স্বাধীনতার ৫১ বছরে বড় ঘাটতি আমরা দুর্নীতি রোধ করতে পারিনি
রায়হান আহমেদ । বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১০:৩০
বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং তথ্যপ্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করেছে। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্বের কোথায় কখন কী ঘটছে তা নিমিষেই সবাই জানতে পারছে। পত্রিকার পাতায় প্রতিদিন কত খবর আমরা দেখতে পাই। কোনো কোনো খবরে লজ্জায় মাথা নত হয়ে আসে। এদের মানুষ নামের কলঙ্ক বলে মনে হয়। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। আজ থেকে ৫১ বছর আগে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি শোষকদের কবল থেকে আমাদের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি। হাঁটি হাঁটি পা পা করে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছি। একসময়ের তলাবিহীন ঝুড়িটি আজ বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
কিন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যাংকব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে ব্যাংকিং সেক্টর অনেকখানি এগিয়ে গেলেও গত কয়েক বছরে দেশে আর্থিক খাতে এত বেশি কেলেঙ্কারি হয়েছে, যার কারণে এ খাত নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস দেখা দিয়েছে। আর্থিক খাতের এই অব্যাহত কেলেঙ্কারির দায় সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। যারা দেশের আর্থিক খাতকে ধ্বংস করে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বুক ফুলিয়ে চলে, সরকারের উচিত, ব্যাংক-চোর ওইসব আসল অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া। অপরাধ করে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার কারণেই বলতে গেলে দেশে অপরাধ প্রবণতা ক্রমবর্ধমান। শুধু আর্থিক বা ব্যাংকিং খাত নয়, রাষ্ট্রের সব বিভাগই এখন রোগাক্রান্ত। রিজার্ভ চুরি এবং ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনাগুলো সচেতন মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে। রাষ্ট্রের রিজার্ভ যদি অরক্ষিত থাকে তাহলে রাষ্ট্রের সার্বিক সুরক্ষাও রীতিমতো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।
সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ব্যক্তিগত লাভের জন্য সরকারি দায়িত্ব পালনের বিধি-বিধান ও কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়ে কাউকে কোনো সুবিধা দেওয়া হলো দুর্নীতি। দুর্নীতি শুধু সরকারি অফিসে সীমাবদ্ধ নেই। সমাজের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে। কেবল অভাবের তাড়নায় মানুষ দুর্নীতি করে-এটি সত্য নয়। বিত্তশালী কর্মকর্তা বা ব্যক্তি আরো অর্থ সম্পদের জন্য দুর্নীতি করে। মানুষের মধ্যে নীতি-নৈতিকতার ঘাটতি হলেই দুর্নীতি জেঁকে বসে। বাংলাদেশে প্রচলিত দুর্নীতির ব্যাপকতা পর্যালোচনা করলে সত্যিই হতাশ হতে হয়। দেশের রাজনীতিবিদ, আমলাতন্ত্র, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি থেকে শুরু করে প্রতিটি পেশায় জড়িত ব্যক্তিরা এবং সাধারণ জনতার মধ্যেও কম-বেশি দুর্নীতি রয়েছে। যত দিন যাচ্ছে, দুর্নীতির ব্যাপকতা ততই বাড়ছে।
আমাদের দেশের দুর্নীতির ধরন অনেকটা ছোঁয়াচে রোগের মতো। একজনের মধ্য থেকে অন্যজনের মধ্যেও সংক্রমিত হচ্ছে। বিশেষ করে সামর্থ্যবান, ধনী, শিক্ষিত, ক্ষমতাশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনুসরণে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষমতাবান, কম শিক্ষিত লোকরাও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে ওঠে। আবার কোথাও দুর্নীতি হয় সময় ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। কোনো ব্যক্তি বা চাকরিজীবী স্বাভাবিক অবস্থায় দুর্নীতি না করলেও সুযোগ পেলে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে, অর্থাৎ পারিপার্শ্বিক ও পরিবেশের কারণেও মানুষ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়।দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে শুদ্ধতা, নৈতিকতা, সত্যবাদিতা এবং স্বাভাবিক সততা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিত। পৃথিবীর সব দেশেই কম-বেশি দুর্নীতি রয়েছে। লোভ ও অতিরিক্ত ভোগের আকাক্সক্ষা থেকেই দুর্নীতির উৎপত্তি হয়।
আমাদের দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের বিষয় যেমন বিশ্বব্যাপী আলোচিত হচ্ছে, তেমনি দুর্নীতির বিষয়টিও কারো অজানা নয়। দেশে দুর্নীতির প্রকোপ এতটা বেশি যে বর্তমানে মানুষের চিন্তা-চেতনায়ও এটি সংক্রমিত হচ্ছে, অথচ এ দেশে এরূপ বেপরোয়া দুর্নীতি মোটেও কাম্য নয়। দেশে লাগামহীন দুর্নীতি যেমন হয়, তার বিপরীতে সৎ, দেশপ্রেমিক ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিরাও রয়েছেন। সমাজের ও দেশের জন্য তারা উদাহরণস্বরূপ ও অনুসরণযোগ্য। দেশ এগিয়ে যাওয়ার পেছনে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। গত ৫১ বছরে আমাদের সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো, আমরা দুর্নীতি রোধ করতে পারিনি। দুর্নীতির পরিসর বেড়েছে। আগামীতে সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো কার্যকর করে তুলতে যোগ্যদের যথাস্থানে পদায়নের বিকল্প নেই। যেকোনো মূল্যে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন প্রতিহত করতে হবে। এর সঙ্গে সমাজের সর্বস্তরে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: সমাজ গবেষক।
ইউডি/কেএস

