ইলেক্ট্রনিকস বর্জ্য: স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি

ইলেক্ট্রনিকস বর্জ্য: স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি

শাফিউল কায়েস । বৃহস্পতিবার, ২০ অক্টোবর ২০২২। আপডেট ১০:৩০

প্রতিদিনই বাড়ছে প্রযুক্তি পণ্যের ব্যবহার, সেই সঙ্গে বাড়ছে ই-বর্জ্যের পরিমাণ। গত এক দশকে প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহার বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ গুণ। ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া এসব নষ্ট ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ক্ষতির কারণ হচ্ছে। নষ্ট ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম কিছু ফেরিওয়ালা বা মেকানিকের দোকানে বিক্রি করা হলেও ব্যাটারি, মোবাইল, লাইটসহ অধিকাংশ ফেলে দেওয়া হয়। অনেকে আবার এসব নষ্ট ই-বর্জ্য গৃহস্থালি ময়লা-আবর্জনার সঙ্গে পুড়িয়ে ফেলে। দেশে বছরের পর বছর লাখ লাখ মুঠোফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, রাইস কুকার, ওভেন, ওয়াশিং মেশিন, এয়ার কন্ডিশনার, ফটোকপি মেশিনসহ নানা ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম অকেজো হয়ে যায়।

বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অরগানাইজেশনের (ইএসডিও) গবেষণা বলছে, প্রতি বছর দেশে প্রায় ৪ লাখ টন ই-বর্জ্য জমা হয়। ২০২৩ সালে বছরে ই-বর্জ্যের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১২ লাখ টন। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ২০৩৫ সালে ই-বর্জ্য বছরে ৪৬ লাখ টনে দাঁড়াবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশে তিনভাবে ই-বর্জ্য সৃষ্টি হয়। প্রথমত দেশের মানুষের ব্যবহার ও মেয়াদ শেষে ফেলে দেওয়া। দ্বিতীয়ত বিপুল পরিমাণ প্রবাসী বা প্রবাসী শ্রমিকদের মাধ্যমে দেশে আনিত ইলেকট্রিক সরঞ্জাম এবং তৃতীয়ত উন্নত দেশগুলো থেকে অবৈধভাবে আনীত ব্যবহৃত ও পুরোনো ইলেকট্রিক সরঞ্জাম। এসব ই-বর্জ্য সরাসরি মাটি ও পানির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। যার ফলে, মাটিদূষণ, পানিদূষণ এবং স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু ও গর্ভধারী নারীরা।

গবেষকরা ই-বর্জ্যকে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ই-বর্জ্যের ভারী ধাতু সিসা, সিলিকন, টিন, ক্যাডমিয়াম, পারদ, দস্তা এবং ক্রোমিয়াম থাকে। এসব ভারী ধাতু নবজাতকের স্নায়ুতন্ত্রে মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। এছাড়াও ফুসফুস, শ্বাসতন্ত্র, থাইরয়েড জটিলতা, ক্যানসার এবং হৃদরোগের মতো বড় রোগের জটিলতায় ভুগছে হাজার হাজার মানুষ। পাশাপাশি নষ্ট ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম মেরামতকারীরা ভুগছেন নানা জটিল শারীরিক রোগে।

দেশে ই-বর্জ্যের ঝুঁকি নিয়ে এক যুগ আগে থেকে আলোচনা শুরু হয়। ২০২১ সালের ১০ জুন বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫-এর অধীনে ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা শিরোনামের বিধিমালাটির গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। বিধিমালাতে বলা হয়েছে, এখন থেকে বৈদ্যুতিক পণ্য থেকে তৈরি হওয়া বর্জ্য উৎপাদনকারী বা সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানকেই ফেরত নিতে হবে। নষ্ট হওয়া মুঠোফোন, ল্যাপটপসহ যে কোনো পণ্য প্রতিষ্ঠানকেই ফেরত দিলে ভোক্তারা বিনিময়ে টাকা পাবেন।

ই-বর্জ্য কমাতে জনগণকে সচেতন করতে হবে। দেশের অধিকাংশ জনগণ জানেই না ই-বর্জ্য কী? কীভাবে আমাদের পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে। এক্ষেত্রে ই-বর্জ্যের ক্ষতির দিকগুলো গণহারে প্রচারণা চালাতে হবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে দেশের গণমাধ্যম। দেশের সরকারের সার্বিক সহযোগিতা জরুরি। ই-বর্জ্য সম্পর্কে উপযুক্ত নীতিমালার অভাব, প্রশাসনের উদাসীনতা, সর্বোপরি ই-বর্জ্যের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে ই-বর্জ্যের ঝুঁকি প্রতিনিয়তই বেড়েই চলেছে।

দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান ই-বর্জ্য থেকে বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহ কর পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তুলে দেশের বাজারে ও রপ্তানিতেও ভূমিকা রাখছে। প্রতিনিয়ত ই-বর্জ্য বাড়ার ফলে ই-বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ একটি লাভজনক ব্যবসায় হতে পারে। প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ডিভাইসে মানুষের নির্ভরশীলতা বাড়ছে।

বিশেষভাবে, ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো রিসাইক্লিংয়ে উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে এবং প্রয়োজনে ঋণসহায়তা প্রদান করা যেতে পারে। এসব ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থাপনা করলে একদিকে যেমন পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে; ঠিক তেমনি দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখনই ই-বর্জ্যের ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে পরিবেশ, মানুষের স্বাস্থ্য এবং আগামী দিনে পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।

ইউডি/সিফাত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading