নারী-পুরুষ কেউই রক্ষা পাচ্ছেন না: সাইবার ক্রাইম মহা আতঙ্ক, অপরাধীদের রুখবে কে?

নারী-পুরুষ কেউই রক্ষা পাচ্ছেন না: সাইবার ক্রাইম মহা আতঙ্ক, অপরাধীদের রুখবে কে?
উত্তরদক্ষিণ । ১৪ আগস্ট ২০২২

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১৪ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১২:২০

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দেশে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। গ্রাম থেকে শহর সবর্ত্রই যার রেশ দেখা যায়। মোবাইল ফোনের আধিক্য ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা দেশের উন্নয়ন অগ্রগতিকে দারুণভাবেই প্রকাশ করে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে অবাধ ইন্টারনেট শঙ্কা বাড়াচ্ছে দিনকে দিন। সাইবার অপরাধীরা প্রতিনিয়তই ঘটাচ্ছে কোনো না কোনে অপরাধের ঘটনা। ভুক্তভোগীদের প্রায় ৭৫ শতাংশই নেয় না কোনো আইনের আশ্রয় যা শঙ্কা বাড়াচ্ছে বহুগুণে। বিস্তারিত লিখেছেন আসাদ এফ রহমান

দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছেই। আর এর সবচেয়ে বড় অংশই হচ্ছে ১৮-৪০ বছর বয়সী। অফিস-আদালত, ব্যবসা সংক্রান্ত কর্মকান্ড, যোগাযোগ ছাড়াও এসকল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সিংহভাগই সময় ব্যয় করেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বাড়ছে সাইবার ক্রাইম। আর এসকল মাধ্যমে তথা (ফেসবুক, টিকটক, ইন্সট্রাগ্রাম, টুইটার) অপপ্রচারের প্রবণতা বাড়তে শুরু করেছে। ছবি বিকৃত করে অপপ্রচার, পর্নোগ্রাফি কনটেন্ট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার এবং অনলাইনে-ফোনে মেসেজ পাঠিয়ে হুমকি দিয়ে মানসিক হয়রানির ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। এসকল অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের ৫০.২৭ শতাংশ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগেরই বয়স ১৮-৪০ বছরের মধ্যে, যার হার ৮০.৯০ শতাংশ। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের (সিসিএ ফাউন্ডেশন) ‘বাংলাদেশ সাইবার অপরাধ প্রবণতা-২০২২’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। জরিপে ২০২১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ২ মার্চ পর্যন্ত ব্যক্তি পর্যায়ে ভুক্তভোগী ১৯৯ জনকে ১৮টি প্রশ্ন করা হয়। সেই মতামতের ভিত্তিতে এই গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। শনিবার (১৩ আগস্ট) বেলা ১১টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে (ক্র্যাব) আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরেন গবেষণা দলের প্রধান ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের সিনিয়র লেকচারার মনিরা নাজমী জাহান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা কাজী মুস্তাফিজ। আলোচকদের মধ্যে ছিলেন ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবির প্রেসিডেন্ট মো ইমদাদুল হক, প্রযুক্তিবিদদের আন্তর্জাতিক সংগঠন আইসাকা ঢাকা চ্যাপ্টারের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন ও ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার সুলতানা ইশরাত জাহান।

সিসিএ ফাউন্ডেশন

দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ১২ কোটি ৬২ লাখ: সম্প্রতি বহুল প্রতীক্ষিত জনশুমারি ও গৃহগণনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে পাঁচ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সীদের মধ্যে ৬৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ পুরুষের ও ৪৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ নারীর নিজ ব্যবহারের মোবাইল ফোন রয়েছে। এছাড়া ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সীদের মধ্যে নিজ ব্যবহারের মোবাইল রয়েছে ৮৬ দশমিক ৭২ শতাংশ পুরুষের ও ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ নারীর। এছাড়াও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) গত জুনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২ কোটি ৬২ লাখ ১০ হাজার। তাদের মধ্যে মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন ১১ কোটি ৫০ লাখ ৭০ হাজার এবং আইএসপি ও পিএসটিএন মিলিয়ে ১ কোটি ১১ লাখ ৪০ হাজার।

৭৩.৪% ভুক্তভোগীই নেয় না আইনের আশ্রয়: মনিরা নাজমী জাহান বলেন, হয়রানির শিকার হওয়ার পর ভুক্তভোগীদের ৭৩ দশমিক ৪ শতাংশই আইনের আশ্রয় নেন না। এ ছাড়া আইনের আশ্রয় নেওয়া ভুক্তভোগীদের মাত্র ৭ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ আইনি সেবার প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, লোকলজ্জার ভয়সহ বিভিন্ন কারণে অপরাধের বিষয়ে ভুক্তভোগীরা কোথাও অভিযোগ করেন না।

সিংহভাগই শিকার সাইবার বুলিংয়ের: জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগই সাইবার বুলিংয়ের শিকার। জরিপে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়া ভুক্তভোগী কিছুটা বেড়ে ৫০.২৭ শতাংশ হয়েছে, যা গতবারের প্রতিবেদনে ছিল ৫০.১৬ শতাংশ। এবার দেশে সাইবার অপরাধের মধ্যে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে সামাজিক মাধ্যমসহ অন্যান্য অনলাইন একাউন্ট হ্যাকিং বা তথ্য চুরি। এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে অপপ্রচার চালানো এবং অনলাইনে পণ্য কিনতে গিয়ে প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগীর সংখ্যা চোখে পড়ার মতো।

অপরাধের শীর্ষে অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং ও অপপ্রচার: জরিপে সাইবার অপরাধের তুলনামূলক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রথম স্থানে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ অন্যান্য অনলাইন অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের ঘটনা, যার হার ২৩.৭৯ শতাংশ। ২০২১ সালের প্রতিবেদনে এই হার ছিল ২৮.৩১ শতাংশ, যা এবারের তুলনায় ৪.৫২ শতাংশ বেশি। তবে চিন্তার বিষয় এই যে, গতবারের প্রতিবেদনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচারের ঘটনা ছিল ১৬.৩১ শতাংশ। কিন্তু এবার তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ১৮.৬৭ শতাংশ, যা গতবারের তুলনায় ২.৩৬ শতাংশ বেশি।

যৌন হয়রানির পরিমাণ বাড়ছেই : যৌন হয়রানির পরিমাণ গতবার ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ ছিল, কিন্তু সেটা এবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশে এবং ফটোশপে ভুক্তভোগীর ছবি বিকৃত করে হয়রানির ঘটনা গতবারের প্রতিবেদনে ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ পাওয়া গেলেও এবার তা ১ দশমিক ০৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

ভুক্তভোগীদের অর্ধেকেরও বেশি নারী: তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে পরিলক্ষিত হয়েছে, নারী ও পুরুষের মধ্য সাইবার অপরাধে আক্রান্ত হওয়ার মাত্রায় ভিন্নতা রয়েছে। পুরুষের তুলনায় নারীরা সাইবার অপরাধের শিকার বেশি হয়েছেন। সাইবার অপরাধের ভুক্তভোগীদের জেন্ডারভিত্তিক পার্থক্য করলে দেখা যায়, ভুক্তভোগীদের মধ্যে পুরুষ ৪৩.২২ শতাংশ এবং নারী ৫৬.৭৮ শতাংশ। এছাড়াও পুরুষের তুলনায় নারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হয়রানি এবং পর্ণগ্রাফির শিকার বেশি হয়েছেন। অন্যদিকে নারীদের তুলনায় পুরুষরা মোবাইল ব্যাংকিং/এটিএম কার্ড হ্যাকিংয়ের শিকার বেশি হয়েছেন এবং অনলাইনে পণ্য কিনতে গিয়ে পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক আইন সম্পর্কে জানেন ৪৩.২২ শতাংশ। বাকি ৫৬.৭৮ শতাংশ ভুক্তভোগীর দেশে বিদ্যমান আইন সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই।

সিসিএ ফাউন্ডেশনের গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরছেন বক্তারা

ভুক্তভোগীরা মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত: সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা কাজী মুস্তাফিজ বলেন, গবেষণায় সাক্ষাৎকার নেয়ার সময় ভুক্তভোগীরা মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিলেন। তারা কোথাও প্রতিকার না পেয়ে সিসিএ ফাউন্ডেশনের কাছে সহায়তা চান। কিন্তু ভার্চুয়াল জগতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেলে আর বেশি কিছু করার থাকে না। মূলত সাইবার অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই সচেতন হওয়া জরুরি।

ঝুঁকির বিষয়ে সচেতনতা কম : আইএসপিএবির পরিচালক সাকিফ আহমেদ বলেন, দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বেশিরভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে ভুক্তভোগী। শিশুদের পরিস্থিতি আরও আশঙ্কাজনক। একটা ইন্টারনেট সংযোগ একই সময়ে পরিবারের ১৩-১৪ জন্য ব্যক্তি ব্যবহার করেন। কিন্তু সবাই ঝুঁকির বিষয়ে সচেতন নন। এ ধরনের অপরাধ থেকে বাঁচতে সচেতনতার বিকল্প নেই।

‘পুলিশ প্রশাসনকেও রাখতে হবে আরও কার্যকর ভূমিকা’: সাবেক অডিটর জেনারেল ও প্রযুক্তিবিদদের আন্তর্জাতিক সংগঠন আইসাকা ঢাকা চ্যাপ্টারের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন বলেন, ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সীরা শুধু ভুক্তভোগীই নয়, অপরাধীরাও বেশিরভাগ এই বয়সী। প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে যেসব সাইবার অপরাধ ঘটে সেসবের তথ্য পাওয়া যায় না। বর্তমানে গুজবও একটা মারাত্মক বিষয়। আন্তর্জাতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে প্রকাশিত সংবাদের ৮০ শতাংশ অসত্য। এজন্য সচেতনতামূলক কাজের পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনকেও আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার সুলতানা ইশরাত জাহান বলেন, অনেকে সাইবার অপরাধের শিকার হয়েও অভিযোগ করেন না। কিন্তু পুলিশ প্রশাসনকে আইন মেনেই কাজ করতে হয়। তাই আইনি প্রতিকারের বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং অপরাধের শিকার হলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় অথবা সিআইডি অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। তাহলে আইনি প্রতিকার মিলবে।

উত্তরদক্ষিণ । ১৪ আগস্ট ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

গবেষণায় আট দফা সুপারিশ: ব্যাপকভাবে সাইবার সচেতনতামূলক কার্যক্রম, জাতীয় বাজেটে সাইবার সচেতনতায় গুরুত্ব দেওয়া, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিএসআরে সাইবার সচেতনতা বাধ্যতামূলক করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাইবার পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা, সাইবার স্বাক্ষরতা বৃদ্ধি, সচেতনতামূলক কাজে রাজনৈতিক জনশক্তির সঠিক ব্যবহার, গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার ও অংশীজনদের সম্মলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলে সুস্থ সাইবার সংস্কৃতি গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading