মিয়ানমারে জান্তার মেয়াদ বৃদ্ধি: রোহিঙ্গা সংকটে বিরূপ প্রভাবের শঙ্কা
ড. দেলোয়ার হোসেন । রবিবার, ১৪ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১২:১০
মিয়ানমারের ইতিহাসে সামরিক স্বৈরতন্ত্রের প্রভাব সবারই জানা। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই দেশটিতে সামরিক জান্তার আধিপত্য চলে আসছে। ২০১৫ সালে অং সান সু চির নেতৃত্বে বেসামরিক সরকার গঠিত হলেও তাথমাদাওই (মিয়ানমার সেনাবাহিনী) ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। অং সান সু চির এনএলডি এবং সেনাবাহিনী এক ধরনের হাইব্রিড শাসনের মাধ্যমে দেশ চালাচ্ছিল; কিন্তু ২০২০ সালের নভেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে জান্তা-সমর্থিত ইউএসডিপির ভরাডুবির পর তাথমাদাও নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ আনে এবং সেনাসমর্থিত নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে। নির্বাচনে কারচুপি ও দেশব্যাপী গণবিক্ষোভের ফলে দেশটিতে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।
দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতির দোহাই দিয়ে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক সেনাঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেনাবাহিনী জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে এবং দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা জারি করে। নির্বাচনের ফলাফলকে ভূলুণ্ঠিত করা এবং গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে দমনের জন্য সেনাবাহিনী অং সান সু চিসহ তার দলের অন্য নেতাদের গ্রেপ্তার করে।
দুঃখজনক যে, এনএলডি এবং অং সান সু চি তাদের ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের শাসনামলে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ থেকে সেনাবাহিনীকে রক্ষা করে এবং তাদের বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ অস্বীকার করে। এমনকি ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত নির্মম অত্যাচারের পর তাথমাদাও-এর বিরুদ্ধে যখন বিশ্বসমাজ গণহত্যার অভিযোগ তোলে, তখন অং সান সু চি সেটি অস্বীকার করেন এবং সেনাবাহিনীর পক্ষে বিবৃতি দেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই সেনাবাহিনীর হাতেই তাকে গ্রেপ্তার হতে হয় এবং নির্বাচনে জয়লাভের পরও এনএলডিকে সরকার গঠন করতে দেওয়া হয়নি।
যাহোক, ফেব্রুয়ারির সেনা অভ্যুত্থানের পরে তাথমাদাও প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক ও জাতিগত শক্তিগুলোকে দমনের মাধ্যমে তার ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে দেশের মধ্যে অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ আরও বাড়িয়ে দেয়। দমন, নিপীড়ন এবং গৃহবন্দি থেকে শুরু করে এমন কোনো অপরাধ নেই, যা জান্তা-সরকার করেনি। অন্যদিকে, এনএলডি অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করে। এনএলডি গঠিত পিপলস ডিফেন্স ফোর্সসহ বিভিন্ন জাতিগত ও আঞ্চলিক সশস্ত্রগোষ্ঠী জান্তা-সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করে। ফলস্বরূপ দেশব্যাপী সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। মিয়ানমার সেনাবাহিনী তার আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে এবং বিরোধী শক্তি দমনে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যায়।
এ পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং সামরিক শাসনকে চিরস্থায়ী করতে তৃতীয়বারের মতো দেশটিতে জরুরি অবস্থার মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়িয়ে দেন এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা পরিষদ তার অনুমোদন দিয়েছে। ২০২১ সালের ১ আগস্ট মিন অং হ্লাইং নিজেকে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এবং তিনি যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন করেছিলেন, নিজেকে তার প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ঘোষণা দেন। পদাধিকার বলে তিনি নির্বাহী, আইন প্রণয়ন এবং বিচার বিভাগের প্রধান হন। তিনি ২০২৩ সালের আগস্টে নতুন নির্বাচন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, জান্তা-সরকার কেন সামরিক শাসনের মেয়াদ বৃদ্ধি করল এবং এর ফলাফল কী হতে পারে? প্রথমত, জরুরি অবস্থার মেয়াদ ছয় মাস বাড়িয়ে দেওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো, সামরিক শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করা এবং এর মাধ্যমে সামরিক স্বৈরতন্ত্রকে চিরস্থায়ীকরণের পথ সুগম করা।
মিন অং হ্লাইংয়ের লক্ষ্য হলো, ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করা। জান্তা-সরকারের সামরিক শাসনের মেয়াদ বৃদ্ধির এ সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। এটি যেমন মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন আনবে, তেমনি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এর তাৎপর্য রয়েছে। অধিকন্তু, এটি রোহিঙ্গা সংকটকে আরও বেশি জটিল করে তুলতে পারে। প্রথমত, জরুরি অবস্থার মেয়াদ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব হলো, এটি সামরিক জান্তার ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে, যা প্রকারান্তরে স্থায়ী সামরিক শাসনের পথকে সুগম করবে। দ্বিতীয়ত, তাথমাদাওয়ের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শাসন স্থায়ীকরণের কারণে প্রভাব পড়বে দেশটির রাজনৈতিক অবস্থার ওপর। মিয়ানমারের জনগণ সামরিক স্বৈরতন্ত্রকে মেনে নেবে না।
আরও শঙ্কার ব্যাপার হলো, সামরিক জান্তার ক্ষমতা স্থায়ীকরণ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করবে। সামরিক জান্তার ক্ষমতার দীর্ঘায়ন এবং সামরিক শক্তি বৃদ্ধি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য হুমকি সৃষ্টি করবে। সর্বোপরি, জান্তা-সরকারের এ সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে আসিয়ানের জন্য এটি হতাশাজনক; কারণ, দেশটিতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে ইতঃপূর্বে সংস্থাটির সঙ্গে জান্তা-সরকারের একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল।
লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
ইউডি/অনিক

