ভেজালমুক্ত খাদ্য মানুষের হাতে তুলে দেওয়ার বিকল্প নেই
শারমিন সুলতানা । বৃহস্পতিবার, ১৩ অক্টোবর ২০২২ । আপডেট ১১:০০
সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন বিশুদ্ধ ও পুষ্টিকর খাদ্য। আর খাদ্যের নামে আমরা কি খাচ্ছি প্রতিদিন? এ দেশের মানুষরূপী কিছু মানব বাংলাদেশে বিশুদ্ধ খাবার প্রাপ্তি কঠিন করে ফেলছে। দেশে ভেজাল দাতার জন্য আইন প্রণয়ন হয়েছে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড? তবে এ আইনের প্রয়োগ নেই বললেই চলে। ভয়ংকর কোনো শাস্তির ব্যবস্থা করা না গেলে দেশে ভেজাল সন্ত্রাস কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না। এসব মানব ঘাতক তথা খুনিদের জন্য দ্রম্নত বিচারের ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই? রাষ্ট্রকে ভেজাল খাদ্য রোধে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে অবিলম্বে। এত মানুষ ভেজাল খেয়ে আক্রান্ত হচ্ছে; আর মারা যাচ্ছে এর ব্যর্থতার দায় কার? এ জাতিকে বাঁচাতে, সুস্থ রাখতে এক্ষুনি এই মুহূর্তে প্রয়োজন ভেজালদাতাকে জনসমক্ষে কঠিন শাস্তি দেওয়া।
ভেজাল কারবারিরা ইতোমধ্যে ২ কোটি মানুষকে কেবল কিডনি রোগে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে অবলীলায়। এর মধ্যে প্রায় ৫০-৬০ হাজার লোক ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে জীবন ধারণ করছে। ভেজালের কারণে দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রম্নত বাড়ছে। এ ছাড়া অন্তঃসত্ত্বা মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। ক্যানসারসহ কোনো কোনো রোগে আক্রান্ত আরও ২ কোটি মানুষ। প্রতিনিয়ত ভেজাল দ্রব্য খেয়ে কঠিন রোগে আক্রান্ত হওয়ার অপেক্ষায় আছে বাকি ১৪ কোটি মানুষ। এসব তথ্য জনমনে আতঙ্ক তৈরি করে বৈকি! কেবল ক্যানসারের কারণে বাংলাদেশে প্রতিদিন অন্তত ২৭৩ জনের মৃত্যু হয় বলে খোদ তথ্য দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। মন্ত্রী এক সেমিনারে বলেন, বাংলাদেশে এখন প্রায় ২০ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত। প্রতি বছর আরও প্রায় এক থেকে দেড় লাখ মানুষ এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে এই তালিকায়। মৃত্যুও হয় লাখের কাছে। রোজ মারা যায় ২৭৩ জন। ক্যানসার সম্পর্কিত গেস্নাবোক্যানের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর দেড় লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। যার মধ্যে ৯১ হাজারের অধিক মানুষই মৃত্যুবরণ করেন। এদিকে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল পরিচালক বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়েও বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যের উদ্ধৃতি বাংলাদেশে ৬০ ভাগ ক্যানসার রোগী প্রায় ৫ বছরের মধ্যে মারা যায়। দেশে ক্যানসার রোগীর মৃত্যুর হার বর্তমানে প্রায় ৮ ভাগ এবং এই সংখ্যা ২০৩০ সালে এটি ১৩ ভাগে উন্নীত হবে।
আমরা প্রতিনিয়ত যে খাবার খাচ্ছি তাতে একটু একটু করে দেহে বিষ জমা হচ্ছে। এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা। খাদ্য ভেজালের বিষক্রিয়া দেহের ভেতর দীর্ঘদিন জমা থাকে কখনো নিঃশেষ হয় না। ফলে দেহে থাকা বিষ বংশানুক্রমে স্থানান্তর হয়। যা থেকে নানা রোগের জন্ম দেয়। খাদ্যে কেমিক্যাল এবং ভেজাল মিশিয়ে সমগ্র জাতিকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে এক শ্রেণির অসাধু ভেজালকারবারি। এসব ভেজাল খাদ্য মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে ওরা নামান্তে শিশু হত্যা করছে, এ দেশের বুদ্ধিজীবী, জ্ঞানী-গুণী তথা দেশের আমজনতাকে হত্যা করছে। তাই খাদ্যে ভেজাল গণহত্যার শামিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেজাল মিশ্রিত খাদ্যের কারণে কিডনি রোগ, ক্যানসার, হাঁপানি, অন্ত্রে ব্যথা, পেটের পীড়া, গর্ভপাত, বন্ধ্যাত্ব, শ্বাসকষ্ট, যকৃত, পিস্নহা, স্নায়ুর ক্ষতি, ফুসফুসের রোগ, ডায়াবেটিস, প্রজনন অক্ষমতা, মাংসপেশির সংকোচন, ববি বমি ভাব, মুখে অতিরিক্ত লালা ঝরা, চোখে পানি পড়া, মাথা ব্যথা, চোখের মণি ছোট হয়ে আসা, ঝাপসা দেখা, দুর্বলতা, তলপেটে ব্যথা, খিঁচুনি রোগ হতে পারে। খাদ্যে ভেজাল মিশিয়ে সমগ্র জাতিকে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। ভেজাল খেয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে, নানারোগে ভুগছে মানুষ।
বেঁচে থাকার জন্য আমাদের দরকার নিরাপদ খাবার। যারা ভেজাল খাবার বিক্রি করে, তাদের শাস্তি হওয়া জরুরি। নিরাপদ খাবার পেতে সব ক্ষেত্রে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং আইন অমান্যকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দেশের মানুষকে আগে সুস্থ রাখতে হবে। ভেজালমুক্ত খাদ্য মানুষের হাতে তুলে দেওয়ার বিকল্প নেই। সরকারকে জনগণের জন্য ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। আমরা চাই, সুস্থ সবল সোনার দেশ। চাই সুস্থ মানুষ।
লেখক- সমাজ বিশ্লেষক।
ইউডি/সুস্মিত

