ডিপ্রেশন কোনও নাটক নয়, ডিপ্রেশড মানেই পাগল নয়

ডিপ্রেশন কোনও নাটক নয়, ডিপ্রেশড মানেই পাগল নয়

নুসরাত জাহান শুচি । বৃহস্পতিবার, ১৩ অক্টোবর ২০২২ । আপডেট ০৯:৪০

মানব শরীর মানে শুধু রক্ত মাংসের এই কাঠামো ছাড়াও আরেকটা প্রধান ভাগ হলো আমাদের মন কিংবা বলা যায় মানসিক স্বাস্থ্য। মানসিক রোগ অনেক ধরনের আছে যার মধ্যে ডিপ্রেশন অন্যতম। এই ইংরেজি ডিপ্রেশন শব্দটার বাংলা অর্থ হলো বিষন্নতা; কিন্তু কেন যেন আমার কাছে বিষন্নতা শব্দটা এই রোগের ব্যাপকতার তুলনায় অনেক ছোট মনে হয়। তাই আমি ডিপ্রেশন শব্দটাই ব্যবহার করতে ইচ্ছুক। ডিপ্রেশনে থাকা এই মানুষগুলো নিজের ভেতরে এক সমুদ্র শূন্যতা চেপে রেখে আপনার আমার চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। তারা প্রতিনিয়ত স্বাভাবিক সুন্দর জীবনের অভিনয় করে যায়। কিন্তু এই সুন্দর বর্নিল পৃথিবীতে থেকেও তাঁদের পৃথিবী ধূসর, বর্ণহীন। ডিপ্রেশন কোনো নাটক নয়, ডিপ্রেশড মানেই পাগল নয়। এটি একটি মানসিক ইমব্যালেন্সড সিচুয়েশন। এটি সাইকোলজিরই একটি অংশ। যার পরিণতি হয় অত্যন্ত ভয়ংকর। অথচ খুব সহজেই করা যায় এর চিকিৎসা। আমরা ডিপ্রেশন শব্দটাকে যতটা সহজভাবে নিতে পারি সাইকোলজিক্যাল ডিসওর্ডার শব্দটাকে ততটা সহজে এখনো এক্সসেপ্ট করতে পারিনি। এর সঙ্গে মানুষের পরিচিতিও খুবই কম।

জীবনের লক্ষ্য যখন কাউকে বলে দেওয়া হয় তখন মানবমস্তিষ্ক থেকে এমন কিছু হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মস্তিষ্ককে সেই কাজে সফলতার আনন্দ দেয়। মস্তিষ্ক তখন সেই কাজটি কর?তে মানুষকে ডিমোটিভেট করে। ফলে সেই কাজ করার আগ্রহ ক্রমেই কমে যায়। যার ফলে আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনা কমে যায়। একটু লক্ষ করলেই একটি বিষয় দেখা যায়, আমরা যখন নিজেদের মাতৃভাষায় কথা বলি, তখন ভেবে কথা বলি না। কিন্তু যখন বিদেশি কোনো ভাষা অর্থাৎ ইংরেজি বা হিন্দি ভাষায় কথা বলি, তখন অনেক ভেবেচিন্তে কথা বলি। কেননা অন্য ভাষায় কথা বলতে গেলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আমাদের মস্তিষ্ককে সচেতন করে। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিদেশি কোনো ভাষায় সিদ্ধান্ত নিলে সেটি বেশি যুক্তিসঙ্গত হয়। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর এক সমীক্ষায় দেখা যায়, যখন আমরা মাতৃভাষায় কোনো সিদ্ধান্ত নিই, তখন আমাদের অবচেতন মন আবেগকে বেশি প্রাধান্য দেয়। কিন্তু দ্বিতীয় কোনো ভাষায় চিন্তা করলে মস্তিষ্ক লজিককে প্রাধান্য দেয়। তাই আমাদের উচিত গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দ্বিতীয় কোনো ভাষায় চিন্তা করা।

অনেকের মুখে প্রায়ই শোনা যায়, সারা দিন বাড়ি থেকে বের হইনি শরীরটা ঝিম ঝিম করছে, মন ভালো নেই। এ কথা শুনে অনেকেই বলে বসেন যতসব ঢং। কিন্তু জানেন সূর্যের আলো শরীরে পড়লে এক ধরনের হরমোন নিঃসৃত হয়, যার ফলে মন ভালো হয়ে যায়। সূর্যের আলো হাড় এবং মন দুটির জন্যই উপকারী। তাই সারা দিন ঘরে বসে কাজ না করে সময় করে কিছুক্ষণের জন্য সূর্যের আলোয় বের হয়ে যাওয়া উচিত। এতে শরীর ও মন ভালো থাকে। কাজ করার আগ্রহও বেড়ে যায়। তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ৪.৪৪% লোক ডিপ্রেশনে আক্রান্ত; যার মধ্যে পুরুষের তুলনায় মহিলার সংখ্যা ২% বেশী। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় এই সংখ্যা আরও অনেক বেশী। কারণ এই সামাজিক ট্যাবুর জন্য আমরা অনেকেই এই জিনিস নিয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করিনা।

আমাদের অনেকেরই অনেক বড় একটি সমস্যা হলো, আমরা একবারে অনেক কাজ করে ফেলতে চাই। ফলাফল স্বরূপ কোনো কাজই ঠিক মতো হয় না। আমরা দুই-তিনটি কাজ একসঙ্গে শুরু করে মনে করি, আমরা মাল্টিটাস্ক করছি। আসলে তখন মস্তিষ্ক এক কাজ থেকে অন্য কাজে স্থানান্তর করে। বিশেষ করে যেসব কাজে ব্রেনের সক্রিয়তা প্রয়োজন, সেসব কাজ ব্রেন কখনোই একসঙ্গে করতে পারে না। এখন অনেকেই বলতে পারেন, আমরা খাবার খাওয়ার সময় টিভি দেখি একসঙ্গে দুটি কাজ করা হলো। এক্ষেত্রে অনেক দিনের অভ্যাসের ফলে কাজ দুটি এক সঙ্গে করা হলেও মস্তিষ্কের খুব বেশি সক্রিয়তার প্রয়োজন হয় না। তাই আমরা কাজগুলো করতে পারি। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সব কাজই আমাদের সাইকোলজির সঙ্গে জড়িত। এই সাইকোলজিকে আমরা অবচেতন মন বলে ব্যাখ্যা করি। আসলে সাইকোলজি আমাদের আবেগ বা অবচেতন মন নয়। এটি একটি বিজ্ঞান-যা প্রমাণিত। নতুন কিছু পড়তে-শিখতে-জানতে আমাদের মস্তিষ্ক কতটা ক্রিয়াশীল তা নিয়ে গবেষণা করছে নিউরোসাইকোলজি। তাই সাইকোলজিক্যাল বিষয়গুলো কোনো পাগলামি বা কুসংস্কার নয়, মানবমনের সুস্থতার নতুন দ্বার।

লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading