গোতাবায়ার প্রত্যাবর্তন: দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা
মাহবুব মোর্শেদ । মঙ্গলবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১২:২০
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটা তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটল। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে আবার কলম্বোতে ফিরে এলেন। বিমানবন্দরে তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে। অভ্যর্থনাকালে সমর্থকরা উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রিসভার সদস্যরাও তাকে স্বাগত জানিয়েছেন। দুই মাসের মাথায় তার এই ফিরে আসা আন্দোলনকারীদের মুখে চপেটাঘাতের শামিল।
তবে বিস্ময়ের কিছু নেই এতে। গোতাবায়ার অন্য ভাইয়েরা তাদের শত অপকর্ম সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কায় রয়ে গিয়েছিলেন। সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শেষ পর্যন্ত রাজাপাকসে পরিবারের বিরুদ্ধে তেমন কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। বরং তারাই শ্রীলঙ্কার রাজনীতির নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় আছেন এখনও। আন্দোলনকারীরা শেষ পর্যন্ত সরকার পরিবর্তনের দায়িত্ব সংসদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিল বা দিতে বাধ্য হয়েছিল। আর সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজাপাকসের দল তাদেরই অনুগত, সুযোগসন্ধানী, ধূর্ত রনিল বিক্রমাসিংহেকে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী পরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছে। সংসদের বিরোধী দলগুলো তার বিরুদ্ধে তেমন একটা ভূমিকা পালন করতে পারেনি বা করেনি।
শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে রনিল ধূর্ত শেয়াল হিসেবে পরিচিত। যিনি ছোট দলের বড় নেতা, সংসদে তার দলের আসন সম্ভবত মাত্র একটি, পারিবারিকভাবে একটি সুযোগ সন্ধানী রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তিনি বহন করে চলেছেন। এই ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি বানানোর মাধ্যমে রাজাপাকসের দল যেমন আন্দোলনের মুখে তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের মুখ রক্ষা করতে পারল, তেমনি ক্ষমতার চাবিটা নিজেদের কাছে রেখে দিতেও সক্ষম হলো। রনিল বিক্রমাসিংহে তাদের বাইরে কোনো কিছু করার ক্ষমতা রাখেন না। কিন্তু তার ক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে আন্দোলন স্তিমিত হলো, আন্দোলনকারীদের দমন করা সম্ভব হলো। আর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটা ভারসাম্য তৈরি করতে পারল শ্রীলঙ্কার শাসক শ্রেণি।
বলা হচ্ছিল, গোতাবায়া রাজাপাকসে অনেক বেশি ভারতনির্ভর নীতি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তার দেশটি চীনের কাছে ঋণবদ্ধ। চীন থেকে অর্থ এনে রাজাপাকসেরা যেমন বড় বড় উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল, তেমনি দেশ চালানোর মতো অর্থের জন্যও তারা চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। খুব সম্ভবত গোতাবায়ার ভারতমুখী নীতির কারণে চীনারা পিছটান দেয়। তাতে অর্থনীতির জন্য প্রথম ধাক্কাটা শুরু হয়। অর্থনীতি সংকটে পড়ে গেলে বন্ধু গোতাবায়ার জন্য ভারত নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সব সাহায্য দেয়। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি।
শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি যে পঙ্কে ছিল সেই পঙ্কেই রয়ে যায়। একটি অসমর্থিত প্রচারণা বলে, চীন নাকি গোতাবায়াকে সরানোর জন্য বামপন্থী দল ও ছাত্র সংগঠনগুলোকে মাঠে নামিয়ে আন্দোলন জোরদার করেছিল। যে কারণে পশ্চিমা মিডিয়া প্রথমে তাদের নিয়ে উচ্ছ্বসিত হলেও পরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরে জোর দেয়। শোনা যায়, রনিল বিক্রমাসিংহে অন্যসব নীতিতে রাজাপাকসেদের মতো হলেও ব্যক্তিগতভাবে কিছুটা চীনঘেঁষা। ফলে, তার আগমনের সঙ্গে শ্রীলঙ্কায় চীনাদের জন্য ইতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হয়। আইএমএফের লোনের ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও হয়েছে।
কিন্তু একথা সত্যি, চীনের টাকা, ভারতের টাকা, আইএমএফের টাকা কোনটাই শ্রীলঙ্কানদের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না। আপাতত কিছু মানুষের খেয়ে পরার ব্যবস্থা হলেও দেশটি প্রায় পঞ্চাশ বছরের জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মোড়লের ফুটবলে পরিণত হয়ে গেছে। আর শ্রীলঙ্কার রাজনীতিও একটা কানাগলিতে আটকে পড়ে গেছে। শ্রীলঙ্কা আমাদের কিছু শিক্ষা দিয়ে গেল। যারা মনে করেন, সারাবছর রাজনীতি না করে একদিন মাঠে নেমে রাজনীতি পরিবর্তন করে ফেলবেন তারা বোকার স্বর্গে বসবাস করেছেন। এমনকি এক সপ্তাহ বা এক মাসও রাস্তায় থাকা যথেষ্ট নয়। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি সরকারের পতন ঘটানো যেতেই পারে, কিন্তু অভ্যুত্থানের পরিণতিতে ক্ষমতা কার হাতে যাবে সেই চিন্তা জরুরি। যারা আন্দোলন করেন তারা যদি প্রস্তুত না থাকেন তবে গোতাবায়ার কাছ থেকে রনিলের কাছে ক্ষমতা চলে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। ফলে, একদিন এক সপ্তাহ এক মাসের আন্দোলনে বিশেষ কোনো ফল আনে না। গোতাবায়া স্বমহিমায় প্রত্যাবর্তন করে সেই শিক্ষাটা দিয়ে গেলেন।
তবে আরেকটা ইতিবাচক অগ্রগতি তার ফিরে আসার মধ্য দিয়ে বোঝা গেল। দুর্নীতি করে যত টাকায় রাজাপাকসেরা বিদেশে জমান না কেন, আজকের দুনিয়ায় কেউ আর স্বৈরাচারী গণধিকৃত শাসককে আশ্রয় দিতে প্রস্তুত নয়। ফলে অনেক চেষ্টা করা সত্ত্বেও গোতাবায়া কোথাও স্থান পাননি। শেষ পর্যন্ত মাতৃভূমিতেই ফিরতে হয়েছে। যে নরক তিনি তৈরি করেছেন সেই নরকেই তাকে থাকতে হবে। বাইরে হয়তো কোথাও বেহেশত বানিয়ে রেখেছিলেন, সেখানে তিনি হাজার চেষ্টাতেও যেতে পারলেন না, এটাই আপাতত সুসংবাদ।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক
ইউডি/সুস্মিত

