প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকা: শ্রমিকদের জন্য কিছুটা স্বস্তির

প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকা: শ্রমিকদের জন্য কিছুটা স্বস্তির
উত্তরদক্ষিণ । ২৮ আগস্ট ২০২২

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২৮ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১৪:০০

অবশেষে থামল চা-শ্রমিকদের দাবি আদায়ের ধর্মঘট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বহুল প্রতিক্ষীত চা বাগান মালিকদের বৈঠকের পর নেয়া সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে আজ থেকে কাজে মনোযোগী হচ্ছেন তারা। শনিবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে চা শ্রমিকদের নতুন মজুরি ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৭০ টাকা করার ঘোষণা আসে। শুধু দৈনিক মজুরিই নয় পাশাপাশি অন্যান্য সুবিধা বাড়ানোর সিদ্ধান্তও হয়েছে এদিন। বিস্তারিত লিখেছেন সাইফুল অনিক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে চা বাগান মালিকদের বৈঠকে চা শ্রমিকদের মজুরি ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১৭০ টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের আনুপাতিক হারে অন্যান্য সুবিধা বাড়ানোর বিষয়েও সম্মতি দিয়েছেন চা বাগান মালিকরা বলে বৈঠক শেষে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস। প্রধানমন্ত্রী আজ রবিবার (২৮ আগস্ট) থেকে শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন এবং শিগগির শ্রমিকদের আগ্রহ অনুযায়ী তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সেও কথা বলবেন তিনি। শনিবার (২৭ আগস্ট) গণভবনে বিকাল থেকে শুরু হওয়া বৈঠক শেষে মজুরিসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের জানান মুখ্য সচিব।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে চা বাগান মালিকদের সাথে সভায় বক্তব্য রাখেন। (শনিবার, ২৭ আগস্ট ২০২২) -পিআইডি

মজুরির সঙ্গে অনুপাতিক হারে বাড়বে সুযোগ-সুবিধাও: মজুরি বাড়ানোর দাবিতে চা শ্রমিকরা ১৯ দিন ধরে ধর্মঘটসহ আন্দোলন করছেন। এরমধ্যে চা বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) নেতাদের সঙ্গে শনিবার বৈঠক করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; যেটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন শ্রমিকরা। আহমদ কায়কাউস জানান, বৈঠকে ১৩টি চা বাগানের মালিক উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন সবাইকে কাজে যোগ দিতে। আগামীকাল রবিবার) থেকে যেন কাজে যোগ দেন। তিনি জানান, ১৭০ টাকার সঙ্গে উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, রেশন, ভর্তুকিসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা অনুপাতিক হারে বাড়বে বলেও বৈঠকে সিদ্ধান্ত এসেছে। অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পাবেন চা শ্রমিকরা। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী শিগগির চা শ্রমিকদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কথা বলবেন। ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, শ্রমিকদের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী ১৭০ টাকা দৈনিক মজুরি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, এখানে ব্যাখ্যা করা দরকার, চা শিল্পে বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করা হয়, যেটা মালিকরা বহন করে। সেক্ষেত্রে যেটা আনুপাতিক হারে বেড়ে যাবে, যেমন নগদ মজুরি ১৭০ টাকার প্লাকিং বোনাস আনুপাতিক হারে বাড়বে। বার্ষিক ছুটি, বেতনসহ উৎসব ছুটি আনুপাতিক হারে বাড়বে। এগুলো সবগুলোতে টাকা দেওয়া হয়। তিনি জানান, অসুস্থতাজনিত ছুটি সেটাও বাড়বে আনুপাতিক হারে। ভবিষ্যৎ তহবিলে নিয়োগকর্তার চাঁদা, কাজে অনুপস্থিতি অনুযায়ী বার্ষিক উৎসব ভাতা সেটাও আনুপাতিক হারে বাড়বে। ভর্তুকি মূল্যে রেশন দেয়, যেটা ২৮ টাকা দিয়ে কিনে দুই টাকায় দেওয়া হয় শ্রমিকদের। এছাড়া চিকিৎসা সুবিধা, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকদের পেনশন, চা শ্রমিক পোষ্যদের শিক্ষা বাবদ ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ, গরু চরানো চকিদার ব্যয় এবং বিনামূল্যে বসতবাড়ি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ শ্রমিক কল্যাণ কর্মসূচি, বাসাবাড়িতে উৎপাদন প্রবৃত্তি বাবদ আয়। সবকিছু মিলিয়ে যেটা পড়ে, সেটার হিসাব তাৎক্ষণিক করতে পারেনি। তবে দেখা যাচ্ছে সেটা হয়তো সাড়ে চারশ থেকে ৫০০ টাকা দৈনিক পড়বে।

চা-বাগানমালিকদের ভাষ্য কী: বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান এন শাহ আলম গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বললাম। তিনি যে নির্দেশনাগুলো দিয়েছেন তার সবই আমরা মেনে নিয়েছি। আমি সব শ্রমিকের আহ্বান জানাই, তারা যেন আগামীকাল (আজ) থেকে কাজে যোগ দেন। গণভবনে বৈঠকে উপস্থিত একজন চা-বাগানমালিক গণমাধ্যমকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী দুই পক্ষের কথাই খুব মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। তিনি শ্রমিকদের প্রতি যেমন সহানুভূতিশীল ছিলেন তেমনি মালিকেরা যেসব সুযোগ-সুবিধা শ্রমিকদের দেন, সেসব শোনার পরে বলেছেন, এত সুবিধা দেয়া হচ্ছে, তা কেন প্রচার হচ্ছে না? শ্রমিকদের কী কী সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়, সেগুলো তুলে ধরেছেন ওই বাগানমালিক। তিনি বলেন, আমরা প্রতি মাসে একজন শ্রমিককে ২ টাকা কেজি দরে ৪৬ কেজি চাল দিই। যে স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা দেওয়া হয়, সেটির বাজারমূল্য সাড়ে সাত হাজার টাকা। এ ছাড়া তাদের থাকার জন্য পরিবারপ্রতি দেড় হাজার বর্গফুট জমিতে আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়।

দাবি আদায়ের ধর্মঘট চলাকালীন চা-শ্রমিকদের একাংশ। (ফাইল ছবি)

চা-শ্রমিকদের আনন্দ মিছিল, কাজে ফিরবেন আজ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে চা-বাগানের মালিকদের বৈঠকের পর আজ রবিবার (২৮ আগস্ট) থেকেই কাজে যোগ দেবেন চা-শ্রমিকরা। শনিবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, আমরা আগেই বলেছিলাম প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত দেবেন, আমরা তা মেনে নেব। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী মালিকদের সঙ্গে বসে মজুরি ১৭০ টাকা নির্ধারণ করেছেন, তাই আমরা আগামীকাল (আজ) থেকেই কাজে যোগদান করব। এদিকে নতুন মজুরি নির্ধারণ হওয়ার খবরে তাৎক্ষণিক আনন্দ মিছিল করেন আন্দোলনরত চা-শ্রমিকরা। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল চৌমোহনা চত্বরে হাজারো চা-শ্রমিকদের উল্লাস করতে দেখা যায়। চা-শ্রমিকরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আনন্দ মিছিল করেন এবং একে অপরকে মিষ্টি খাওয়ান। তাদের দাবিকৃত মজুরির একটি সুন্দর সমাধান হওয়ায় এখন কাজে ফিরবেন বলে তারা জানান। চা-শ্রমিক দুলাল হাজরা বলেন, প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, আমরা তাই মেনে নেব। আমরা এখন বাগানের জন্য কাজ করব। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন আমাদের সঙ্গে কথা বলবেন, আমারা আশা করি তিনি আমাদের বাকি দাবিগুলোও মেনে নেবেন। চা-শ্রমিক সিলা ভূইয়া বলেন, আমারা দীর্ঘদিন ধরে খেয়ে না খেয়ে আন্দোলন করেছি। এখন প্রধানমন্ত্রী আমাদের মজুরি ১৭০ টাকা দিয়েছেন। আমরা খুশি। কাল (আজ) থেকে আমরা কাজে নামব।

প্রসঙ্গত, দৈনিক মজুরি ১২০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার দাবিতে এ আন্দালন করছেন সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের প্রায় দেড়শ বাগানের শ্রমিকরা। দৈনিক মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে গত ৯ অগাস্ট থেকে আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন দেশের ২৪১টি চা বাগানের প্রায় সোয়া লাখ শ্রমিক। প্রথম চারদিন শ্রমিকরা প্রতিদিন দুই ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করেন। ১৩ অগাস্ট থেকে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন শুরু করেন শ্রমিকরা। এসময়কালে ধর্মঘটের পাশাপাশি তারা বিভিন্ন মহাসড়ক অবরোধ ও মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন। আন্দোলনের এক পর্যায়ে টানা ধর্মঘটের ১২ দিন পর গত ২০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে মজুরি বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা করার ঘোষণার পর সুরাহার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। ওইদিন শ্রমিক ইউনিয়ন কাজে ফেরার ঘোষণা দিলে কয়েকটি বাগানে শ্রমিকরা কাজে নেমেছিলেন। কিন্তু পরে অন্যরা এ মজুরি মানেননি এবং আবার কাজ বন্ধ করেন। তারা আগের মতই ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। তাদের দাবি, প্রধানমন্ত্রী নিজের মুখে না বললে তারা সরকারি কর্মকর্তাদের কথায় আস্থা রাখতে পারছেন না। এবার ভরা মৌসুমে মজুরি বৃদ্ধির টানা ১৭ দিনের শ্রমিক আন্দোলনের ফলে শত শত কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে চা-শিল্পে। টানা শ্রমিক আন্দোলনের প্রথম দিকে সব চা-বাগানে উত্তোলন করা কাঁচা চায়ের পাতা প্রক্রিয়াজাত করতে না পারায় পচে ও শুকিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এ ছাড়া চা প্ল্যান্টেশন এলাকা থেকে কচি চা-পাতা তুলতে না পারায় সেগুলোও এক থেকে দেড় ফুট লম্বা হয়ে গেছে। এ পাতা চায়ের জন্য প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব নয়।

উত্তরদক্ষিণ । ২৮ আগস্ট ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

এখনও জীবনমানে পিছিয়ে চা-শ্রমিকরা: চা-শ্রমিক ইউনিয়ন সিলেট ভ্যালির সাবেক সভাপতি শ্রীবাস মাহালী মনে করেন, সবার ভাগ্য বদলালেও চা-শ্রমিকদের ভাগ্যের বদল হয়নি। তাদের ঘরবাড়ি খুবই নিম্নমানের। কারোরই ভূমির অধিকার নেই। তাদের খাটানো হয় অত্যধিক, কিন্তু মজুরি দেয়া হয় খুবই সামান্য। শ্রীবাস মাহালী বলেন, এই একুশ শতকে এসেও বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এমন সব অধিকার থেকে বঞ্চিত বেশির ভাগ চা-শ্রমিক। অশিক্ষা, অপুষ্টি, দরিদ্রতা এসবের সঙ্গেই তাদের নিত্য বসবাস। চা-বাগানে পরিচালিত বিভিন্ন জরিপ আর গবেষণা কার্যক্রমেও এই চিত্র ফুঠে ওঠে।
২০১৯ সালে সিলেট অঞ্চলের চা-বাগানগুলোর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে প্রথম জরিপটি চালায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। এই জরিপে দেখা গেছে, অপুষ্টির কারণে চা-বাগানের ৪৫ শতাংশ শিশুই খর্বাকার, ২৭ শতাংশ শীর্ণকায়। স্বল্প ওজনের শিশু ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এই জরিপের তথ্য অনুযায়ী ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ৪৬ শতাংশ কিশোরীর, মা হয়ে যাচ্ছে ২২ শতাংশ। এ ছাড়া ন্যূনতম স্যানিটেশন-সুবিধা নেই চা-বাগানের ৬৭ শতাংশ পরিবারের। এর আগে ২০১৮ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) মৌলভীবাজারের চা-বাগানগুলোর নারীদের ওপর একটি গবেষণা চালায়। এতে দেখা যায়, প্রায় ১৫ শতাংশ নারী জরায়ু ক্যানসারে ভুগছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, স্বল্পমজুরি, ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবার অভাব, মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা, শিক্ষার অভাব ও কুসংস্কারের কারণে এমন অপুষ্টি আর রোগের শিকার চা-বাগানের নারী ও শিশুরা। চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা আইডিয়ার নির্বাহী পরিচালক নজমুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, শ্রমিকরা এখনও অনেকটা ক্রীতদাসের মতোই জীবন কাটাচ্ছেন। তাদের উন্নয়নে সরকার, মালিকপক্ষ সবাইকে আন্তরিক হতে হবে। এ ছাড়া শ্রমিকদেরও মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। তাদের মানসিতায় কিছু গোঁড়ামি থাকায় এখনও অনেক বাগানে শিক্ষা, চিকিৎসা, স্যানিটেশন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। নজমুল হক বলেন, ভবিষ্যতে এই শিল্পকে আরও সমস্যায় পড়তে হবে। কারণ, যেভাবে শ্রমিক বাড়ছে, সেভাবে বাগানের জমি বাড়ছে না। তখন হয়তো দেখা যাবে শ্রমিকদের আবাসনসুবিধা দিতে গিয়ে আবাদের জমি কমে আসবে। এসব সমস্যা সমাধানে চা-বাগান ও চা-শ্রমিকদের নিয়ে একটি বৃহৎ পরিকল্পনার দাবি জানান নজমুল।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading