বিপ্লবী প্রীতিলতা: দেশপ্রেমিক চেতনা বর্তমান প্রজন্মের প্রেরণার প্রতীক
ইমরান ইমন । বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১১:০৫
বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের আত্মদানকারী প্রথম নারী। ২৪ সেপ্টেম্বর এ বীরকন্যার আত্মাহুতি দিবস। এবছর প্রীতিলতার ৯১তম আত্মাহুতি দিবস। ১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে এ বীরকন্যা জন্মগ্রহণ। তার বাবার নাম জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার। তিনি চট্টগ্রাম মিউনিসিপাল অফিস কর্মকর্তা ছিলেন। তার মায়ের নাম প্রতিভা ওয়াদ্দেদার। ছয় ভাইবোনের মধ্যে প্রীতিলতা ছিল দ্বিতীয় সন্তান। তার পারিবারিক ডাকনাম ছিল ‘রানি’। ছদ্মনাম ছিল ‘ফুলতার’।
১৯১৮ সালে প্রীতিলতার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়। চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। প্রীতিলতা অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরুই হয়েছিল তৃতীয় শ্রেণী থেকে। ১৯২৬ সালে তিনি মেধা তালিকায় বৃত্তি লাভ করেন। তিনি ডা. খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১৯২৭ সালে লেটার মার্কসহ ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে লেখাপড়ার জন্য তিনি ভর্তি হন ইডেন মহিলা কলেজে। ১৯২৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মিলিত মেধা তালিকায় পঞ্চম স্থান এবং মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে আইএ পাস করেন প্রীতিলতা। এরপর প্রীতিলতা কলকাতার বেথুন কলেজে স্নাতক শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৩২ সালে তিনি দর্শনে স্নাতক পাস করেন। ১৯৩২ সালে চট্টগ্রামে ফিরে এসে তিনি নন্দনকানন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন।
স্বদেশি আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রীতিলতাই প্রথম নারী বিপ্লবী। প্রীতিলতা যখন বিপ্লবী দলের সদস্য হতে চাইছিলেন তখন মাস্টার দা সূর্যসেন ছিলেন পলাতক। প্রীতিলতার ভীষণ ইচ্ছা ছিল মাস্টারদার সাথে পরিচিত হবার। প্রীতিলতার প্রবল আগ্রহে এবং বহু চেষ্টার পর ১৯৩২ সালের মে মাসে মাস্টার দা সূর্য সেনের সঙ্গে তার দেখা হয়। পরবর্তীতে স্বদেশি আন্দোলনের সর্বাধিনায়ক মাস্টার দা সূর্যসেন প্রীতিলতার দায়িত্ববোধ, সাহসিকতা ও চারিত্রিক দৃঢ়তায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে পাহাড়তলীতে অবস্থিত ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ অভিযানের নেতৃত্বদানকারী হিসেবে নিযুক্ত করেন।
অভিযান সফল করার লক্ষ্যে তাদের অস্ত্রচালনা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আট সদস্য বিশিষ্ট এই দলের দলপতি ছিলেন প্রীতিলতা। তিনি ছাড়াও এ দলের বাকি সাতজন হলেন- বিপ্লবী কালিকিংকর দে, শান্তি চক্রবর্তী, বীরেশ্বর রায়, প্রফুল্ল দাস, সুশীল দে, মহেন্দ্র চৌধুরী এবং পান্না সেন। প্রীতিলতার নেতৃত্বে এই অভিযান শুরু করা হয় ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাত ১০টায়। সেদিনের বিপ্লবীদের এই অভিযান সফল হয়েছিল। নিয়মে আছে, সামরিক কায়দায় আক্রমণের সময় নেতা থাকবে সবার আগে এবং ফেরার পথে সাথীদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে নেতা ফিরবে সবার পরে। এই নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন প্রীতিলতা। অভিযান সফল হওয়ার পর হুইসেল বাজিয়ে সদস্যদের ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেন তিনি। পরবর্তীতে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন প্রীতিলতা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আত্মগোপনকারী এক ইংরেজ সৈনিকের গুলিতে বিদ্ধ হন প্রীতিলতা।
দলের সকল সদস্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরই প্রীতিলতা তার সঙ্গে বহন করা ‘পটাশিয়াম সায়ানাইড’ পান করে আত্মাহুতির পথ বেছে নেন। যাতে ইংরেজ সৈন্যরা তাকে জীবিত অবস্থায় মারতে না পারে। এখানে উল্লেখ্য, পূর্বেই নির্দেশ ছিল যেকোনো অবস্থাতেই শত্রুর হাতে জীবিত অবস্থায় ধরা দেওয়া যাবে না। আহত অবস্থায় যাতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাকে জীবিত ধরে ফেলতে না পারে সে জন্য তিনি পূর্বনির্দেশের প্রতি অবিচল থেকে সায়ানাইড বিষপান করে আত্মাহুতি দেন। পরদিন ব্রিটিশ পুলিশ প্রীতিলতার মৃতদেহ খুঁজে পেতে সক্ষম হয়। একজন নারীকে আক্রমণকারী হিসেবে শনাক্ত করে তারা হতভম্ব হয়ে যায়।
বর্তমান প্রজন্ম প্রীতিলতা সম্পর্কে জানে না, এটি একটি লজ্জাকর ব্যাপার। প্রীতিলতার মতো এমন বিপ্লবী দেশপ্রেমিক ফিরে আসুক যুগে যুগে শতবার। জাতির ক্রান্তিকালে প্রীতিলতার মতো বীরকন্যাদের বড়োই প্রয়োজন। বীরকন্যা প্রীতিলতার দুঃসাহসী মনোভাব, সংগ্রামী জীবন ও দেশপ্রেমিক চেতনা বর্তমান প্রজন্মের জন্য প্রেরণার প্রতীক।
লেখক : কলামিস্ট।
ইউডি/কেএস

