শিক্ষার ব্যয়বৃদ্ধি: হতাশায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা

শিক্ষার ব্যয়বৃদ্ধি: হতাশায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা

ইয়াসমিন জাহান । রবিবার, ২৮ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১৪:৩০

বেশ কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল ও সন্তোষজনক বলে মনে করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে চালসহ নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দরিদ্র্য মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা সাম্প্রতিক সময়ের একাধিক জরিপে উঠে এসেছে। বিশেষত: শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেনীর আয় না বাড়লেও নানাভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শহুরে দারিদ্র্য বেড়েছে বলে পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চালসহ নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষকে তাদের আয়ের বেশীরভাগ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে। এর ফলে সুষমখাদ্য তথা পুষ্টির চাহিদা পুরণ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও বাসস্থানের মত গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ বা সংস্থান করতে পারছেনা সাধারণ মানুষ। দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে চলছে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা,অস্বাভাবিক হারে ও অযৌক্তিক প্রক্রিয়ায় পন্যমূল্য বৃদ্ধি দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিসহ করে তুলেছে। সরকার একদিকে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল ও দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুত ও পানির মূল্য বাড়িয়ে নিজেই পণ্যমূল্য বৃদ্ধিতে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে।

জাতি গঠনের প্রধান উপাদান শিক্ষা। আমাদের সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ের ২৬ থেকে ৪৭ ধারার ভেতরে নাগরিক অধিকারের কথা বিবৃত রয়েছে। শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অধিকার সমভাবে সব নাগরিক লাভ করবে তা স্পষ্ট করে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখছি? সাধারণত শিক্ষার সমান সুযোগ সবাই পাচ্ছে না। বিশেষায়িত ও উচ্চ শিক্ষায় বৈষম্য আরো প্রকট। মোটকথা শিক্ষার আলো থেকে দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী বঞ্চিত থাকছে। এর কারণ, শিক্ষার অতিরিক্ত ব্যয়। জীবনমানের সাথে সাথে শিক্ষার ব্যয়ও লাগামহীন বড়েছে। সাধারণ নাগরিক ও সীমিত আয়ের মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার চাপে এখন দিশাহারা।

উচ্চমাধ্যমিক পার হয়ে দেশের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। তাদের অধিকাংশই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে ছেলেমেয়ে। অনেকের বাবা-মা তাদের সঞ্চয়ের টাকা শেষ করে ছেলেমেয়েদের পড়ার খরচ দেন। এ প্রেক্ষাপটে বর্তমানে দেশে যেভাবে দফায় দফায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে, তাতে জীবিকার জন্য হিমশিম খেতে হচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে। আয় বাড়েনি, অথচ দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, গণপরিবহণ থেকে শুরু করে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যখন আকাশচুম্বী, তখন ছেলেমেয়ের শিক্ষা ব্যয় বহন করাটা অনেকের কাছে কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে।

অপরদিকে কাগজে-কলমে অলাভজনক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো টিউশন ফি বাড়িয়ে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে অনেক আগেই। এ পরিস্থিতিতে ব্যয়বহুল শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত না করে সাধারণ মানুষের অনুকূলে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীবান্ধব টিউশন ফি নির্ধারণ করতে হবে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশে গণপরিবহণের ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল এক বছরও হয়নি। আবারও নতুন করে সরকার জ্বালানি তেলের দাম ও গণপরিবহণের ভাড়া বাড়িয়েছে। করোনা মহামারিতে চাকরি হারিয়ে বেকার হয়েছে অনেকে, বেতন কমানো হয়েছে, ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসান গুনতে হয়েছে। তাদের অনেকেই হয়তো সেই সংকট ঠিকমতো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। দেশের এ পরিস্থিতিতে উচ্চমূল্যে শিক্ষাগ্রহণ করাটা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। চরম বেকারত্ব আর অস্বাভাবিক ব্যয়বহুল জীবনযাত্রা দেখে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। শিক্ষাকে সহজলভ্য করতে শিক্ষা ব্যয় কমিয়ে জীবনমানের উন্নয়ন করতে হবে। তা না হলে জনজীবন আরও বেশি দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং মেডিক্যাল কলেজ বা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়াশুনা করে তারা নামমাত্র ব্যয়ে পড়াশোনার সুযোগ পায়। অথচ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বেসরকারি মেডিক্যাল বা অন্য কলেজে শিক্ষার্থীরা সে সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে শিক্ষার ক্ষেত্রে একই পর্যায়ে ভারসাম্যহীন অবস্থা তৈরি হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের অপ্রতুলতায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছড়াছড়ি। শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন স্রেফ একটি পণ্য। এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় এবং দৃঢ় ভূমিকা প্রয়োজন।

লেখক: শিক্ষার্থী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading