ঘেঁষে ছবির মতো সাজানো গোছানো গ্রাম গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টে ঘাতকের বুলেটে পরিবারের অন্যদের মতো তিনিও শহীদ হন ঢাকার ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরে। জন্ম আর মৃত্যু তারিখ আগস্ট মাসেই। বয়সের হিসেবে মাত্র ২৬ বছর বেঁচেছিলেন। এই অল্প সময়ের মধ্যেই তার সবচেয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর বহন করে চলেছে বাংলাদেশের ক্রীড়া জগতে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সংগঠন ‘আবাহনী ক্রীড়া চক্র’। এখন যেটা আবাহনী লিমিটেড। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে এসে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে তার নিবিড় সম্পৃক্ততা, আবাহনী ক্লাবকে আধুনিক ধাঁচে গড়ে তোলা, খেলাধুলায় আবাহনীকে অন্য এক উচ্চমাত্রায় নিয়ে যাওয়া, ফুটবলে আধুনিকতার সংযোজন- এসবই শেখ কামালকে আজও অন্যরকম এক মর্যাদায় অভিষিক্ত করে আছে।
শেখ কামাল কেমন ক্রীড়া সংগঠক ছিলেন তার প্রমাণ আবাহনী লিমিটেড। তিনি জানতেন সব খেলার থেকে প্রিয় বাঙালির কাছে ফুটবল, তা নিয়ে আবেগের অন্ত নেই। তবে ফুটবল খেলার ঐতিহ্য তিনি পারিবারিক সূত্রেই পেয়েছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও ছিলেন ফুটবল অন্তপ্রাণ মানুষ। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠপুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল পারিবারিক খেলার ঐতিহ্য ফুটবল এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে উচ্চমাত্রায় নিয়ে যান। তার এই কাজে বন্ধুদের কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছিলেন। দেশের কিংবদন্তি ফুটবলার কাজী সালাহউদ্দিন ছিলেন শেখ কামালের শাহীন স্কুলের ক্লাসমেট। ক্রিকেটের মাঠেও তাকে পেয়েছিলেন। তাকে নিয়ে এসেছিলেন আবাহনী ক্লাবে। উইলিয়াম বিল হার্টকে শেখ কামাল আবাহনীর ফুটবল কোচ হিসেবে নিয়োগ দেন। শেখ কামালের ক্রীড়াপ্রীতি তার জীবন দর্শনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। প্রধানমন্ত্রীর ছেলে হয়েও অত্যন্ত সাদামাটা আয়োজনে দেশসেরা এ্যাথলেট সুলতানা খুকীকে বিয়ে করেন। বিদেশের খেলাধুলাও তাকে অনুপ্রাণিত করে এবং ১৯৭২ সালে মিউনিখ অলিম্পিক দেখতে যান। নিজেও একজন দুর্দান্ত খেলোয়াড় ছিলেন। ১৯৭৪-৭৫ সালে জাতীয় ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় খেলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দলের হয়ে। এতে তিনিসহ অধিনায়ক ছিলেন। ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, এ্যাথলেটিকস প্রায় সবটাতেই তার উপস্থিতি ছিল সরব।
ছাত্র হিসেবেও অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন শেখ কামাল। শাহীন স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে বিএ অনার্স পাস করেন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কারাগারের রোজনামচায় শেখ কামালের ছাত্রজীবনের কৃতিত্বের কথা জানা যায়। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল একটানা দীর্ঘদিন বঙ্গবন্ধু কারাগারে ছিলেন। বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি পরিবারের খোঁজ খবর নিতেন। বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি অঙ্গনে শিক্ষার অন্যতম উৎসমুখ ছায়ানটের সেতারবাদন বিভাগের ছাত্রও ছিলেন শেখ কামাল। স্বাধীনতা-উত্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন কর্মসূচির পাশাপাশি সমাজের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়নে সমাজ চেতনায় তাদের উদ্বুদ্ধকরণে মঞ্চনাটক আন্দোলনের ক্ষেত্রে শেখ কামাল ছিলেন প্রথম সারির সংগঠক। ‘স্পন্দন’ নামে এক শিল্পীগোষ্ঠী গড়ে তুলেছিলেন শেখ কামাল তার বন্ধু শিল্পীদের নিয়ে। এছাড়া তিনি ঢাকা থিয়েটারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ১৯৭২ সালে নাটকের দল নিয়ে শেখ কামাল পশ্চিম বাংলায় গিয়েছিলেন। সেবারে দলের প্রধান ছিলেন সদ্য প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম।
মাত্র ছাব্বিশ বছরের (১৯৪৯-১৯৭৫) স্বল্পায়ু জীবনে যে পরিণত প্রজ্ঞার পরিচয় রেখে গেছেন খেলার ময়দান থেকে সুস্থ সংস্কৃতি নির্মাণে, তা আমাদের সব প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাঙালি পাঠকসমাজের কাছে আমরা সেভাবে তাকে তুলে ধরতে পারিনি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক আবুল ফজলের লেখায় শেখ কামালকে ঘিরে তার বোধ ও বোধি আমাদের বিস্ময়াভিভূত করে। অধ্যাপক আবুল ফজলের সঙ্গে যে কয়েকবার শেখ কামালের দেখা হয়েছিল, প্রতিবারেই তিনি তাকে বিনয়াবনত দেখেছেন। এটি অধ্যাপক আবুল ফজলকে বিস্মিত করেছে! একজন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে হয়েও শেখ কামাল নিজে ড্রাইভ করে অধ্যাপক আবুল ফজলকে বিমানবন্দরে আনতে গিয়েছেন আবার নিজে গিয়ে বিমানবন্দরে দিয়ে এসেছেন। আবার অনুষ্ঠানেও তিনি তাকে দেখেছেন পেছনের সারিতে। এতটা অমায়িক ছিলেন শেখ কামাল। একটি সম্পন্ন সুভদ্র বাঙালি রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে উঠেছেন শেখ কামাল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সন্তান বা রাষ্ট্রপ্রধানের সন্তান হলেও নিজে কখনো বড় পদ-পদবির লোভ করেননি। দেশ মাতৃকার জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে গেছেন। দেশজ ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চায় তিনি ছিলেন নিরলস কর্মী। অপরিণত বয়সে শেখ কামালকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকারে পরিণত হতে হয়েছে। সুস্থ সংস্কৃতি দিয়ে এই কাল-পাত্র-দেশ আর তিনি বিনির্মাণ করে যেতে পারেননি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকদের বুলেট ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও রাজনীতির মিশেলে সেই বর্ণিল আলোকচ্ছটা মিশে গেল। বলা সংগত যে, সে জন্য যথেষ্ট সময় তাকে দেওয়া হয়নি। মাত্র ২৬ বছর বয়সে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। নানা মিথ্যা প্রচারে তাকে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলেছে দীর্ঘ সময় ধরে। তবে আজ সব অসত্যের অন্ধকার থেকে সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে এই স্বল্পায়ু মহৎ হৃদয়, সুকুমার মনোবৃত্তির মানুষটির অবদানের কথা।
লেখক- সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

