কিশোরগঞ্জে জমে উঠেছে ৫০০ বছরের পুরোনো ঢাকের হাট

কিশোরগঞ্জে জমে উঠেছে ৫০০ বছরের পুরোনো ঢাকের হাট

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৫:৩০

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে ঢাক-ঢোল ও বাদ্যযন্ত্রের বিরাট হাট বসেছে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে। ঢাক-ঢোল ছাড়াও নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র পাওয়া যায় এই হাটে। বৃহস্পতিবার (২৯ সেপ্টেম্বর) থেকে শুরু হওয়া এ হাট চলবে শনিবার (০১ অক্টোবর) সকাল পর্যন্ত।

নাম ঢাকের হাট হলেও, এখানে ঢাক বা কোনো বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। বাদ্যযন্ত্র বাদকরা অর্থের বিনিময়ে পূজা চলাকালীন আয়োজকদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। কার চুক্তি মূল্য কত হবে, তা নির্ধারণ হয় ঢাকিদের দক্ষতার ওপর। পূজা কমিটির কর্তারা যাচাই করে নেন ঢাকিদের দক্ষতা।

প্রায় পাঁচশো বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী বাদক ও যন্ত্রীদের মিলন উৎসবে ঢাক-ঢোল, কাঁসর, সানাই, বাঁশি, কর্তাল, খঞ্জরিসহ বাঙালির চিরচেনা সব বাদ্যযন্ত্রের পসরা সাজিয়ে হাঁটে বিক্রির উদ্দেশে বাজনা বাজানোর নৈপূণ্য প্রদর্শনের মহড়ায় মেতে ওঠেন বাদক দল। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা এসব বাদক দলকে পূজামণ্ডপের জন্য ভাড়া করতেও বিভিন্ন এলাকার পূজারিগণ ভিড় করেন। ১০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ভাড়ায় মিলছে এসব বাদক দল।

জনশ্রুতি আছে, ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে স্থানীয় সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় তার রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করতেন। কটিয়াদীর চারিপাড়া গ্রামে ছিল রাজার প্রাসাদ। একবার রাজা নবরঙ্গ রায় সেরা ঢাকিদের সন্ধান করতে ঢাকার বিক্রমপুরের (বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ) বিভিন্ন স্থানে আমন্ত্রণ জানিয়ে বার্তা পাঠান।

সে সময় নৌপথে অসংখ্য ঢাকির দল পুরোনো ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে যাত্রাঘাটে সমবেত হন। রাজা নিজে দাঁড়িয়ে একে একে বাজনা শুনে সেরা দলটি বেছে নিতেন এবং পুরস্কৃত করতেন। সেই থেকেই যাত্রাঘাটে ঢাকের হাটের প্রচলন শুরু হয়। পরে এ হাট স্থানান্তর করে কটিয়াদীর পুরাতন বাজারের মাছ মহাল এলাকায় আনা হয়।

সিলেট থেকে সাতজনের বাদক দল নিয়ে এসেছেন তারা মিয়া। তিনি বলেন, পূজায় সবাই আনন্দ করে। কিন্তু আমাদের চলে আসতে হয় পরিবার ছেড়ে। বংশ পরস্পরায় এটি হয়ে আসছে। নিজের পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে চলে আসি এই হাটে। আশা ঢাক বাজিয়ে পরিবারের জন্য নতুন কাপড় নিয়ে যাবো। এবার হাটে ভালো টাকা বায়না পাব বলে আশা করছি।

সুনামগঞ্জ থেকে বাদ্যদল নিয়ে এসেছেন আব্দুল মালেক খান। তিনি জানান, এটা আমাদের ব্যবসা। তাই মুসলিম হয়েও মণ্ডপে বাদ্য বাজিয়ে জীবন চালায়।

সুনামগঞ্জ থেকে ১২ জনের একটি দল নিয়ে এসেছেন সুকুমার বাবু। তিনি জানান, এটা আমাদের বংশগত ব্যবসা। প্রতি বছরই এ ঢাকের হাটে আসি। করোনার কারণে গত দুই বছর বেশি টাকা পাইনি। এবার ভালো টাকা পাব বলে আশা করছি।

জেলার তাড়াইল উপজেলা থেকে বাদ্যদল বায়না করতে এসেছেন নিরঞ্জন সরকার। তিনি বলেন, এই হাট থেকে প্রতি বছরই দুর্গাপূজার জন্য ঢাক-ঢোল বায়না করে নিয়ে যায়। এবারও এসেছি। ২৬ হাজার টাকা বায়নায় ১টি ঢাক ও ১টি ঢোল নিয়ে মণ্ডপে ফিরছি।

নরসিংদী থেকে ঢাকির দল ভাড়া করতে এসেছেন তপন রায়। তিনি বলেন, ৬০ হাজার টাকায় দল ঠিক করেছি। প্রতি বছর এ হাট থেকেই ঢাকি নিয়ে যাই। ঘুরে ঘুরে বাজনা শুনেছি। একটি দলের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। হাটটা বেশ উপভোগও করি আমি।

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের কটিয়াদী উপজেলার সভাপতি ও ঢাকের হাট পরিচালনা কমিটির সদস্য বেণী মাধব ঘোষ বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে এ বাদ্যযন্ত্রের হাট বসলেও চিরচেনা তাল ও সুরের প্রদর্শনের মহড়ায় প্রকৃত পক্ষে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির মিলন মেলায় পরিণত হয়। সব ধর্মের লোকজনই হয়ে ওঠে ওদের রক্ষাকবচ।

কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম শাহদাত হোসেন বলেন, পূজার আয়োজক ও বাদকদের নিরাপত্তার জন্য কটিয়াদী মডেল থানা পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ঢাকের হাটে পুলিশের একটি দল কাজ করছে।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading