বিশ্ব খাদ্য দিবস আজ: বিশ্বের ঘাড়ে সংকটের নিঃশ্বাস

বিশ্ব খাদ্য দিবস আজ: বিশ্বের ঘাড়ে সংকটের নিঃশ্বাস

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২২ । আপডেট ১২:০০

আজ বিশ্ব খাদ্য দিবস। মহামারি করোনা ভাইরাস ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে সংকটময় অবস্থায় এখন খাদ্য নিরাপত্তা। বিশ্বের ঘাড়ে এখন সংকটের নিঃশ্বাস। ৪৮টি দেশের প্রায় চার কোটি মানুষ এখন চরম খাদ্য সংকটে রয়েছে। এই সংকট আগামী বছর (২০২৩ সাল) আরও চরম পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞগণ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তাই আগাম প্রস্তুতি গ্রহণে দেশের সবাইকে বারংবার আহ্বান জানাচ্ছেন। খাদ্য উৎপাদনই বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের মুহূর্তে একটি দেশকে নিরাপত্ত দিতে পারে বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। বিস্তারিত লিখেছেন আসাদ এফ রহমান

করোনার ভয়াবহতা, বিশ্ব অস্তিরতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলায় এবারের বিশ্ব খাদ্য দিবস-২০২২ এর মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে ‘কাউকে পশ্চাতে রেখে নয়। ভালো উৎপাদনে উত্তম পুষ্টি, সুরক্ষিত পরিবেশ এবং উন্নত জীবন’। পরিস্থিতি বিবেচনায় এই প্রতিপাদ্য যথার্থই মনে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধিক খাদ্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, সকলের উচিত এক ইঞ্চিও জমি অনাবাদী না রেখে খাদ্য উৎপাদনের মনোনিবেশ করার। যে অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব তাতে শুধু দরিদ্র দেশই নয় বরং উন্নত দেশগুলোতেও খাদ্য সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। তাই আসন্ন এই দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় এখন থেকে প্রস্তুতি না গ্রহণ করলে ভয়াবহ এক বিপদই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। গত জুন মাস থেকেই জাতিসংঘ বিশ্বের সম্ভাব্য খাদ্য সংকটের বিষয়ে সতর্ক করে আসছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এর আশঙ্কা বৈশ্বিক মন্দার কবলে পরলে বিশ্বের ৩৫ কোটি মানুষ খাদ্য সংকটে পড়বে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এর মতে বিশ্ব চরম খাদ্য সংকটের দিকে যাচ্ছে। সেই সংকট মোকাবেলায় আমাদের এখন থেকেই কাজ করতে হবে। একটি টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো দেশের জন্যই প্রধান চ্যালেঞ্জিং বিষয়।

জাতিসংঘের খাদ্য এবং কৃষি সংস্থা

সংকটের মাত্রা আরও বাড়ার নেপথ্যে কী: খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নিজেদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২১টি দেশ ৩০ ধরনের খাদ্য উপকরণ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। কিছু দেশ খাদ্য রপ্তানি নিরুৎসাহিত করতে বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী খাদ্য শস্যের মূল্য ৮ শতাংশ বেড়েছে। একই সাথে রপ্তানি মূল্য সূচক কমেছে ২ শতাংশ। বিশ্ব এখন মূলত বড় ধরনের অর্থনৈতিক খাদ্য সংকটের পরিস্থিতির মুখে দাড়িয়ে আছে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে খাদ্য সংকট থেকে দরিদ্র দেশগুলোতে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। উন্নয়নশী বিশ্বের দেশ এবং এমনকি উন্নত বিশ্বের দেশগুলোও এই মন্দার পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমসিম খাচ্ছে। যুদ্ধের কারণে পণ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।

‘ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির বিকল্প নেই’: রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। তিনি ‘বিশ্ব খাদ্য দিবস’ উপলক্ষ্যে শনিবার (১৫ অক্টোবর) দেয়া এক বাণীতে এ কথা বলেন। আবদুল হামিদ বলেন, বাংলাদেশে দারিদ্র্যহ্রাস ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় কৃষিই অন্যতম প্রধান নিয়ামক। কৃষি জনগণের খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহ, কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সৃষ্টিসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের কাঁচামাল সরবরাহের নিশ্চয়তা প্রদান করে। বঙ্গবন্ধু কৃষির উন্নয়নে কৃষকদের মাঝে খাস জমি বিতরণ, ভর্তুকি মূল্যে সার, কীটনাশক, উন্নত বীজ, সেচ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করেন। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারের যুগোপযোগী নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে দেশ দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে।

২০৪১ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গিকার: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকারের গৃহীত কৃষিবান্ধব নীতি ও কার্যক্রমে দানাদার খাদ্য, মাছ, মাংস ও ডিম উৎপাদনে বাংলাদেশ আজ স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং দুগ্ধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে। ‘বিশ্ব খাদ্য দিবস-২০২২’ উপলক্ষে শনিবার এক বাণীতে তিনি একথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন সরকারের পাশাপাশি সকলের অংশগ্রহণে নিরাপদ খাদ্যের মাধ্যমে পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করে ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা জাতির পিতার স্বপ্নের সুখী,সমৃদ্ধ ও উন্নত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো। দীর্ঘস্থায়ী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং চলমান কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে বাংলাদেশ যাতে কখনোই দুর্ভিক্ষ ও খাদ্যের অপ্রতুলতার মতো কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি না হয় সেজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমাদের মাটি ও মানুষ আছে। তাই এখন থেকেই আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে, বাংলাদেশ যাতে কখনো দুর্ভিক্ষ বা খাদ্য সংকটে না পড়ে। আমরা আমাদের খাদ্য উৎপাদন বাড়াব। শেখ হাসিনা করোনা পরিস্থিতির মধ্যে আবার রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধ এবং একে কেন্দ্র করে স্যাংশনের প্রসঙ্গ টেনে দেশে প্রতি ইঞ্চি জমিকে চাষাবাদের আওতায় এনে উৎপাদন বাড়ানোয় তাঁর আহবান পূণর্ব্যক্ত করেন।

এদিকে, ২০২২ সালের বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে (জিএইচআই) ১২১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৮৪তম অবস্থানে আছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ইন্ডিয়ার অবস্থান ১০৭তম এবং পাকিস্তানের অবস্থান ৯৯তম। আফগানিস্তানের অবস্থান ১০৯ তম। সম্প্রতি যৌথভাবে বিশ্ব ক্ষুধা সূচক-২০২২ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে আয়ারল্যান্ডভিত্তিক সংস্থা কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড এবং জার্মানভিত্তিক ওয়েল্ট হাঙ্গার হিলফ। ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য। ২০২১ সালে ১১৭টি দেশের মধ্যে এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭৬। অর্থাৎ ক্ষুধা মেটানোর সক্ষমতায় এবার বাংলাদেশের অবস্থানের আট ধাপ অবনতি হয়েছে। ২০২০ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭৫তম। ওই বছর ১০৭টি দেশের মধ্যে এই জরিপ করা হয়েছিল।

ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ২০১৯ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি

বিশ্বজুড়ে দিনে ক্ষুধায় মৃত্যু ১৯ হাজারেরও বেশি মানুষ : সম্প্রতি বিশ্বের দুই শতাধিক এনজিওর গবেষণা প্রতিবেদন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, বিশ্বে কেবল ক্ষুধার কারণেই প্রতি চার সেকেন্ডে একজন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। বিবৃতিতে এনজিওগুলো বলেছে, ৭৫টি দেশের বিভিন্ন সংগঠন আকাশচুম্বী ক্ষুধার মাত্রা এবং তা মোকাবেলায় পদক্ষেপ গ্রহণ করার সুপারিশ নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতায় ক্ষোভ প্রকাশ করে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে। এতে সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়েছে, আশ্চর্যজনক বিষয় হলো- বিশ্বের ৩৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ এখন তীব্র ক্ষুধার্ত। আর ক্ষুধার্ত মানুষের এই সংখ্যা ২০১৯ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, একুশ শতকে বিশ্বে আর দুর্ভিক্ষ ঘটবে না বলে বিশ্ব নেতারা প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও সোমালিয়ায় আরও একবার দুর্ভিক্ষ আসন্ন। বিশ্বের ৪৫টি দেশের প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ অনাহারের দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন। বিশ্বের দুই শতাধিক এনজিও’র বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিন প্রায় ১৯ হাজার ৭০০ জন মানুষ ক্ষুধায় মারা যাচ্ছেন।

অক্সফাম ইন্টারন্যাশনাল

আফ্রিকায় ৩৬ সেকেন্ডে একজনের মৃত্যুর শঙ্কা: ক্ষুধার কারণে পূর্ব আফ্রিকায় প্রতি ৩৬ সেকেন্ডে একটি জীবন যেতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অক্সফাম ইন্টারন্যাশনাল। সম্প্রতি সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে যে, খরা-বিধ্বস্ত পূর্ব আফ্রিকায় বছর শেষের প্রতি ৩৬ সেকেন্ডে একজনের ক্ষুধায় মারা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এক বিবৃতিতে অক্সফাম ইন্টারন্যাশনাল বলেছে যে, সোমালিয়া, ইথিওপিয়া এবং কেনিয়ার পরিস্থিতি ‘দ্রুত অবনতি হচ্ছে’। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, সোমালিয়ায় সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো ক্ষুধা সংকট। যেখানে তীব্র ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ইতোমধ্যেই ২০১১ সালের দুর্ভিক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। ওই দুর্ভিক্ষে দশ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সোমালিয়ায় প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজন এখন চরম ক্ষুধার্ত।

উত্তরদক্ষিণ, ১৬ অক্টোবর ২০২২, প্রথম পৃষ্ঠা

সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই: বৈশ্বিক এই খাদ্য সংকট মোকাবিলায় যুদ্ধ বন্ধ করার বিকল্প নেই। অধিকাংশ মানুষের হাতে তা কেনার মতো অর্থও থাকছে না। এটা একটি মানবিক বিপর্যয়। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরেই বিশ্ব একটি ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। যেখানে উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশগুলোর দারিদ্রতা একটি বড় সমস্যা। করোনার ধাক্কায় বিশ্ব অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। দফায় দফায় লকডাউন থাকায় বন্ধ থেকেছে উৎপাদন কার্যক্রম। একটি ধাক্কা সামাল দিতে না দিতেই আর একটি ধাক্কা মানুষের নাভিশাস ফেলতে বাধ্য করছে। বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং প্রতিদিনের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় জনগণের জীবনমান নিম্নমুখী হচ্ছে। আগামী কয়েকমাসে পৃথিবী একটি বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হওয়ার মতো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং এর সাথে বহুদিন ধরে চলে আসা সমস্যাগুলো যেমন- বিভিন্ন দেশে দ্বন্দ্ব সংঘাত,জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সমস্যা এবং শরণার্থী সংকট সমস্যা আরও বাড়াচ্ছে। সবকিছুর সমন্বিত পদক্ষেপই এই সংকট উত্তরণের পথ দেখাবে বলে জানচ্ছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞগণ।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading