১৫ দিনে নতুন রোগী ছাড়িয়েছে ৪ হাজার: চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৩:০০
দেশে প্রতিদিন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এক মাসে ডেঙ্গু রোগী বেড়ে তিন গুণ হয়েছে। এছাড়া চলতি মাসের ১৫ দিনেই নতুন রোগী ৪ হাজার ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিটি কর্পোরেশনের দফায় দফায় অভিযান ও নানা উদ্যোগেও লাগাম টানা যাচ্ছে না মশাবাহিত এই রোগের প্রকোপ। তবে পরিস্থিতি উন্নয়নের চেষ্টা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিস্তারিত জানাচ্ছেন সাইফুল অনিক।
দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৯৫ জন। এই সময়ের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবশেষ হিসাবে আসা ৩৯৫ জনসহ বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি থাকা ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১১ জনে। বৃহস্পতিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সারা দেশের পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের নিয়মিত ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে নতুন ভর্তি হওয়াদের মধ্যে ২৯৪ জন ঢাকার বাসিন্দা। ঢাকার বাইরে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১০১ জন। বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৯৭১ জন। আর ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি আছেন ৩৪০ জন।
১৫ দিনে আক্রান্ত ৪ হাজার
দেশের ডেঙ্গুতে প্রায় প্রতিদিনই শনাক্তে নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুও। এই অবস্থা শুধু বড় নগরীতে নয় বরং দেশের সবর্ত্র। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত মোট রোগী শনাক্ত হয়েছে ১০ হাজার ২৩২ জন। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৮ হাজার ৮৮১ জন। এর মধ্যে ঢাকায় ভর্তি হয়েছেন ৮ হাজার ৯৫ জন এবং ছাড়পত্র পেয়েছেন ৭ হাজার ১০৭ জন। ঢাকার বাইরে মোট রোগী শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ১৩৭ জন। তাদের মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ৭৭৪ জন। এ সময় মৃত্যু হয়েছে ৪০ জনের। আর চলতি মাসের ১৫ দিনেই মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠবে বলে কীটতত্ত্ববিদেরা আগে থেকেই সতর্ক করে আসছিলেন। যেখানে চলতি মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৭০ জন রোগী শনাক্ত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, আগস্টের ৩১ দিনে মোট ৩ হাজার ৫৩১ রোগী শনাক্ত হয়েছিল। আর চলতি মাসের ১৫ দিনে রোগী শনাক্ত ও ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ৫১ জন। ১৫ দিনে মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। জুনে মৃত্যু হয়েছিল একজনের, জুলাইতে ৯ জনসহ সব মিলে সর্বমোট ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ডেঙ্গুতে উদ্বিগ্ন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী
দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর পরিসংখ্যান দেখে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বৃহস্পতিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে এক সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সারাদেশে মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও সংস্থার পর্যালোচনার জন্য দুপুর ২টায় স্থানীয় সরকার বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শুরু হয়। সভা শেষে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর পরিসংখ্যান জানান স্থানীয় সরকার মন্ত্রী। অন্যদের সঙ্গে তুলনা করে আত্মতুষ্টিতে ভুগছেন কি না- সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আত্মতুষ্টির বিষয় নয়। আমরা ব্যথিত, দুঃখিত ও উদ্বিগ্ন, যে কারণে আজ এখানে বসা। নইলে তো হঠাৎ করে এক মাসের ব্যবধানে আমাদের এখানে বসার দরকার ছিল না। আমরা উদ্বিগ্ন, আমাদের কাছে এটি দুঃখজনক। একজন মানুষেরও মৃত্যু কেন হবে?
শিশুদের অবস্থাই বেশি নাজুক
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ৯ মাসে ডেঙ্গুতে মারা গেছে ৩৯ জন, এর মধ্যে অন্তত ৮ জন শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের বাইরেও ডেঙ্গুতে শিশুমৃত্যুর তথ্য রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে এখন পর্যন্ত ৪ জন শিশু মারা গেছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, সে সংখ্যা ৭। এছাড়া স্বপ্নিলের মৃত্যুর তথ্যও নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডাটায়। যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ঢাকা শহরের মাত্র ৩৩টি হাসপাতালের ডেঙ্গু রোগীর তথ্য দেয়। এ বছরের শুরুতে প্রতি মাসে দুয়েকজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি থাকলেও গত আগস্টে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ১০০ ছাড়ায়। হাসপাতালের তথ্য বলছে, এ বছর এখন পর্যন্ত ২৬৬ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছে ৭ শিশু।
বর্তমানে হাসপাতালটিতে ভর্তি আছে ২৮ শিশু, যদিও হাসপাতালটির ডেঙ্গু সেলে বেড আছে ১২টি। বাকি রোগীদের ডেঙ্গু সেলের বাইরে অন্য ওয়ার্ডে রাখা হচ্ছে। শিশু হাসপাতালের বাইরে মিটফোর্ড হাসপাতাল ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও শিশু রোগী বাড়ছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলেন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় ডেঙ্গুতে শিশুদের অবস্থা বেশি নাজুক। শিশুদের ডেঙ্গুর লক্ষণ বুঝতে দেরি হওয়ায় দেরিতে হাসপাতালে নেয়ার কারণে তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি।
ইমেরিটাস অধ্যাপক ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, ‘শিশুরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে বিপদ বেড়ে যায়। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে ইন্টারনাল রক্তক্ষরণ অনেক বেশি হয়। শিশুরা অল্পতেই শকে চলে যায়। কিডনি, লিভার ফেইলিওর শিশুদের খুব দ্রুত হয়। সে কারণে ডেঙ্গুতে শিশুদের মধ্যে মৃত্যুহার বেশি।’
ডেঙ্গু হটস্পট কক্সবাজার
রাজধানীর বাইরে রোগীদের মধ্যে কক্সবাজার জেলায় সবচেয়ে বেশি ৮৯৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন। তারা সবাই বাংলাদেশি নাগরিক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডেঙ্গুর তথ্য দেওয়া হয় না। তবে, কক্সবাজার সিভিল সার্জন সূত্রে জানা গেছে, এ বছরে শুধু কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এখন পর্যন্ত ১২ হাজার ৪১৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। আর মারা গেছেন ২৪ রোহিঙ্গা। কক্সবাজারে যে এবার ডেঙ্গু রোগী বাড়তে পারে, আগে থেকেই সেই ধারণা দিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা। চলতি বছরের মে মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও এর আশেপাশের এলাকায় মশা নিয়ে একটি জরিপ করা হয়।
সেই দলে ছিলেন কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার। অধ্যাপক কবিরুল বাশার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মে মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জরিপ করে অস্বাভাবিকভাবে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার উপস্থিতি পাই। আমরা তখন বলেছিলাম যে কক্সবাজারে ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। কক্সবাজারের রোগীর যে চিত্র পাই, এই সংখ্যাটি আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয়ভাবে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা থাকতে হবে। না হলে এভাবে একটির পর একটি জেলা ডেঙ্গুর হটস্পট হতে থাকবে।’

হাসপাতালগুলোকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিঠি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে হাসপাতালের পরিচালকদের চিঠি পাঠানো হয়েছে। ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিট, চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করে রোগী ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নজর রাখতে বলা হয়েছে। ফ্লুয়িড ম্যানেজমেন্ট ঠিকমতো না হলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। দেরি হয়ে গেলে রোগীর পরিস্থিতি খারাপের দিকে চলে যায়। শিশুদের মৃত্যুর পেছনে এটা একটা বড় কারণ। শুরু থেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না হওয়ায় রোগীর পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে।’

এশিয়ার অন্য দেশের চেয়ে আক্রান্ত কম
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমি কমপেয়ার (তুলনা) করেছি। সিঙ্গাপুরের মতো দেশ কি চেষ্টা করে না? ভিয়েতনামের মতো দেশ কি চেষ্টা করে না? ফিলিপাইনের মতো দেশ, তাদের দেশের ইনকাম আমাদের থেকে বেশি। সে সমস্ত কারণে আমরা এ তুলনাটি করেছি। মন্ত্রী তাজুল ইসলাম চলতি বছরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ডেঙ্গু আক্রান্তদের সর্বশেষ পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, সিঙ্গাপুরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ২৬ হাজার ৯৭০ জন, ইন্ডিয়াতে ৩০ হাজার ৬২৭ জন, মালয়েশিয়ায় ৩৩ হাজার, ফিলিপাইনে ৮২ হাজার ৫৯৭ জন, কম্বোডিয়াতে ৩ হাজার ৩২২ জন, ভিয়েতনামে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫৩৬ জন, ইন্দোনেশিয়াতে ৬৮ হাজার ৯০৩ জন। আর বাংলাদেশে মাত্র ৯ হাজার ৮৩৭ জন।

ডিএনসিসি বিশেষ অভিযান অব্যাহত
এদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) সপ্তাহব্যাপী বিশেষ অভিযান চলছে। গত রবিবার (১১ সেপ্টেম্বর) ডিএনসিসির ১০টি আঞ্চলিক কার্যালয়ের আওতাধীন এলাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতামূলক অভিযান চলছে। এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসির উপপ্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা লে. কর্নেল ডা. মো. গোলাম মোস্তফা সারওয়ার বলেন, ডিএনসিসি আওতাধীন এলাকাগুলোতে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সপ্তাহব্যাপী বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। ডিএনসিসির দশটি অঞ্চলে দশটি টিম এ অভিযান পরিচালনা করছে। অভিযানের সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হবে। এ সময় এডিসের লার্ভা পেলেই নেওয়া হবে আইনানুগ ব্যবস্থা।
মেয়র আতিক বলেন, নগরবাসীর উদ্দেশে আতিকুল ইসলাম বলেন, জনগণের সহযোগিতা ছাড়া সিটি করপোরেশনের পক্ষে পুরো ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। জনগণের সহযোগিতায় যেমন মাত্র ১২ ঘণ্টায় কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করতে সক্ষম হয়েছি, তেমনি জনগণের সহযোগিতায় ডেঙ্গুও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে।
ইউডি/অনিক

