খাদ্যশস্যে আমাদের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনবিষয়ক বিভ্রান্তি দূর করা প্রয়োজন

খাদ্যশস্যে আমাদের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনবিষয়ক বিভ্রান্তি দূর করা প্রয়োজন

সলিমুল কায়সার । বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১০:৪০

বিশ্ব পরিসরে খাদ্যশস্যের সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে এমন সাবধানবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে জাতিসংঘের তরফ থেকে। এই সাবধানবাণীতে বিশ্বের অনেক দেশই চেষ্টা করবে খাদ্যশস্য আমদানি করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। খাদ্য উৎপাদনের দিক থেকে ঘাটতি দেশগুলোর জন্য এই সাবধানবাণীটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো খাদ্যশস্য আমদানি করা না গেলে পরে কোথাও খাদ্যশস্য পাওয়া মুশকিল হবে। সরবরাহ ঘাটতির পরিস্থিতি দুর্ভিক্ষ পর্যন্ত গড়াতে পারে। বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে সরকারঘনিষ্ঠ মহলগুলো দাবি করছে, বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু এর পাশাপাশি যখন বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়, তখন খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দাবিকে আমরা কীভাবে দেখব?

খাদ্যশস্য আমদানির তথ্যগুলো দিবালোকের মতো স্পষ্ট। দৈনিক সংবাদপত্রগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে খাদ্যশস্য আমদানির খবর প্রকাশ করে। একথা ঠিক যে, খাদ্যশস্যের বাজারে অস্থিরতা ঠেকাতে সরকারের হাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণের খাদ্যশস্যের মজুত থাকতে হয়। কৃত্রিমভাবে খাদ্য ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ালে তা নিয়ন্ত্রণের জন্যও সরকারের হাতে মজুত খাদ্যশস্য থাকা প্রয়োজন। অস্থিরতার সময়ে মজুত থেকে চাল বা গম তুলে নিয়ে বাজারে ছড়িয়ে দিতে পারলে ব্যবসায়ীদের কারসাজি বহুলাংশে রোধ করা সম্ভব। এর অর্থ দাঁড়ায়, বাজারকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নিছক খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা যথেষ্ট নয়। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য দেশীয় মোট উৎপাদনের ১০ শতাংশ মজুত হিসাবে থাকা বাঞ্ছনীয়। এই পরিমাণটি কম-বেশি ৩০ লাখ টন। দেখা যাচ্ছে, চালের বাজারে অংশীজনের সংখ্যা বেশ কয়েকটি। বাজার পরিস্থিতি কেমন হবে তার জন্য একদিকে এই অংশীজনদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি চালের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। সব মিলে চালের বাজার খুবই জটিল।

খাদ্যমন্ত্রীর মতে, একশ্রেণির ব্যবসায়ী বিভিন্ন সুযোগে চালের বাজার অস্থির করে তোলেন। তখন খুচরা ব্যবসায়ীরা দায়ী করেন পাইকারি ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের। অন্যদিকে মিল মালিকরা খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের ওপর দোষ চাপান। এ সমস্যার সমাধানে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তিন স্তরের দাম ঘোষণার ব্যবস্থা করা হবে, যাতে কেউ কাউকে দোষারোপ করতে না পারে। প্রশ্ন হলো, এই সামান্য কাজটি কেন করা হয়নি? সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলে। এই যদি হয় ডিজিটাল বাংলাদেশের নমুনা, তাহলে এতদিন কী করা হয়েছে?

সম্প্রতি দেশে বোরো সংগ্রহ শেষ হয়েছে। ডিসেম্বরে আমন ধান ঘরে উঠতে শুরু করবে। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর-এই তিন মাস বাজারে চালের দাম বাড়ার একটা প্রবণতা থাকে। এই তিন মাসে ওএমএস, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও টিসিবির কার্ডের জন্য সরকারের গুদাম থেকে ৯ লাখ টনের ওপর চাল বের হয়ে যাবে। এই ঘাটতি পূরণে সরকার আমদানির ওপর জোর দিচ্ছে। মনে রাখা দরকার, আমন মৌসুমের শুরুতে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়নি বলে আমন চাষে বিঘ্ন ঘটেছে। সরকারকে মনে রাখতে হবে, আমনের উৎপাদন আশানুরূপ নাও হতে পারে। সেজন্য আগাম প্রস্তুতি প্রয়োজন। ব্যবসায়ীরা ধান আটকে রাখছেন বলে অভিযোগ করেছেন মিল মালিকদের এক নেতা।

পর্যবেক্ষক মহল বলছে, সরকার এফওবি দর নিয়ে যে তথ্য দিচ্ছে, তাতে সমস্যা নেই। তবে ভিয়েতনামের চালের পরিবহণ খরচ অনেক বেশি দেখানো হচ্ছে। এ ব্যাপারে খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, এটা খুবই পরিষ্কার বিষয়। বেসরকারিভাবে যারা বিভিন্ন পণ্য আমদানি করে, তাদের সঙ্গে যাচাই করে দেখুন। যদি আমাদের চালের পরিবহণ খরচ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, সেটাও লিখুন।

আমরা কোনো লুকোচুরি করছি না। থাইল্যান্ড সরাসরি বাংলাদেশের কাছে চাল বিক্রি করতে চাচ্ছে না। অথচ ভিয়েতনামের কাছে চাল বিক্রি করছে। এটা একটা বিরাট পাজল। যতদূর জানি, থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক খারাপ নয়। তা সত্ত্বেও থাইল্যান্ড কেন বাংলাদেশে চাল রপ্তানি করতে নানা অজুহাত দিচ্ছে, সেটা এক তাজ্জব ব্যাপার। তবে ভিয়েতনাম থেকে চাল আমদানির অন্য খরচ কিছুটা হলেও অস্বাভাবিক। এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা প্রয়োজন।

লেখক- সিনিয়র সাংবাদিক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading