হঠাৎ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি: সরকারের যুক্তি, জনমনে ক্ষোভ
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ০৭ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১২:২০
দেশে হঠাৎ করেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। যা সাধারণ মানুষের মনে শঙ্কা ও সংশয়ের জন্ম দিয়েছে। গত শুক্রবার রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় ডিপোর ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে ভোক্তা পর্যায়ে খুচরা মূল্য (১ লিটার) ডিজেল ও কেরোসিন ১১৪ টাকা, অকটেন ১৩৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৩০ টাকা নির্ধারন করা হয়। শনিবার (৬ আগস্ট) এই দাম বৃদ্ধির পেছনের কারনও ব্যাখ্যা করে সরকার । তবে রাজনৈতিক দলসহ সাধারণ মানুষ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে।

লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতেই মূল্যবৃদ্ধি: নসরুল হামিদ
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। শনিবার (৬ আগস্ট) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সমন্বয়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান কমানোসহ পাচার হওয়ার শঙ্কা থেকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) ব্যাপক লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তেলের দাম বাধ্য হয়েই বাড়িয়েছে সরকার।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের শনিবারের ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়, সর্বশেষ গত বছরের ৩ নভেম্বর প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে কেবল ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য বৃদ্ধি করে পুননির্ধারন (ডিজেল ৮০ টাকা ও কেরোসিন ৮০ টাকা) করা হয়। সে সময় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির প্রবণতা সত্ত্বেও অকটেন ও পেট্রোলের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়নি। ২০২১-২২ অর্থবছরের শুরুর দিকে কোভিড-১৯-এর প্রকোপ কিছুটা কমায় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাø বৃদ্ধি পাওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য আরও বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে যদি ডিজেল প্রতি ব্যারেল ৭৪ দশমিক শূন্য ৪ ডলার এবং অকটেন প্রতি ব্যারেল ৮৪ দশমিক ৮৪ ডলারে নেমে আসে, তবে ডিজেল ও অকটেন প্রতি লিটার যথাক্রমে ৮০ টাকা ও ৮৯ টাকায়, অর্থাৎ বিদ্যমান মূল্যে বিক্রয় করা বিপিসির পক্ষে সম্ভব হতো, যা এখন প্রায় অসম্ভব। একইভাবে ক্রুড অয়েলের মূল্য এ বছরের জুনে ব্যারেলপ্রতি ১১৭ মার্কিন ডলার অতিক্রম করে, যা এখনও অব্যাহত আছে। জ্বালানি তেল আমদানিতে সর্বশেষ গত জুলাই মাসের গড় প্লাস রেট অনুযায়ী বিপিসির দৈনিক লোকসানের পরিমাণ ডিজেলে প্রায় ৭৪ কোটি ৯৪ লাখ ৯২ হাজার ৭০০ টাকা ও অকটেনে প্রায় ২ কোটি ৯২ লাখ ২৩ হাজার ২১৬ টাকা। মোট প্রায় ৭৭ কোটি ৮৭ লাখ ১৫ হাজার ৯১৬ টাকা। গত মে ও জুনে লোকসান ছিল শতাধিক কোটি টাকা।’
বিপিসির বিপুল ভর্তুকি দিতে হচ্ছে জানিয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যায় বলা হয়, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বিপিসির প্রকৃত লোকসান বা ভর্তুকি দাঁড়ায় ৮ হাজার ১৪ কোটি টাকার বেশি। সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ে ডিজেলের মূল্য ১১৪ টাকা করা হলেও গত জুলাইয়ের গড় হিসাবে প্রতি লিটারে খরচ পড়বে ১২২ দশমিক ১৩ টাকা, অর্থাৎ প্রতি লিটারে তার পরও ৮ দশমিক ১৩ টাকা লোকসান বিপিসিকে বহন করতে হবে। গত ১২ জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, কলকাতায় ডিজেল লিটারপ্রতি ৯২ দশমিক ৭৬ রুপি বা সমতুল্য ১১৪ দশমিক শূন্য ৯ টাকায় বিক্রয় হচ্ছে, যা বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩৪ দশমিক শূন্য ৯ টাকা বেশি এবং পেট্রোল লিটারপ্রতি ১০৬ দশমিক শূন্য ৩ রুপি বা সমতুল্য ১৩০ দশমিক ৪২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা বাংলাদেশ থেকে ৪৪ দশমিক ৪২ টাকা বেশি। এ পার্থক্যের কারণে বহু কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে আমদানিকৃত জ্বালানি পণ্য পাচার হওয়ার আশঙ্কা বিদ্যমান। তাই মূল্য সমন্বয়ে পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি পণ্যের মূল্যের পার্থক্যজনিত পাচার রোধ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

আইএমএফের শর্ত মেনে তেলের
দাম বাড়িয়েছে সরকার: মেনন
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, ঘাটতি সমন্বয়ের নামে আইএমএফের শর্ত মানার মধ্য দিয়ে সরকার বিষ গিললো। এই বিষ এখন অর্থনীতির দেহে ছাড়িয়ে রাজনীতি ও সমাজে বিস্তৃত হবে। আইএমএফ যে সব দেশে তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, সেসব দেশেই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়।
শনিবার (৬ আগস্ট) বিকাল ৩টায় ঢাকা মহানগর ওয়ার্কার্স পার্টির উদ্যোগে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হয়ে প্রধান অতিথি বক্তব্য রাখেন পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি রাশেদ খান মেনন এই অভিমত ব্যক্ত করেন। মেনন বলেন, বৈশ্বিক সংকটের বাস্তবতা স্বীকার করেও যে কথাটি বলা প্রয়োজন, তাহলো এই সংকটের দায়ভার সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। জ্বালানির ক্ষেত্রে গত দুই দশকে যে দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে তা এখনও অব্যাহত আছে, সে ব্যাপারে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলেই এই সংকট এড়ানো যেত। মেনন বলেন, জনগণ ধৈর্য ধারণ করেছে বলেই ষড়যন্ত্রকারীরা এখন পর্যন্ত দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিজনিত সংকট নিয়ে কিছু করতে পারছে না। কিন্তু মুষ্টিমেয় দুর্নীতিবাজ, অসৎ ব্যক্তির লোভের ফলে অর্থনীতির যে দশা হতে চলেছে তাতে জনগণের ওই ধৈর্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এরপরেও গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি হবে মড়ার ওপর খাড়ার ঘাঁ।
সাধারন মানুষের কপালে চিন্তার ভাজ: দীর্ঘদিন ধরেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। ভোজ্যতেল, চাল, ডাল আটা থেকে শুরু করে এমন কোনো পণ্য নেই যার দাম বাড়েনি। ফলে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মানুষকে। পণ্যের এমন লাগামহীন দামের তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেল। অস্বাভাবিক হারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় নতুন করে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে মানুষের কপালে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ সামনের দিনে সংসার কিভাবে চালাবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তেলের দাম বাড়ায় প্রভাব অন্যান্য পণ্যেও পড়বে এমন আশঙ্কা থেকে সংসার চালাতে নতুন ছক কষছেন মানুষ। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় গণপরিবহনে ভাড়া বাড়বে। তাই কিভাবে কর্মস্থলে যাওয়া আসা করবেন তা নিয়েই অনেকেই চিন্তা করছেন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেছেন, অতিমাত্রায় যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো, তার প্রভাবে নিত্যপণ্যসহ পরিবহনের ভাড়া বাড়বে অনেক। যা কল্পনার বাইরে। সাধারণ মানুষের টিকে থাকা কঠিন হবে।

সব মহলকে হতাশ করেছে: জিএম কাদের
সারা বিশ্বে যখন জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করেছে তখন দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সব মহলকে হতাশ করেছে। শনিবার (৬ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ কথা বলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের। জিএম কাদের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে ‘নির্দয়’ ও ‘নজিরবিহীন’ আখ্যা দিয়ে তা পুনর্বিবেচনার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান। বিবৃতিতে তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের এমন মূল্যবৃদ্ধিতে প্রমাণ হলো দেশের মানুষের প্রতি সরকারের কোনো দরদ নেই। এমন মূল্যবৃদ্ধিতে জনজীবনে মহাবিপর্যয় সৃষ্টি হবে।’
জিএম কাদের বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বেড়ে যাবে পরিবহন ব্যয়। নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাবে কয়েক গুন। পাশাপাশি দেশীয় পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে, বাড়বে দামও। এতে রপ্তানি শিল্পেও বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। ভয়াবহ পরিণতির দিকে অগ্রসর হবে দেশের অর্থনীতি। সাধারণ মানুষের মাঝে হাহাকার দেখা দেবে।

দেশের অর্থনীতিতে ভয়ংকর বিরূপ প্রভাব ফেলবে: মির্জা ফখরুল
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে যারা দিন আনে দিন খায় তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মন্তব্য করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে ভয়ংকর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এই জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি দেশের মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যাবে পরিবহন ব্যয়, ভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম। চাল, ডাল তেলের দাম দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ হবে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, অবৈধ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য সরকার দুর্নীতি শুরু করেছে।
‘পরিবহন ব্যয় দ্বিগুণ হবে, বাড়বে নিত্যপণ্যের দামও’
জ্বালানির দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে পরিবহন ব্যয় দ্বিগুণ বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। শনিবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত এক প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধনে এ শঙ্কার কথা জানান তিনি।
মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি বাড়ানোয় জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে আসবে। পরিবহন ব্যয় দ্বিগুণ বেড়ে যাবে। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যমূল্য সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের বাইরে চলে যাবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা দেশের সাধারণ মানুষের চরম এক দুঃসময়ে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি। তিনি বলেন, আমাদের দেশে সাধারণত তেলের দাম যে পরিমাণ বাড়ে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বাড়ে বাস ও অন্যান্য গণপরিবহন ভাড়া। পণ্য পরিবহন ভাড়াও ইচ্ছেমতো বাড়িয়ে দেন ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিকেরা। ফলে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামও বাড়বে।

পুলিশকে ‘ধৈর্য ধরে’ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ: জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর গত শুক্রবার রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষোভ জানাচ্ছেন নানা শ্রেণি-পেশার লোকজন। বিশেষভাবে মোটরসাইকেল চালকরা ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
সবশেষ শনিবার দুপুরে রাজধানীর শ্যামলীতে একটি মিছিল থেকে পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়। এ অবস্থায় আগ্রাসীভাবে নয়, বরং সব দিক বিবেচনায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘ধৈর্য ধরে’ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শনিবার ডিএমপির ক্রাইম বিভাগের সদস্য, সব বিভাগের উপ-কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দেন কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম। মোবাইলে এসএমএস এবং ওয়ারলেসে পাঠানো হয় এ সংক্রান্ত বার্তা।
ইউডি/সুস্মিত

