জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়বে বিশ্ব

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়বে বিশ্ব

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ২৯ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১০:২০

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে; বরফ গলছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। সমুদ্র তীরবর্তী দেশ ও ছোট ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর একটা বিরাট অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। উপকূলবর্তী দেশসমূহের মাটি ও পানিতে লবণাক্ততা বাড়ছে, ফলে বিশ্বজুড়েই সুপেয় পানির অভাব হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাই পানির সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও এশিয়ার ‘ওয়াটার টাওয়ার’ হিসেবে পরিচিত তিব্বত মালভূমি নিয়েও আছে সতর্কবার্তা। সবকিছু মিলিয়ে বিশ্বে বিশুদ্ধ পানির সংকট শঙ্কা বাড়াচ্ছে। বিস্তারিত লিখেছেন আসাদ এফ রহমান

জাতিসংঘ ২০৩০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বের উন্নয়নকে টেকসই করতে ১৭টি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে ষষ্ঠ লক্ষ্যটি হলো- সবার জন্য পানি ও স্যানিটেশন সহজলভ্য করা এবং এর টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। আর ১৩নং লক্ষ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবরোধে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ। কিন্তু জলবায়ু পরবির্তনের প্রভাব যেন প্রতিটি উন্নয়ন কর্মকান্ডকে আটকে রাখছে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতার অভাব দিনকে দিন পৃথিবীতে সমস্যা বাড়াচ্ছে। আর জীবন ধারণের জন্য সবচেয়ে অপরিসীম পানির সংকট বাড়াচ্ছে শঙ্কা।

বিশুদ্ধ পানি থেকে বঞ্চিত বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ: ইউনিসেফের এক জরিপ বলছে, বিশ্বের চীনের ১০ কোটি ৮০ লাখ, ইন্ডিয়ার ৯ কোটি ৯০ লাখ ও নাইজেরিয়ার ছয় কোটি ৩০ লাখ মানুষ সুপেয় পানির অধিকার থেকে বঞ্চিত। অন্য দিকে ইথিওপিয়ায় চার কোটি ৩০ লাখ, ইন্দোনেশিয়ায় তিন কোটি ৯০ লাখ ও পাকিস্তানে এক কোটি ৬০ লাখ মানুষ সুপেয় পানি পান না। বাংলাদেশেও আছে চরম সঙ্কট। এখানে প্রায় দুই কোটি ৬০ লাখ লোক পানি সঙ্কটের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। বর্তমানে পৃথিবীতে ২৬০টির বেশি আন্তঃসীমান্ত নদী অববাহিকা রয়েছে। বিশ্বের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ এসব নদীর ওপর নির্ভরশীল; যে কারণে শত শত আন্তর্জাতিক পানি চুক্তি হয়েছে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে পানি সম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে। এই চাপ মোকাবেলায় নদী অববাহিকায় উজানের দেশগুলো গড়ে তুলেছে বিশালাকার বাঁধ বা ড্যাম। যার খেসারত ভাটির প্রাণ ও প্রকৃতিকে দিতে হচ্ছে। এসব নদনদীর পানির হিস্যা নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে তৈরি হচ্ছে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সম্পর্কের অবনতি, যা দেশগুলোর মধ্যকার ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এশিয়ার ‘ওয়াটার টাওয়ার’ তিব্বত মালভূমি হারাবে পানির মজুত: এশিয়ার ‘ওয়াটার টাওয়ার’ হিসেবে পরিচিত তিব্বত মালভূমি প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বিশুদ্ধ পানির উৎস। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে অঞ্চলটির বিশুদ্ধ পানির মজুত প্রায় ধসে পড়তে পারে। এই শতকের মাঝামাঝিতে এশিয়ার ‘ওয়াটার টাওয়ার’ হিসেবে পরিচিত তিব্বত মালভূমি পানির মজুতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারাতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমন আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত এটিই বিস্তৃত গবেষণা। এটি প্রকাশিত হয়েছে ন্যাচার ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালে। গবেষণা অনুসারে, মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানে সরবরাহ করা আমু দারিয়া অববাহিকার পানি সরবরাহের সামর্থ ১১৯ শতাংশ হ্রাস পাবে। ইন্ডিয়ার উত্তরাংশ ও পাকিস্তানে সরবরাহ করা সিন্ধু অববাহিকার সামর্থ কমবে ৭৯ শতাংশ। দুটি উৎস মিলিয়ে এর প্রভাব পড়বে বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষের ওপর। পেন স্টেট ইউনিভার্সিটি, টিসিঙ্গুয়া ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের একদল বিজ্ঞানী তাদের গবেষণায় দেখতে পেয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গত কয়েক দশকে স্থলজ পানির মজুতের গুরুতর অবক্ষয় ঘটেছে। এর মধ্যে ভূগর্ভ ও ভূপৃষ্ঠের পানি রয়েছে। তিব্বত মালভূমির নির্দিষ্ট অঞ্চলে এই অবক্ষয়ের পরিমাণ বছরে ১৫.৮ গিগাটন। এ প্রবণতার ভিত্তিতে গবেষক দল ধারণা করছেন, মাঝারি কার্বন নির্গমন পরিস্থিতিতে (এসএসপি ২-৪.৫) পুরো তিব্বত মালভূমিতে এই শতকের মাঝামাঝিতে ২৩০ গিগাটন পানি অবক্ষয় হতে পারে। পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির বায়ুমন্ডলীয় বিজ্ঞানের অধ্যাপক মাইকেল মান বলেন, এই পূর্বাভাস ভালো নয়। এখনকার মতো সবকিছু যদি চলমান থাকে, আগামী কয়েক দশকে অর্থবহভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়ানো কমাতে না পারলে আমরা ধারণা করছি তিব্বত মালভূমির প্রায় ১০০ শতাংশ পানির অবক্ষয় হতে পারে।

২০৫০ সালের মধ্যে সংকটে ভুগবে বিশ্বের ৫০০ কোটি মানুষ: বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ সুপেয় পানির সংকটে ভুগছে। এই সংকট আগামী কয়েক দশকে আরও খারাপ হতে পারে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, খরা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে এই অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের ৫০০ কোটি মানুষ পানিসংকটে ভুগতে পারে। গত মার্চে বিশ্ব সংস্থা জাতিসংঘের চলতি বছরের পানি উন্নয়ন এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী তিন দশক ধরে প্রতিবছর বিশ্বে পানির ব্যবহার ১ শতাংশ বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানি সরবরাহের প্রচলিত উৎস খাল ও বিল শুকিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে বেড়ে যাবে ভূগর্ভস্থ পানির চাহিদা। বতর্মানে বিশ্বের ৯৯ শতাংশ সুপেয় পানি আসে ভূগর্ভস্থ পানি সরবরাহব্যবস্থা থেকে। কিন্তু এর গুরুত্ব না বোঝা, প্রতিনিয়ত অবমূল্যায়ন করা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এই সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গবেষকরা বলেছেন, ২০১৮ সালে বিশ্বের প্রায় সাড়ে তিন শ কোটি মানুষ অন্তত এক মাস পানিসংকটে ভুগেছে। ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা দাঁড়াবে ৫০০ কোটিতে। ইউনেস্কো কর্তৃক প্রস্তুত করা প্রতিবেদনটির প্রধান সম্পাদক রিচার্ড কনর। তিনি বলেন, বৈশ্বিক পানিসংকটের সমাধান যদি আমাদের অজ্ঞাতেই থেকে যায়, তাহলে কেমন হবে? তিনি আরও বলেন, ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে এ থেকে আমরা অনেক সুবিধা পাব।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে পানির সরবরাহব্যবস্থায়ও চাপ বেড়েছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি ও এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিষয়টির ওপর আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

ভূগর্ভস্থ পানির এত গুরুত কেনো: ভূগর্ভস্থ পানির কেন এত গুরুত্ব, তার ব্যাখ্যাও জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, বিশ্বের মোট পানির মাত্র ১ শতাংশ সুপেয় পানি, যার বেশির ভাগই পাওয়া যায় বরফের তলে। বাকি পানি লবণাক্ত। সুপেয় পানির মান সাধারণত ভালো হয়ে থাকে। কোনো ধরনের শোধন ছাড়াই এ পানি নিরাপদ ও সহজে ব্যবহার করা যায়।
২০১৮ সালে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ পানিসংকটের মুখোমুখি হয়েছিল প্রতিবশেী দেশ ইন্ডিয়া। দেশটির সরকারি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ইন্ডিয়ার ১৩০ কোটি জনসংখ্যার অন্তত ৪০ শতাংশ মানুষের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে খাওয়ার পানির নির্ভরযোগ্য কোনো উৎসের সুযোগ থাকবে না।

সবচেয়ে বেশি পানি উত্তোলনকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশ: জাতিসংঘের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের দিক দিয়ে শীর্ষে থাকা দেশের তালিকায় এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ১০টি দেশ স্থান পেয়েছে। দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ম।
‘মেকিং দ্য ইনভিসিবল ভিসিবল’ শিরোনামে জাতিসংঘের বৈশ্বিক পানি উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পানি উত্তোলনকারী বাকি ৬ দেশ হলো চীন, ইন্ডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, পাকিস্তান ও তুরস্ক। চলতি বছর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ৭টি দেশ সম্মিলিতভাবে বিশ্বের ৬০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে থাকে। জাতিসংঘের সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে বাংলাদেশ বছরে ৩০ ঘন কিলোমিটার এলাকা থেকে পানি উত্তোলন করেছে এবং ৮৬ শতাংশ পানি সেচ কাজে ব্যবহার করেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা ২০১৮ সালে প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনের সূত্র দিয়ে জানান, প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের জন্য ব্যবহƒত ভূমির প্রাক্কলিত পরিমাণ ৩২ ঘন কিলোমিটার।

উত্তরদক্ষিণ । ২৯ আগস্ট ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

সুপেয় পানির সন্ধানে বাড়বে অভিবাসীর সংখ্যা: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুপেয় পানির পরিমাণ যেখানে অপ্রতুল, সেখানে পানির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে কলহ খুব বিচিত্র বিষয় নয়। পানি হয়ে উঠবে শোষণের অন্যতম হাতিয়ার, যা ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হয়েছে। কয়েক বছর আগে প্রতিবেশী দেশ ইন্ডিয়ার কাবেরি নদীর পানিবণ্টন নিয়ে কর্নাটক ও তামিলনাড়ু রাজ্যের বিবাদ বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কেনিয়ায় বিভিন্ন আদিবাসী গোত্রের মধ্যে পানি নিয়ে সংঘর্ষ হয়েছে। সুদানের দারফুরে গৃহযুদ্ধ শুরুর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল পানি সংকট। ভবিষ্যতে সুপেয় পানির চাহিদা যখন আরও কয়েকগুণ বেড়ে যাবে, তখন যে এ ধরনের সংকটের প্রভাব ভৌগোলিক সীমারেখা পেরিয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়বে না, এ শঙ্কা ঝেরে ফেলা যায় না।
গত শতাব্দীতে তেল, গ্যাস, পেট্রোলিয়ামসহ অন্যান্য অপ্রতুল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার তাগিদে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। বলা যায়, একই বিষয় খাটবে পানির বেলাতেও। আর সুপেয় পানির পরিমাণই যেখানে দিনকে দিন কমছে, সেখানে বিশ্বনেতারা এই অপ্রতুল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় লড়বেন; সেটা তো অবশ্যম্ভাবী! তাই সামনের দিনগুলোতে পানি সম্পদের ভাগাভাগি নিয়েও আন্তর্জাতিক রাজনীতির চক্রাবর্ত সুস্পষ্ট।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading