বৈশ্বিক সংকট ও বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন: খাদ্য নিরাপত্তায় উজ্জ্বল বাংলাদেশ

বৈশ্বিক সংকট ও বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন: খাদ্য নিরাপত্তায় উজ্জ্বল বাংলাদেশ
উত্তরদক্ষিণ । ২০ আগস্ট ২০২২

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ২০ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১১:৪৫

বিশ্বজুড়ে চলছে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট। মহামারি করোনা ভাইরাসের রেশ কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক পরিস্থিতি আরও নাজুক করে ফেলেছে। একের পর এক বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেশে দেশে খাদ্য সংকটকে তীব্র করেছে। যার ফলে বিশ্বের ১৫০-এর অধিক দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে নজীরবিহীন ভাবে। তবে, বাংলাদেশ সঠিক পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে বেশ ভালো ভাবেই এ ধরনের সংকট মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক। সম্প্রতি এক বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি বলেছে বাংলাদেশে কোনো খাদ্য ঘাটতি নেই। বিস্তারিত লিখেছেন সাদিত কবির

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব সময়ই বলে এসেছেন দেশের এক বিন্দু জমিও যেন খালি না পড়ে থাকে, যেখানেই খালি জমি থাকবে সেখানেই চাষ করুন। বাংলাদেশ যেন খাদ্যে পরনির্ভরশীল না থাকে। তিনি কেনো সবাইকে অনবরত এ আহ্বান জানিয়েছেন এবার তার উত্তর এলো বিশ্বব্যাংক থেকে। গোটা বিশ্ব যখন খাদ্য সংকটকে প্রত্যক্ষ করছে ঠিক সেই মুহূর্তে বাংলাদেশে কোনো খাদ্য সংকট নেই। আর দক্ষিণ এশিয়ায় বেশ দাপটের সঙ্গেই এই সংকটকে মোকাবেলা করছে বাংলাদেশ।

সরকারের নেয়া পদক্ষেপের প্রশংসা বিশ্বব্যাংকের : সর্বোচ্চ পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির কবলে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলো মূল্যস্ফীতির তোপের মুখে পড়লেও বাংলাদেশ সুবিধাজনক জায়গায় আছে। কারণ, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ খাদ্য ঘাটতি হয়নি। তবে খাদ্য ও খাদ্য বহির্ভূত খাত মিলে দক্ষিণ এশিয়ায় গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১৫ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। মূলত খাদ্য ঘাটতিই এর প্রধান কারণ বলে মনে করছে সংস্থাটি। খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি। বিশ্বব্যাংক জানায়, শ্রীলঙ্কায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮০ শতাংশ, পাকিস্তানে ২৬ শতাংশ ও বাংলাদেশে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ সরকার খাদ্য নিরাপত্তার উদ্বেগ মোকাবিলায় চাল আমদানিতে শুল্ক কমিয়েছে। এছাড়া কৃষি খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়েছে, সারে ভর্তুকি বৃদ্ধির পাশাপাশি রপ্তানিকারকদের নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। সংস্থাটি জানায়, সারের অভাব ও তাপপ্রবাহের কারণে পাকিস্তানে গম ও চালের উৎপাদন কিছুটা কমেছে। ভুটান ও শ্রীলঙ্কায় উল্লেখযোগ্য খাদ্য সরবরাহের ঘাটতি রয়েছে। শ্রীলঙ্কায় কৃষি উৎপাদন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কম হয়েছে। সারের ঘাটতি ও খাদ্য আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রভাবে এ অবস্থা হয়েছে। সার ও জ্বালানির ঘাটতি খাদ্য সরবরাহকে আরও সীমিত করবে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংক

আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষি গবেষণা ও শিক্ষায় সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। একই সঙ্গে উচ্চ প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বিনিময় জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন। গত মার্চে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৩৬তম আঞ্চলিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা তাঁর করা সুপারিশে এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে কৃষি গবেষণা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো উচিত। শেখ হাসিনা তাঁর দ্বিতীয় সুপারিশে বলেন, কৃষি খাতে জৈব, ন্যানো, রোবোটিকসের মতো উচ্চ প্রযুক্তির হস্তান্তর ও বিনিময় এ অঞ্চলে এফএওর সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে জোরদার করতে হবে। তৃতীয় সুপারিশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেহেতু আধুনিক কৃষির জন্য প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন, সে জন্য কৃষি খাতে অর্থায়ন ও সহায়তার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা যেতে পারে।

কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক

নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তায় কাজ করছে সরকার : কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সকলের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চয়তা দিতে নিরলসভাবে কাজ করছে। সরকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। যান্ত্রিকীকরণে নেওয়া হয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকার বৃহৎ প্রকল্প। এর মাধ্যমে সারাদেশে অঞ্চলভেদে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে কৃষকদের প্রায় ৫২ হাজার কৃষিযন্ত্র দেয়া হচ্ছে। এটি সারাবিশ্বের একটি বিরল ঘটনা।

সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্নতা দাম বাড়ার কারন : খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিরলসভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেছেন, খাদ্য নিরাপত্তা সবসময়ই একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। প্রাকৃতিক সম্পদের স্বল্পতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্বের কিছু অংশে সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য ও ক্ষুধা বাড়ছে। বিশ্বের অনেক দেশ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন। সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন হওয়ায় খাদ্যের দামও বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, বেসরকারি খাত, উৎপাদক এবং ভোক্তাদের সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব নিতে হবে।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান

আগস্ট মাসই দুর্দশার শেষ মাস : পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, চলতি আগস্ট মাসই দুর্দশার শেষ মাস। আগামী মাস থেকে এসব সমস্যা থাকবে না। তিনি আরও বলেছেন, জ্বালানি তেল ও জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের ঘাটতিতে দেশের মানুষর কষ্টে আছেন। মানুষের কষ্ট দেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও কষ্ট পান। পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘মানুষের কষ্ট দেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও কষ্ট পান। আমরা সাময়িক অসুবিধায় আছি। তবে এই মাসই দুর্দশার শেষ মাস। আগামী মাস থেকে এসব সমস্যা থাকবে না। আমরা আবার উন্নয়নের দিকে যাব। জিনিসপত্রের দাম মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা হবে।

১৫৩ দেশে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি ৮১ শতাংশ: খাদ্য খাতে বিশ্বের ১৫৩টি দেশের মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮১ শতাংশ। যার ফলে বিশ্বব্যাপী খাদ্য ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের মুদ্রাস্ফীতি অব্যাহত রয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাস্ফীতির ফলে ধনী দেশগুলোতেও খাদ্যের দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির দাবি, গত দুই সপ্তাহে কৃষি, খাদ্যশস্য ও রপ্তানি মূল্য সূচকগুলো স্থিতিশীল ছিল। তবে কৃষি ও খাদ্যশস্যের মূল্য সূচক গত দুই সপ্তাহের তুলনায় এক শতাংশ বেশি। সারাবিশ্বে দেশীয় খাদ্য মূল্যের মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। প্রায় সব নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি অব্যাহত রয়েছে। এর প্রভাবে ধনী দেশগুলোতেও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছে। সংস্থাটি আরও জানায়, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুলাই মাস সময়ে প্রায় সমস্ত নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কবলে পড়েছে। খাদ্য খাতে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ৯২ দশমিক ৯, নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে ৯২ দশমিক ৭ এবং উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ৮৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। পৃথিবীর সব দেশেই এই সময়ে গড় জাতীয় মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের ওপরে দেখা গেছে। অনেক দেশ দ্বিগুণ মুদ্রাস্ফীতির সম্মুখীন হয়েছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতিসহ উচ্চ আয়ের দেশগুলোর শেয়ারও বেড়েছে তীব্রভাবে। প্রায় ৮৩ শতাংশ উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির সম্মুখীন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ আফ্রিকায়, উত্তর আমেরিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্য এশিয়া। বিশ্বব্যাংক জানায়, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ চললেও বর্তমানে ইউক্রেন থেকে সারাবিশ্বে খাদ্য রপ্তানি শুরু হয়েছে। তবে এতে করেও খাদ্য সংকট কাটছে না। বিশ্বে খাদ্য ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে মুদ্রাস্ফীতি অব্যাহত রয়েছে। এর প্রভাব ধনী দেশগুলোতেও খাদ্যের দাম বাড়ছে। খাদ্যের অধিক দামের কারণে বিশ্বের কয়েকটি দেশ বিপাকে পড়েছে। ফলে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সারের মূল্য কমানোসহ বেশ কিছু সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রকৃত অর্থে বিশ্বে ১৫৩টি দেশে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮১ শতাংশ। খাদ্য খাতের মূল্যস্ফীতির কারণে সামগ্রিকভাবে অন্যান্য চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে এসব দেশে জনগোষ্ঠীরা।

বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা অতীব জরুরি : বিশ্বব্যাংক জানায়, বিশ্বে খাদ্য সংকট মোকাবিলায় বিপাকে পড়া দেশগুলোর উচিত বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা বা সারের ওপর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা। সার ব্যবহার করতে হবে আরও দক্ষভাবে। কৃষকদের উপযুক্ত প্রণোদনা দিতে হবে ফলে অতিরিক্ত শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। কৃষিতে সর্বোত্তম ও নতুন প্রযুক্তির সংযোজন করতে হবে।

উত্তরদক্ষিণ । ২০ আগস্ট ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও খাদ্য ঘাটতির দেশ, দুর্ভিক্ষের দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। এই খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলা করা হয়েছে হয় খাদ্য আমদানি করে অথবা বিদেশি সাহায্য দিয়ে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর সাড়ে সাত কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কৃষিকেই মূল চাবিকাঠি মনে করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘খাদ্যের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। আমাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য নিজেদেরই উৎপাদন করতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই লক্ষ্যেই বারবার কৃষিতে গুরুত্ব দিয়েছেন। আর যার ফলাফল বিশ্ব সংকটকালীন সময়েও বাংলাদেশে নেই কোনো খাদ্য ঘাটতি। বিশ্বব্যাংকের এই ভাষ্য জাতি ও দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মর্যাদা ও অবস্থান বিশ্বে আরও জোড়ালো ভাবে স্পষ্ট করে।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading