দেশে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে নবজাতক হত্যাকাণ্ড
সায়মা আঁখি । বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১০:২৫
দেশে নবজাতক হত্যাকাণ্ড আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। প্রায়ই রাজধানীসহ দেশের কোনো না কোনো এলাকায় ডাস্টবিন, সড়কের পাশে কিংবা পরিত্যক্ত জায়গায় নবজাতকের লাশ মিলছে। সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় নবজাতক হত্যার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গত এক বছরে শুধু রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩০০ নবজাতকের লাশ উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ সময়ে শহীদ মিনার এলাকা থেকে ৫টি লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। উদ্ধারকৃত নবজাতকদের পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব না হওয়ায় বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। এসব নবজাতক ব্যাগে, কাপড়ে বা বস্তায় মুড়িয়ে ফেলে দেয়া হয়। কখনো কখনো বেঁচে থাকা নবজাতককে উদ্ধার করা হলেও তাদের পিতা-মাতার সন্ধান পাওয়া যায় না। সমাজবিদরা বলেছেন, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে এ ধরনের নিষ্ঠুর ও অমানবিক ঘটনা বেড়ে চলেছে। তারা বলেছেন, মাদকের আগ্রাসন, অবাধ মেলামেশা, সহজলভ্য পর্নোগ্রাফি, নারী-পুরুষের বিবাহবর্হিভূত অনৈতিক সম্পর্কের কারণে এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছে।
ইসলামে মানবহত্যা মহাপাপ। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘যে একজন মানুষ হত্যা করল, সে যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করল।’ পূর্ণাঙ্গ কিংবা নবজাতক কাউকেই হত্যা করা যাবে না। অথচ এখন মানুষ হত্যা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এর সাথে নবজাতক হত্যাও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। যারা হত্যা করছে, তারা মনে করছে, অবোধ নবজাতক হত্যা কোনো অপরাধ নয়। ইসলামে তো বটেই, আইনেও যেকোনো মানবহত্যা নিষেধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। শুধু নবজাতক হত্যাই নয়, ভ্রুণ নষ্ট করাও ইসলামে পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধ। এটাও হত্যার শামিল। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও ভ্রুণ নষ্ট না করে রেজিস্ট্রেশনের বিধান রয়েছে। অথচ আমাদের ৯২ ভাগ মুসলমানের দেশে ভ্রুণ নষ্ট করা এবং নবজাতককে হত্যা করে রাস্তার পাশে ফেলে রাখা সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে পারিবারিক ও সামাজিক নীতি-নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় চলেছে। সামগ্রিক সামাজিক ব্যবস্থায় পচন ধরেছে। সমাজে নানা ধরনের অপরাধ বিস্তার লাভ করেছে। খুন, ধর্ষণ, মাদক, কিশোর গ্যাং কালচার, ইভটিজিং থেকে শুরু করে হেন কোনো অনৈতিক ঘটনা নেই যা ঘটছে না। এর কুফল এখন মারাত্মক আকারে প্রকাশ পাচ্ছে। পরকীয়া, প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে অবাধ মেলামেশা এখন ওপেন সিক্রেট হয়ে পড়েছে। ফলে ভ্রুণ ও নবজাতক হত্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এর সাথে জড়িতরা কতটা নিষ্ঠুর ও নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত হয়ে পড়েছে, তা সহজেই অনুমেয়।
আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ এখন নিঃশেষের পথে। এর জন্য শুধু পরিবার ও সামাজ দায়ী নয়, রাষ্ট্রেরও দায়ভার রয়েছে। পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ, রীতিনীতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ অক্ষুন্ন রাখার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে। পাঠ্যপুস্তক থেকে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতার বিষয়গুলো উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এতে মূল্যবোধহীন প্রজন্ম গড়ে উঠছে। দুঃখের বিষয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের এই দেশে একশ্রেণীর তথাকথিত প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িকতার নামে ইসলাম বিদ্বেষ ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ধ্বংসে উঠেপড়ে লেগেছে। এর কুফল একশ্রেণীর তরুণ-তরুণীর মধ্যে দেখা যাচ্ছে। তারা অবাধ মেলামেশা, লিভ টুগেদার, বিয়ে বর্হিভূত সম্পর্ক থেকে শুরু করে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে অনাকাক্সিক্ষত শিশু যেমন জন্ম নিচ্ছে, তেমনি তাদের হত্যা কিংবা সড়কের পাশে ফেলে দেয়ার মতো গর্হিত অপরাধ সংঘটিত করছে।
আমাদের পারিবারিক এবং সামজিক মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতা ক্ষয়ে যাওয়ার জন্য অভিভাবক শ্রেণীরও দায় রয়েছে। তাদের উদাসীনতা ও প্রশ্রয়েই সন্তান বা স্বজনরা নানা অনৈতিক কাজ ও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পরিবার ও সমাজের অভিভাবকরা সচেতন হলে যেকোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ড রোধ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে পারিবারিক এবং সমাজের মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়া অত্যন্ত জরুরি। ধর্মীয় মূল্যবোধ বৃদ্ধি ও ধরে রাখার ক্ষেত্রে দেশের আলেম-ওলামাদের আরও সক্রিয় হওয়া বাঞ্ছনীয়। সরকারের উচিৎ পারিবারিক ও সামাজিক অবক্ষয় রোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ ও তা ব্যাপকভাবে প্রচার করা। পাঠ্যসূচিতে ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা।
লেখক- সমাজ গবেষক।
ইউডি/সুস্মিত

