ধান-চালের অপচয়: দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি

ধান-চালের অপচয়: দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ২০ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১৩:১৫

চাল নিয়ে এখন হই-চই চলছে। কারণ চাল আছে, আবার চাল নেই। তার মানে সরবরাহে কোথায়ও একটা ফাঁক তৈরি হয়েছে। দেশে চালের চাহিদা এবং মাথাপিছু চাল খাওয়ার পরিমাণ নিয়ে রয়েছে বিভ্রান্তি। বিতর্ক আছে ধান উৎপাদনের প্রকৃত পরিমাণ এবং তার থেকে চাল পাওয়ার পরিমাণ নিয়েও। বলা হচ্ছে, চালের উৎপাদন বাড়ছে, যার বিপরীতে মাথাপিছু ভোগ কমছে। এতে চাহিদার তুলনায় দেশে চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা। অথচ বাস্তবে দেশে এখন ঘাটতি বিরাজ করছে।

চাল অতি স্পর্শকাতর পণ্য। তাই এর প্রকৃত উৎপাদন ও মজুদ নিয়ে সঠিক পরিকল্পনার জন্য মাথাপিছু চাল ভোগের বা ব্যবহারের সঠিক তথ্য থাকা জরুরি। কেননা, ভোগের তথ্য অনুযায়ীই চালের চাহিদা নিরূপণ করা হয়। একই সঙ্গে নেয়া হয় মজুদ উদ্যোগ। সেখানে সঠিক তথ্য না থাকলে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন পর্যায়ে গলদঘর্ম হতে হবে।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাস্তবে চালের মাথাপিছু ভোগ এবং বাৎসরিক চাহিদার প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই, যার ওপর নির্ভর করে সরকার তার বাৎসরিক ক্রয় পরিকল্পনা গ্রহণ এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় পদক্ষেপ নেবে। ধান এবং চাল নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সংস্থার রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব। প্রকৃত উৎপাদন তথ্যও পরিষ্কার নয়। কৃষি মন্ত্রণালয় ধানের যে হিসাব দেখায়, ওই হিসাবকেই খাদ্য মন্ত্রণালয় চাল হিসেবে দেখায়। অথচ এক কেজি ধানে কত গ্রাম চাল হয় বা এক মণ ধান থেকে কত কেজি চাল পাওয়া যায়- সে হিসাবটিও জনসমক্ষে পরিষ্কার করা হচ্ছে না। তাছাড়া ধান-চালের উৎপাদনের তথ্য সাধারণত মাঠ পর্যায়ের হিসাব। মাঠের এই ধান ভোক্তা পর্যায়ে আসতে নানা মাত্রায় আগে-পরে উৎপাদন ক্ষতি হয়। সেই ক্ষতির পরিমাণ ৮-১০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর বাইরে প্রাণিখাদ্য হিসেবেও চালের কয়েক লাখ টন ভোগ হয়, যার হিসাব ব্যবস্থাপনায় আমলে আনা হয় না। এ জন্য উৎপাদন ও ভোগ সব ক্ষেত্রেই সঠিক তথ্য থাকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য ধান তথা চাল। কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী বর্তমানে দেশে চালের উৎপাদন ৩ কোটি ৮৬ লাখ টন। এর এক উল্লেখযোগ্য অংশ ৮০ লাখ ৮৬ হাজার টন অপচয় হয়। এ হিসাব বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট-ব্রির। ব্রির গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১-১৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে উৎপাদন পর্যায়ে ধানের গড় ফলন নষ্ট হয়েছে ২০ দশমিক ৬৭ শতাংশ অর্থাৎ এক-পঞ্চমাংশের বেশি। ব্যবস্থাপনা ত্রুটি অর্থাৎ কর্তন, মাড়াই, পরিবহন, গুদামজাতকরণ প্রভৃতি কারণে বছরে নষ্ট হচ্ছে ৬৭ লাখ মেট্রিক টন চাল। গৃহস্থালি পর্যায়ে অপচয় হয় আরও ১৩ লাখ ৮৬ হাজার টন, যার মধ্যে খাবার টেবিলেই অপচয় হয় অন্তত ৬ লাখ ৩০ হাজার টন চাল।

শুধু খাবার টেবিলের অপচয় রোধ হলেই ৪২ লাখ ৬২ হাজার মানুষের সারা বছরের ভাতের চাহিদা মেটানো যাবে। ফলন-পার্থক্য আন্তর্জাতিক মানে নামিয়ে আনতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে চাল আমদানির বদলে উল্টো রপ্তানি করা সম্ভব হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধানের ফলনের স্ট্যান্ডার্ড অপচয় ধরা হয় ৫ থেকে ৭ শতাংশ। চীন ও জাপানে ফলন-পার্থক্য ৫ শতাংশের কাছাকাছি। আমাদের দেশে ফলন নষ্টের পরিমাণ ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারলে কমপক্ষে ৫০ লাখ টন বাড়তি চাল পাওয়া যাবে। এ ছাড়া আমরা বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানে, রেস্টুরেন্টে, খাবার প্লেটে প্রচুর অপচয় করি। শুধু ভাত নয়, অন্য খাবারও অপচয় হয়। কত দীর্ঘ পরিভ্রমণ ও পরিশ্রমের মাধ্যমে একটি শস্যদানা খাবার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছায়, সেই উপলব্ধি থাকলে কেউ খাবার নষ্ট করত না।

দেশে চাহিদার চেয়ে বেশি চাল উৎপাদন সত্ত্বেও এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নানা কারণে নষ্ট ও অপচয় হওয়ায় বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ চাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। চাল ও গমের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বৃদ্ধি পেলে দেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি হয়। বিদেশ থেকে খাদ্যপণ্য বিশেষ করে চাল ও গম আমদানি এড়াতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত উচ্চ সোপানে ওঠার সুযোগ পাবে। চাল-গম আমদানির টাকা শিল্প খাতে ব্যয় হলে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। দারিদ্র্য মোচনে যা ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading