বাংলাদেশ সীমান্তে হত্যা-সংঘাত: মিয়ানমারের জান্তা কী চায়
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১২:৫৫
সীমান্তে মিয়ানমারের (বার্মা) একের পর এক মর্টার শেল নিক্ষেপের ঘটনাকে যুদ্ধ বা উসকানির ফাঁদ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় বিষয়টিকে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। ইতোমধ্যে সীমান্তে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারের কোনো নাগরিক যাতে বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে সে জন্যও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো উসকানিতে পা দেবে না বাংলাদেশ, সেই বিষয়টি স্পষ্ট করেছে সরকার। তবে মিয়ানমার কেন বার বার সীমান্তে একই ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিস্তারিত লিখেছেন মিলন গাজী
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তের বিপরীতে শনিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সারাদিন ভারী গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পেরেছেন সীমান্তের বাসিন্দারা। এতে তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করেছে। গত আগস্ট মাস থেকে বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী অভিযান শুরু করে। সহিংসতা শুরু হয় ওপারে। সেখান থেকে বেশ কয়েকবার গোলা ও বুলেট এসে পড়ে বাংলাদেশের ভেতরে। গত শুক্রবার (১৬ সেপ্টেম্বর) মিয়ানমার থেকে ছোড়া একটি মর্টারশেল বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী নো-ম্যান্স ল্যান্ডে পড়ে বিস্ফোরিত হয়। এসময় নো-ম্যান্স ল্যান্ডে বসবাসরত মো. ইকবাল (১৭) নামে এক রোহিঙ্গা নিহত হয়। আহত হয় আরও পাঁচ জন।
এর আগে গত ৯ সেপ্টেম্বর বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম-তুমব্রু সীমান্তের বাংলাদেশ অভ্যন্তরে মিয়ানমার থেকে ছোড়া একটি বুলেট এসে পড়ে। ৩ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় মিয়ানমারের যুদ্ধবিমান থেকে ছোড়া দুটি গোলা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম এলাকায় পড়ে। তার আগে ২৮ আগস্ট বিকাল ৩টার দিকে মিয়ানমার থেকে নিক্ষেপ করা একটি মর্টারশেল অবিস্ফোরিত অবস্থায় ঘুমধুমের তুমব্রু উত্তর মসজিদের কাছে পড়েছিল।
আতঙ্কে বাড়িঘর ছাড়ছেন সীমান্তের বাসিন্দারা
এদিকে, মর্টারশেল বিস্ফোরণ ঘটনার পর থেকে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে। এর মধ্যে শনিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে আবারও গোলাগুলির শব্দ শোনা যায় ওই এলাকায়। প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাড়ি থেকে বের হয়নি। অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। ঘুমধুম ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আনোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, গতকাল (শুক্রবার) মর্টারশেল ও ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে হতাহতের পর স্থানীয়রা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। ভয়ে সীমান্ত লাগোয়া জুমক্ষেতে ফসল আনতে যেতে পারছেন না তারা। এর মধ্যে আজ (শনিবার) সকাল থেকে আবারও সীমান্তের ওপারে কয়েকবার গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। এই পরিস্থিতিতে অনেকে আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে চলে যাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা শফিউল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, সীমান্তের পরিস্থিতি এখনও থমথমে। আমরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছি। অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। ঘুমধুম পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক (ইনচার্জ) সোহাগ রানা বলেন, বর্তমানে সীমান্ত এলাকায় কাউকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। সেখানে বিজিবি তৎপর রয়েছে। আতঙ্কিত হয়ে কারও এলাকা ছাড়ার খবর এখনও পাননি। এই বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে। এলাকার নিরাপত্তায় পুলিশও কাজ করছে।
যুদ্ধ নয়, বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়
মিয়ানমারের (বার্মা) সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, বাংলাদেশ আশা করে মিয়ানমার তাদের ভুল বুঝতে পারবে এবং ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকবে। ঢাকা আহসানিয়া মিসনে এক অনুষ্ঠান শেষে শনিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) তিনি সাংবাদিকদের বলেন, যেহেতু আমরা সংঘাত চাই না, তাই মিয়ানমারের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য পথ খুঁজে বের করার আমাদের প্রচেষ্টা চলছে। আমরা সবকিছু করব, প্রয়োজনে বিষয়টি জাতিসংঘে নিয়ে যাব।
মিয়ানমারের দিক থেকে বাংলাদেশের ভূখন্ডে পড়া গোলাবারুদ নিয়ে সরকার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে আমাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে জানাতে বলেছে। তিনি বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী কখনই যুদ্ধ চান না, আমরা শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই। তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তাদের সীমানার মধ্যেই থাকুক। আমাদের মাটিতে যা ঘটছে আমরা বাইরে থেকে তার প্রতিবাদ করছি।

মিয়ানমার কখনোই প্রতিশ্রুতিতে অটল থাকে না
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, মিয়ানমার কখনোই তার প্রতিশ্রুতিতে অটল থাকে না। তিনি বলেন, আমরা দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিকভাবে চেষ্টা করছি। আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। আমরা এখানে আশ্রয় নেয়া ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে শান্তিপূর্ণভাবে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, সম্প্রতি মিয়ানমার শুধু রোহিঙ্গাদের সঙ্গেই নয়, থাইল্যান্ড, চীন ও মিজোরামে তাদের অনেক জাতিগত গোষ্ঠীর সঙ্গেও লড়াই করছে। আমরা লক্ষ্য করেছি যে আরাকান আর্মি নামে একটি বিদ্রোহী দল সেখানে যুদ্ধ করছে।
মন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার ও আরাকান আর্মির মধ্যে কখনো কখনো ভালো সম্পর্ক দেখা গেছে, কখনো তা যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তারা গোপন বিষয়টি জানে। অবশ্যই তাদের যুদ্ধ তাদের সীমানার মধ্যে হওয়া উচিত। তিনি বলেন, মিয়ানমার সীমান্তের কাছে শুন্য রেখায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প রয়েছে।
পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলছেন জাতিসংঘের প্রতিনিধি
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতি উদ্বেগের সৃষ্টি করছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি লুইস গুয়েন। শনিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সাংবাদিকদের তিনি এই কথা বলেন। তিনি বলেন, জাতিসংঘ প্রতিনিয়তি পর্যবেক্ষণ করছে, মিয়ানমারের মিশনের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সত্যি বলতে পুরো ঘটনা স্পষ্ট নয়। যদিও ঘটনাস্থলে দেখবার অনুমতি নেই। তাই উভয় দেশকে শান্তি বজায় রাখতে অনুরোধ করেন লুইস গুয়েন।
‘রোহিঙ্গাদের পুশব্যাক করে ফেরানো হচ্ছে’
মিয়ানমারের (বার্মা) এ ধরনের তৎপরতায় নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শঙ্কা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বর্ডার দিয়ে রোহিঙ্গারা যেন না আসে, সেটার ব্যবস্থায় আমাদের বিজিবি, কোস্ট গার্ড করছে। তার পরও দু-একজন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আসছে। আমরা তাদের পুশব্যাক করে আবার ফিরিয়ে দিচ্ছি। এ ধরনের ঘটনা হচ্ছে। এখন যে গোলাগুলি, সেটা নিয়ে আমরা বলছি, তারা তাদের ভেতরে যে কনফ্লিক্ট, সেটা তাদের ভেতরেই করতে হবে। আমাদের দিকে যাতে না আসে, সে জন্য আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এবং এটা নিয়ে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, তারা আরও শক্তভাবে বিষয়টি উত্থাপন করবে। আমরা শান্তিপ্রিয়। আমরা শান্তি রক্ষার্থে যা যা করার করব।
মিয়ানমার সীমান্তে নজর রাখছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
মিয়ানমার সীমান্তে চলমান গোলাগুলির ঘটনার ওপর নজর রাখছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে তারা। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, এর আগে আমরা তিন বার মিয়ানমার রাষ্ট্রদূতকে ডেকে আমাদের উদ্বেগের বিষয়ে জানিয়েছি। এবারও তাদের সঙ্গে আমাদের কথা হবে। এছাড়াও এ বিষয়ের সঙ্গে জড়িত পক্ষগুলোর সঙ্গে রবিবার (আজ) বৈঠকে বসবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জানান তিনি।

বিজিবি’র মৌখিক প্রতিবাদ, সীমান্তে সতর্ক অবস্থান
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নে মিয়ানমারের ছোড়া মর্টারশেল বিস্ফোরণে একজন নিহতের ঘটনায় মৌখিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে বিজিবি। গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিজিবি সদর দফতরের পরিচালক (অপারেশন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়জুর রহমান। তিনি বলেন, তুমব্রু সীমান্তে মিয়ানমারের মর্টারশেল ছোড়ার ঘটনায় তাৎক্ষণিক মৌখিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে বিজিবি। একইভাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি, সীমান্তে বসবাসকারীদের আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য বলেছি আমরা।
সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। বান্দরবানের জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি গণমাধ্যমকে বলেন, নো-ম্যান্স ল্যান্ডে মর্টারশেল বিস্ফোরণে একজন নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর আমাদের সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। একইসঙ্গে সীমান্তে বসবাসকারীদের আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
রোহিঙ্গা ইস্যু মুছে ফেলার জন্য এমন ‘উসকানি’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এর আগে বলেছিলেন, মিয়ানমারের উস্কানি বা কোনো ধরনের ফাঁদে আমরা পা দিতে চাই না। কেননা এই ধরনের কোনো দিকে নিয়ে যেতে পারলে তাদের হয়তো কোনো কৌশলতগত সুবিধা থাকবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা নিয়ে যে সমস্যায় আমরা আছি, এই সমস্যার দায় আমাদের দিকেও চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, মিয়ানমার উস্কানি দিচ্ছে কারণ, সামরিকভাবে বাংলাদেশ জবাব দিলে তাদেরই লাভ। কেননা তখন এই কনফ্লিক্ট দেখিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুটি তারা মুছে ফেলতে পারবে। আমাদের উচিত হবে এই পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রাখা। বিষয়টি নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি তোলা। প্রয়োজনে নিরাপত্তা পরিষদেও বিষয়টি তোলা যেতে পারে।
ইউডি/অনিক

