দেশকে জলাতঙ্ক মুক্তকরণে সবার সহযোগিতা একান্ত কাম্য

দেশকে জলাতঙ্ক মুক্তকরণে সবার সহযোগিতা একান্ত কাম্য

রফিকুল হায়দার । বৃহস্পতিবার, ১৩ অক্টোবর ২০২২ । আপডেট ০৯:৩০

পানির শব্দ, পানি দেখে বা পানির কথা মনে পড়লে প্রচন্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়ে বলে এই রোগের নাম ‘হাইড্রোফোবিয়া’ বা জলাতঙ্ক। অবশ্য এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর ভালো হওয়ার সম্ভাবনা কম এবং মৃত্যুর হার প্রায় শতভাগ। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন এবং প্রতি বছর প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ জলাতঙ্ক রোগে মারা যান। বাংলাদেশেও বছরে গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী মৃত্যুবরণ করেন জলাতঙ্কে। শুধু মানুষই নয়, প্রতি বছর প্রায় ২৫ হাজার গবাদিপশুও জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে থাকে দেশে। আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশ বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি।
জলাতঙ্ক সাধারণত প্রাণীবাহিতর্ যাবিস ভাইরাসের মাধ্যমে ছড়ায়। এশিয়া মহাদেশে কুকুরই প্রধান বাহক, যা এই রোগটি ছড়ায়। এছাড়া অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে বিড়াল, পাতিশিয়াল, শিয়াল, ভোদড়জাতীয় প্রাণী, ভালুকজাতীয় প্রাণী, নেকড়ে বা বেজির মধ্যেও এ ভাইরাসটি থাকে। বৈজ্ঞানিক লুইপাস্তুর সর্ব প্রথম ১৮৮৪ সালে জলাতঙ্ক রোগের টিকা আবিষ্কার করেন। অনাগত ভবিষ্যতে কোটি কোটি মানুষ বা প্রাণীর জীবন রক্ষার উপায় উদ্ভাবন করে বিশ্বমানবতার জন্য এক অনন্য কল্যাণ সাধন করেছিলেন।

আমাদের দেশে অধিকাংশ জলাতঙ্ক রোগ হয় কুকুর, বিড়ালের কামড়ে এবং কুকুরে কামড়ানো ব্যক্তির ৪০ শতাংশই হলো ১৫ বছরের কম বয়সি শিশু। আক্রান্ত প্রাণীর মুখের লালায় জলাতঙ্কের ভাইরাস থাকে। ভাইরাস বহনকারী এই লালা সুস্থ ব্যক্তির শরীরে পুরনো ক্ষতের বা দাঁত বসিয়ে দেওয়া ক্ষতের মাধ্যমে কিংবা সামান্য আঁচড়ের মাধ্যমে রক্তের সংস্পর্শে এলে বা অতি দুর্লভ ক্ষেত্রে আক্রান্ত প্রাণীর লালা থেকে সৃষ্ট অ্যারোসল বাতাসের মাধ্যমে সুস্থ ব্যক্তির ফুসফুসে প্রবেশ করলের্ যাবিস ভাইরাস ধীরে ধীরে প্রান্তীয় স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। ফলে গলবিল এবং খাদ্যনালির মাংসপেশির কাজ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুও আক্রান্ত হয়। সাধারণত আক্রান্ত প্রাণী সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ানোর পাঁচ-ছয় দিন থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত শরীরে সুপ্তাবস্থায় থাকতে পারে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, কামড় দেওয়ার পর ২০-৬০ দিন পর উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

জলাতঙ্কের জন্য দুই ধরনের টিকা রয়েছে। ক্ষতের তীব্রতা ও আধিক্যের ওপর ভিত্তি করে কারও ক্ষেত্রে এক ধরনের, আবার কারও কারও ক্ষেত্রে উভয় ধরনের টিকা প্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে। যত তাড়াতাড়ি জলাতঙ্কের এ টিকা গ্রহণ করা যায়, ততই মঙ্গল। সাধারণত প্রথম দিন টিকা দেওয়ার পর ৩, ৭, ১৪, ২৮ ও ৯০তম দিনে টিকার মোট ৬টি ডোজ চামড়ার নিচে এ টিকা প্রয়োগ করতে হয়। টিকার সব ক’টি ডোজ সময়মতো গ্রহণ করে টিকার কোর্স সম্পন্ন করা আবশ্যক। যারা কুকুর, বিড়াল বা অন্য প্রাণী লালন-পালন করেন, তারা প্রতিষেধক হিসেবে টিকা দিতে পারেন। প্রথম ডোজ দেওয়ার পর সাত দিনে দ্বিতীয় ডোজ, ২১ বা ২৮ দিনে তৃতীয় ডোজ এবং বুস্টার ডোজ দিতে হবে এক বছর পর।

সুতরাং পরিবারের ছোট্ট শিশু থেকে শুরু করে সবার জীবন রক্ষার্থে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া আবশ্যক। বিশেষ করে যারা কুকুর, বিড়াল, খরগোশ, ইঁদুরসহ অন্যান্য প্রাণী লালন-পালন করেন। আর আক্রান্ত হলে বিলম্ব না করে অবশ্যই নিয়মানুযায়ী টিকাগুলো নিতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী। জলাতঙ্ক প্রতিরোধে পোষা ও অ-পোষা সব বিড়াল-কুকুরকে জলাতঙ্কের টিকা কার্যক্রমের আওতায় আনাও একটি কার্যকর উপায়। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই মৃত্যুদূত ব্যাধিকে করায়ত্ত করা সম্ভব।

জনস্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ‘দেশকে জলাতঙ্ক মুক্ত করতে জলাতঙ্ক রোগের প্রধান বাহক কুকুরকে ব্যাপক হারে টিকা প্রদান কার্যক্রম পরিচালনা জরুরি। সুতরাং কুকুরে জলাতঙ্ক রোগ-প্রতিরোধ করে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীকেও নিরাপদ করা সম্ভব। জলাতঙ্ক রোগ নির্মূলের বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা হলো ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বকে কুকুরবাহিত জলাতঙ্ক রোগমুক্ত করা। উক্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের প্রস্তুতকৃত জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মকৌশল দেশের অনেকাংশে কার্যকর ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে যা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সুতরাং এ কৌশলগুলো যথারীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে কাঙ্ক্ষিত সময়ের মধ্যে জলাতঙ্ক রোগ নির্মূল করে জলাতঙ্ক মুক্ত বিশ্বের সঙ্গে জলাতঙ্ক মুক্ত বাংলাদেশ উপহার দেওয়া সম্ভব হবে।

লেখক- সমাজ বিশ্লেষক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading