রেড অ্যালার্ট : হুমকির মুখে ইউরোপের নদনদী
ইবনুল সাইদ । শনিবার, ২০ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১৩:৪০
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারা বিশ্বের প্রকৃতিই আগ্রাসী হয়ে উঠছে। আবহাওয়া-প্রকৃতি মোটেই মানববান্ধব থাকছে না। বরং চরম আতঙ্কের আবর্তে ঘিরে নিচ্ছে। অসময়ে চরম গরম। টানা খরা-অনাবৃষ্টি। হঠাৎ অল্প সময়েই অতিবৃষ্টি। তীব্র শীত। আকস্মিক ঢল-বন্যা। ঘন ঘন বজ্রপাত-বজ্রঝড়। সাগরে নিম্নচাপ-ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস। উপকূলে অস্বাভাবিক প্রবল জোয়ার। এভাবে বছর জুড়ে চরম-ভাবাপন্ন অবস্থার মধ্য দিয়েই অতিক্রান্ত হচ্ছে আবহাওয়া। এক্ষণে সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্হিতিতে পতিত ইউরোপ। গোটা ইউরোপ পুড়ছে খরায়। এখন এক সময়ের প্রমত্তা নদীগুলোর পানি প্রবাহ শুকিয়ে যাচ্ছে।
গ্রীষ্মের রেকর্ড দাবদাহে শুকিয়ে যাচ্ছে ইউরোপের অনেক নদ-নদী-জলাধার। ফ্রান্সের দীর্ঘতম নদী লয়ারের কিছু জায়গায় এখন পায়ে হেঁটে পার হওয়া যায়। এই নদীটি এর আগে কখনো এতটা শুষ্ক হয়নি। ইতালির পো নদীর পানি প্রবাহ তলায় ঠেকেছে। যার প্রভাব পড়ছে চাষাবাদে। কয়েক শ বছর ধরে জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ রাইন নদী। কিন্তু চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে জাহাজ চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। মধ্য ইউরোপের সঙ্গে কৃষ্ণসাগরের সংযোগ ঘটানো সার্বিয়ার দানিউব নদীতে এখন খনন শুরু হয়েছে। এর ফলে ইউরোপের জ্বালানি-শস্যসহ অন্যান্য বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্প, পণ্য পরিবহন, বিদ্যুত ও খাদ্য উতপাদনে।
ইউরোপীয় কমিশনের যৌথ গবেষণাকেন্দ্র (ইসি-জেআরসি) সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ইউরোপের এবারের খরা গত ৫০০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক হতে পারে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ৬০ শতাংশ এলাকা খরা মোকাবিলা করছে। ইইউর বাইরে যুক্তরাজ্যসহ মহাদেশের অর্ধেক অংশ খরার প্রভাবে ভুগছে। পশ্চিম, মধ্য ও দক্ষিণ ইউরোপ জুড়ে প্রায় দুই মাস ধরে কোনো উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়নি এবং বড় মাত্রায় বৃষ্টিপাত হবে তার কোনো পূর্বাভাসও নেই। জলবায়ুর পরিবর্তনে চরম আগ্রাসী খরা অনাবৃষ্টির কারণে ইউরোপে কেবল নদীভিত্তিক পরিবহনব্যবস্হাই সংকটে নয়, তৈরি হয়েছে আরো নানা সমস্যা। রোন ও গ্যারোন নদীর পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় তা দিয়ে পারমাণবিক চুল্লিগুলো যথেষ্ট শীতল করতে পারছে না ফ্রান্স। এতে দেশটিতে বিদ্যুৎসংকট আরো বেড়ে গেছে। ইতালির পো নদীতে পানি কমে যাওয়ায় ধানখেতে সেচ দেওয়া দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। ২ হাজার বছরে সবচেয়ে বড় বিপদে পড়েছে ইতালি। ইউরোপের ১৫ শতাংশ অঞ্চলে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। ব্রিটেনে গাছের ডালেই সিদ্ধ হচ্ছে আপেল।
ব্লুমবার্গ জানায়, জার্মানির রাইন নদীর পানির স্তর নিচের দিকে নামে প্রতি বছর অক্টোবরের শেষ দিকে। এবার অনেক আগেই আশঙ্কাজনক হারে পানি কমতে শুরু করে। প্রয়োজনীয় গভীরতার অভাবে পণ্যবাহী নৌযান ও ফেরি চলাচল বন্ধ প্রায়। খরার কারণে নদীর পানির তাপমাত্রাও অত্যাধিক বেশি। জার্মানির পরিবেশমন্ত্রী স্টেফি লেমকি পরিস্হিতিকে বিপর্যয়কর আখ্যা দিয়ে বলেন, একটি পরিবেশগত বিপর্যয় সন্নিকটে। বার্তা সংস্হা এএফপি জানায়, চলতি বছরের পরিস্থিতি পুরোপুরি বিশ্লেষণ করলে কারণ দেখা যায় যে গত ৫০০ বছরে ২০১৮ সালের খরার মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়নি। আর এই অবস্থা এ বছর আরও খারাপ হবে।
দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, তীব্র খরার কবলে ইউরোপ, যা এ মহাদেশ জুড়ে বাড়িঘর, কারখানা, কৃষক এবং মালামাল পরিবহনের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করছে। এমনকি পানির ঘাটতি নিয়ে সতর্ক থাকতে বলা হচ্ছে। ইউরোপের ৪৫ শতাংশ অঞ্চল জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকেই খরার সতর্কতার অধীনে ছিল। গার্ডিয়ান ও ডয়চেভেলের খবরে বলা হয়, উত্তর ইতালির ‘প্রাণভোমরা’ ছিল ৬৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ পো নদীটি। তুরিন, ক্রেমোনা, পিয়াসেঞ্জা এবং ফেরারা শহরের ভেতর দিয়ে কলকল শব্দে বয়ে যাওয়া দেশের দীর্ঘতম সেই নদীটি খরার কবলে পড়ে এখন মৃতপ্রায়। ইতালিতে খরা পরিস্হিতি এতটাই তীব্র যে, লম্বার্ডি, পিডমন্ট, ভেনেটো এবং এমিলিয়া-রোমাগনার নেতারা সম্প্রতি অঞ্চলটিতে জরুরি অবস্হা ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। কিছু উত্তরের শহরগুলোতে ট্রাকের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
গত ৭-৮ বছর ধরে ইউরোপে খরা লাগাতার যতটা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে, তা গত ২ হাজার বছরে একটি রেকর্ড। গোটা ইউরোপ মহাদেশে বেড়েছে তাপপ্রবাহের ঘটনা ও তীব্রতা বহু গুণ। বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্যই এটা হয়েছে। জলবায়ু সংকটের ক্রমবর্ধমান প্রভাবেরই প্রতিফলন এটি। খরা এখন গোটা ইউরোপের কপালের ভাঁজে পরিণত হয়েছে। যার জন্য দায়ী মানুষ। সাম্প্রতিক একটি গবেষণাপত্র এই উদ্বেগজনক তথ্য দিয়েছে।
লেখক: গবেষক।
ইউডি/অনিক

