জাতিসংঘের প্রতিবেদনে নিপীড়নের ‘প্রমাণ’: উইঘুর সংকট কী কাটছে এবার

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে নিপীড়নের ‘প্রমাণ’: উইঘুর সংকট কী কাটছে এবার

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১০:৩৫

চীনের শিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলিমদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে জাতিসংঘ বেইজিংকে ‘গুরুতর মানবাধিকার লংঘনে’ অভিযুক্ত করেছে। তাদের এই প্রতিবেদনটি নিয়ে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছিলো গোটা বিশ্ব। বিশ্লেষকগণ বলছেন, উইঘুর সংকটে জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন হতে পারে গেম-চেঞ্জার। যদিও একে পশ্চিমা দেশগুলোর ‘সাজানো প্রহসন’ অ্যাখ্যা দিয়েছে চীন। বিস্তারিত লিখেছেন সাদিত কবির

অবশেষে চীনের শিনজিয়াংয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ হচ্ছে কিনা তা স্পষ্ট করলে জাতিসংঘ। তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, তারা ‘সম্ভাব্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ’ পেয়েছেন। সংখ্যালঘুদের অধিকার দমন ও ‘নির্বিচারে আটকের ব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠিত করতে চীন জাতীয় নিরাপত্তার ভুয়া অজুহাতকে কাজে লাগাচ্ছে বলেও অভিযোগ করছেন তারা। মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের হাই কমিশনার হিসেবে মিশেল ব্যাশেলের দায়িত্ব পালনের শেষদিন গত বুধবার এ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। তিনি চার বছর ধরে এ দায়িত্ব পালন করেছেন। তার পুরো মেয়াদকালেই উইঘুরদের ওপর চীনের নিপীড়ন সংক্রান্ত অভিযোগ বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। শিনজিয়াংয়ে ‘জাতিগত বিলোপসাধনের’ অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চলছে বলে ব্যাশেলেটের কার্যালয় বছরখানেকেরও বেশি সময় আগে ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ বারবার পিছিয়েছে।

‘ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন অমুসলিমরাও’
চীন সরকার সর্বমোট কতজনকে আটক করে রেখেছে তা নিশ্চিত নয় বলে জাতিসংঘ জানালেও দেশটির উত্তরপশ্চিম শিনজিয়াংয়ে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বন্দি অবস্থায় আছেন বলে অনুমান মানবাধিকার সংগঠনগুলোর। ৬০টির মতো সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করা বিশ্ব উইঘুর কংগ্রেস জাতিসংঘের এ প্রতিবেদনকে স্বাগত জানিয়ে এর ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক মহলকে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে অনুরোধ করেছে। উইঘুর সংকটে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে এটা গেম-চেঞ্জার। চীন সরকারের লাগাতার অস্বীকৃতির পরও সেখানে যে ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, জাতিসংঘ এখন তার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিল, বলেছে তারা। শিনজিয়াংয়ে প্রায় এক কোটি ২০ লাখের মতো উইঘুর সম্প্রদায়ের সদস্য আছে, যাদের বেশিরভাগই মুসলমান। প্রতিবেদনে যেসব বিষয় এসেছে, তাতে অমুসলিমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন বলে অনুমান জাতিসংঘের। আমেরিকা এবং একাধিক দেশের অনেক আইনপ্রণেতা এরই মধ্যে শিনজিয়াংয়ে চীনের কর্মকান্ডকে ‘জাতিগত বিলোপসাধন’ হিসেবে অ্যাখ্যা দিলেও জাতিসংঘ এ ধরনের কোনো তকমা দেয়নি।

যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাও বেশি: জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের কার্যালয়ের জন্য করা এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিনজিয়াংয়ের বন্দিরা বাজে আচরণের প্যাটার্নের মধ্য দিয়ে যায়, এর মধ্যে ‘যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাও’ আছে। অন্যদের জোরপূর্বক চিকিৎসা সেবা এবং ‘পরিবার পরিকল্পনা ও জন্মনিয়ন্ত্রণ নীতির বৈষম্যমূলক প্রয়োগের’ মুখোমুখি হতে হয়, বলা হয়েছে এতে। চীন যেন ‘স্বাধীনতাবঞ্চিত সকলকে মুক্তি দিতে’ পদক্ষেপ নেয় সে বিষয়ে পরামর্শের পাশাপাশি জাতিসংঘ বেইজিংয়ের কিছু কিছু কর্মকান্ড ‘মানবতাবিরোধী অপরাধসহ আন্তর্জাতিক অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে এমন ইঙ্গিতও দিয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে চীন বলছে ‘অপবাদ’: প্রকাশিত হওয়ার আগেই প্রতিবেদনটি দেখার সুযোগ পাওয়া বেইজিং শিনজিয়াংয়ে নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, যেসব ক্যাম্প বা শিবিরের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো মূলত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উপকরণ। জেনিভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে নিযুক্ত চীনের প্রতিনিধি দল প্রতিবেদনের ভাষ্যকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এটি চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং চীনকে ‘কলঙ্কিত করতে ও অপবাদ দিতেই’ প্রতিবেদনে এসব বলা হয়েছে।
তাদের দীর্ঘ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তথাকথিত এ পর্যালোচনা মূলত একটি রাজনৈতিক দলিল যাতে সত্য উপেক্ষিত হয়েছে; আমেরিকা, পশ্চিমা দেশগুলো এবং চীনবিরোধী শক্তি যে মানবাধিকারকে রাজনৈতিক উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছে প্রতিবেদনে তা পুরোপুরি উন্মচিত হয়েছে। চীন বলছে, তারা শিনজিয়াংযে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তা সন্ত্রাসবাদ রুখতে এবং ইসলামি জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটনে দরকার। উইঘুরের জঙ্গিরা স্বাধীন দেশের জন্য বোমা হামলা, নাশকতা ও অরাজকতা চালানোর ছক কষছে ও সহিংস প্রচারণা চালাচ্ছে বলে চীন অভিযোগ করলেও তাদের দমনপীড়নকে বৈধতা দিতে বেইজিং ওই হুমকির বিষয়টি বাড়িয়ে বলছে বলেও পশ্চিমারা অভিযোগ করে আসছে। গণ বন্ধ্যাকরণের মাধ্যমে চীনে উইঘুর জনসংখ্যা কমানোর চেষ্টা করছে বলে যে অভিযোগ আছে, তাকেও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে বেইজিং। জোরপূর্বক শ্রমে নিযুক্ত করার অভিযোগও ‘পুরোপুরি বানোয়াট’, বলছে তারা।

প্রতিবেদন ঢাকতে বারবার চাপ দিয়েছিল চীন: বেইজিং প্রতিবেদনে তাদের বিরুদ্ধে আসা কথাবার্তা চেপে যেতে ব্যাশেলেটকে চাপ দিচ্ছে বলে পশ্চিমা অনেক মানবাধিকার সংগঠন বেশ কিছুদিন ধরে অভিযোগও করছিল। এমনকী যখন প্রকাশিত হয়েছে তার কিছুক্ষণ আগেও প্রতিবেদনটি যেন প্রকাশ না করা হয়, সেজন্য চীন ব্যাশেলের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছিল। প্রতিবেদনটি ‘প্রকাশ করতে বা না করতে ব্যাপক চাপের মুখে’ থাকার কথা গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ব্যাশেলে স্বীকারও করে নিয়েছিলেন। প্রতিবেদন প্রকাশে দেরির সাফাইও গেয়েছেন তিনি। বলেছেন, প্রতিবেদনটি নিয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে চাওয়ার অর্থ এই নয় যে এর বিষয়বস্তুর ব্যাপারে ‘আমি চোখ বুজে ছিলাম’। তবে প্রতিবেদন প্রকাশে ‘অমার্জনীয় বিলম্বের’ নিন্দা জানিয়েছেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস কালামার্ড।

আলোচনায় ‘শিনজিয়াং পুলিশ ফাইল’
এদিকে, চলতি বছরের মে মাসে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা এক নথিতে দেখা গেছে, চীনের সংখ্যালঘু উইঘুর এবং টার্কিক সম্প্রদায়ের মানুষদের ইসলামী ধর্মবিশ্বাসের কোনোরকম চিহ্ন দেখা গেলে তাদের দীর্ঘ কারাদø দেওয়া হয়েছে। ওই এলাকার পুলিশের কম্পিউটার সার্ভার হ্যাক করে জোগাড় করা বিশাল ওই তথ্য ভাøারে রয়েছে, শিনজিয়াংএর চূড়ান্ত গোপনীয়তায় ঢাকা পদ্ধতির একেবারে কেন্দ্রে থাকা হাজার হাজার ছবি এবং আটক কেন্দ্র থেকে পালানোর চেষ্টা করলেই গুলি চালিয়ে হত্যার নীতি বিষয়ক নানা সাক্ষ্যপ্রমাণ। ‘জিনজিয়াং পুলিশ ফাইল’ নামে পরিচিত এসব নথি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে চলতি বছরের গোড়ার দিকে। গত কয়েক মাস ধরে এসব নথ্যির সত্যতা যাচাই ও অনুসন্ধানের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে এসেছে ওই এলাকায় উইঘুর এবং টার্কিক সম্প্রদায়ের মানুষদের ধর্ম ও সংস্কৃতির যে কোনোরকম চিহ্ন দেখলেই তাদের বন্দি করার প্রক্রিয়া নিয়ে ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ নানা তথ্য।

‘মুসলিমদের মুছে ফেলতে চাইছে চীন’
মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বরাবরই বলে আসছে মুসলিমদের মুছে ফেলতে চাইছে চীন। তারা তাদের রিপোর্টে জানিয়ে আসছিলো কোনো রকম সতর্কতা ছাড়াই মাঝরাতে বাড়ি থেকে তুলে উইঘুরদের শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের তথাকথিত শিক্ষা-শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং জোর করে নিজেদের অপরাধের কথা স্বীকার করানো হয়। তারপর তাদের মধ্যে কিছু মানুষকে শিবিরে রাখা হয়। কারণ হিসেবে বলা হয়- তারা সন্ত্রাসবাদী এবং বিশ্বাসযোগ্য নয়।
যাদের শিবিরে আটকে রাখা হয়েছিল, তাদের কয়েকজন অ্যামনেস্টিকে বলেছেন, শিবিরের অবস্থা চীনের কারাগারের থেকেও খারাপ। তাদের সংশোধন-ক্লাসে যেতে হয়। তার আগে সারাদিন তাদের বসিয়ে রাখা হয়। শিবিরের ক্লাসে তাদের ইসলামের ‘খারাপ’ দিকগুলো বাধ্যতামূলকভাবে শিখতে হয়।এই মানবাধিকার সংগঠনের দাবি, অপরাধের অকাট্য প্রমাণ না থাকলে শিবির থেকে সব উইঘুর মুসলিমকে মুক্তি দিতে হবে চীনকে। একইসঙ্গে এই শিবির বন্ধ করতে হবে। উইঘুরদের বিরুদ্ধে যাবতীয় অত্যাচার ও তাদের হেনস্তা করা বন্ধ করতে হবে। জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ জিনজিয়াংয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ও অপরাধের তদন্ত করতে আন্তর্জাতিক দল পাঠাতে হবে।

উইঘুর নির্যাতন নিয়ে বিভিন্ন দেশের উদ্বেগ: এর আগে, গত জুন মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের কাছে চীনে উইঘুর নির্যাতনের বিষয়ে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয় চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুর সম্প্রদায়ের ওপর ‘নির্যাতন’ নিয়ে বিশ্বের ৪৭টি দেশ গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধানের কাছে অবিলম্বে উইঘুর নির্যাতনের প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানিয়েছিল।
যৌথ বিবৃতিতে নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুরতা, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ, জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ, যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, জোরপূর্বক শ্রমে নিযুক্ত করা, শিশুদের তাদের মা-বাবার কাছ থেকে জোরপূর্বক পৃথকীকরণসহ বিভিন্ন নিপীড়ন সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। মুসলিম উইঘুর ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নির্বিচারে আটক বন্ধ করারও আহ্বান জানান পল বেকারস। এদিকে, আল-জাজিরা জানিয়েছে, বিবৃতিদাতা ৪৭ দেশ বেইজিংকে জাতিসংঘের তদন্তকারী এবং বিশেষজ্ঞদের জিনজিয়াংয়ের পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য বাধাহীন প্রবেশাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

উত্তরদক্ষিণ । ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

উইঘুর মুসলিমরা আর কতো নিপীড়ন সইবে: উইঘুর চীনের স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ হওয়ার পর থেকেই এই জাতির উপর শুরু হয়েছে এক অমানবিক নিপীড়ন নির্যাতন। সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হচ্ছে তাদের এই অমানবিকতা নিয়ে পুরো বিশ্ব অনেকটাই নির্বাক। কেউ যেন মানবজাতির ওপর এই নির্যাতন দেখেও দেখছে না। ফ্রিডম ওয়াচের মতে, চীন হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম ধর্মীয় নিপীড়ক দেশ। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকায় এসব নিপীড়নের কথা বিশ্ববাসী খুব একটা জানতে পারে না। সংবাদমাধ্যম বিবিসির তথ্যমতে, চীনের শিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলিমদের জন্য যেসব ‘পুনঃশিক্ষণ’ কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। আর এই কেন্দ্রগুলোতে নারীরা পরিকল্পিতভবে ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন। একইসঙ্গে শিনজিয়াং প্রদেশে বসবাসকারী লোকজনের ওপর চীন সরকারের নিপীড়নমূলক নজরদারির তথ্যপ্রমাণ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। চীন সরকারের জুলুম অত্যাচার থেকে বাঁচার লক্ষ্যে প্রায় ২৫ লাখ অধিবাসী পার্শ্ববর্তী দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে। নানা অজুহাতে উইঘুর মুসলিমদের জেল-জুলুম এমনকি মৃত্যুদন্ড দিচ্ছে চীন সরকার।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading