সাইক্লোন সিত্রাং: দেশজুড়ে বৃষ্টি-ঝড়ো বাতাস
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ২৪ অক্টোবর ২০২২। আপডেট ২২:১০
উপকূলে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং। সন্ধ্যার পর পটুয়াখালীর খেপুপাড়া, ভোলা, বরগুনা ও বরিশাল উপকূলে সিত্রাংয়ের অগ্রভাগ আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ছানাউল হক মণ্ডল।
তিনি জানান, ঘুর্ণিঝড় সিত্রাং মধ্যরাতে পূর্ণ শক্তি নিয়ে স্থলভাগের ওপর দিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হবে। এর শেষ ভাগ মঙ্গলবার ভোরের মধ্যে বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করবে। বাংলাদেশের পুরো স্থলভাগ অতিক্রম করতে এর ৫-৬ ঘণ্টা লাগবে। ঘুর্ণিঝড়ের প্রভাবে মঙ্গলবার (২৫ অক্টোবর) দুপুর পর্যন্ত সারা দেশে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে।
ছানাউল হক মণ্ডল বলেন, ‘আজ সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে ঘূর্ণিঝড়ের অগ্রভাগের আঘাত শুরু হয়েছে। এর মূল কেন্দ্র মধ্যরাত থেকে আঘাত করা শুরু করে ভোরের মধ্যে অতিক্রম করা শেষ করবে।’
তিনি বলেন, ‘কোনো ঘূর্ণিঝড়ই ছোট নয়। ঘূর্ণিঝড়ের নির্দিষ্ট কোনো পয়েন্ট নেই। এজন্য বিকেল থেকে ঝড়-বৃষ্টি হলেও আমরা অগ্রভাগের কথাটা উল্লেখ করিনি। তবে সন্ধ্যার পর থেকে যেহেতু বেশিরভাগ উপকূল এলাকায় ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে, সেহেতু এখন বলাই যায় এর অগ্রভাগের আঘাত শুরু হয়েছে। ভোরে উপকূল অতিক্রম করার সময় বাতাসের গতিবেগ থাকবে ঘণ্টায় ৯০ থেকে ৯৫ কিলোমিটার। আগামীকাল দুপুরের দিকে বৃষ্টিপাত কমে যাবে।’ কিছু কিছু জায়গায় থাকলেও বুধবার থেকে বৃষ্টিপাত আর থাকবে না বলে জানান তিনি।
ঢাকা
সোমবার (২৪ অক্টোবর) সকালে ঘুম ভেঙেই রাজধানীবাসী পড়েছেন বৃষ্টির কবলে। হালকা থেকে মাঝারি, মাঝেমধ্যে হওয়া ভারী বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে ঢাকাসহ সারা দেশে মুষলধারে এ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এতে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। যানবাহনে মানুষের ভীড়ও কম দেখা গিয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া সাধারণ মানুষ বৃষ্টিতে বিপাকে পড়ে। এ ছাড়া বৃষ্টিতে দুর্ভোগে পড়েছে খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষেরাও।
চট্টগ্রাম
উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ৬ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং মোকাবিলায় ১৫ উপজেলায় ২৯০টি মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত রেখেছে সিভিল সার্জন কার্যালয়। ঘূর্ণিঝড় পূর্ববর্তী, ঘূর্ণিঝড়কালীন এবং পরবর্তীতে যেকোনো ধরনের সেবা গ্রহণের উদ্দেশ্যে বিশেষ কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে।
খুলনা
ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে উপকূলীয় জনপদ খুলনায় বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। সোমবার দিনভর প্রবল বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ফলে উপকূলীয় মানুষের মনে আতঙ্ক বাড়ছে। অবিরাম বৃষ্টি হওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শহরের অধিকাংশ সড়কে হাঁটু পানি জমেছে। জেলার ২ লাখ ৭৩ হাজার ৮৫০ জনের জন্য ৪০৯টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বাগেরহাট
ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় মোংলা বন্দরে অবস্থানরত দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্য বোঝাই-খালাস ও পরিবহণ বন্ধ রয়েছে। সোমবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে মোংলা বন্দরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সতর্কতা ‘অ্যালার্ট-৩’ জারির পর পণ্য বোঝাই খালাস বন্ধ করা হয়।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের উপসচিব (বোর্ড ও জনসংযোগ বিভাগ) মো. মাকরুজ্জামান বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৭ নম্বর বিপৎসংকেত জারির পর বন্দরে অ্যালার্ট-৩ জারি করা হয়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় সকাল থেকে পণ্য ওঠা নামার সকল কাজ বন্ধ রয়েছে। বন্দর জটিতে থাকা সকল জাহাজ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বহির্নোঙরে।
বরিশাল
বৈরি আবহাওয়ার কারণে বরিশাল নদী বন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ ও দুরপাল্লার সকল রুটে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে বরিশালে বর্তমানে বাতাসের গতিবেগ ২০ নটিক্যাল মাইল থাকলেও বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের গতিবেগ ৭০ নটিক্যাল মাইল। বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের গতিবেগও বাড়তে থাকবে।
উপকূলীয় মানুষকে নিরাপদে নেওয়ার জন্য বিভাগের ৩ হাজার ৯৭৪টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি, শুকনা খাবার এবং ওষুধের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা
হয়েছে।
ভোলা
ভোলায় সকাল থেকে ১ মিলিমিটারের কিছুটা কম বৃষ্টি হয়েছে। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বিরাজ করছে। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং মোকাবিলায় জেলায় ৬৯১টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। সেগুলোর ধারণ ক্ষমতা ৫ লাখ ২৩ জন।
পটুয়াখালী
ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং, পটুয়াখালী জেলায় সকল ধরনের নৌ চলাচল ও বিদুৎ বন্ধ রয়েছে। এতে জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব পরেছে। কুয়াকাটার বঙ্গোপসাগর উত্তাল রয়েছে। উপকূলীয় এলাকার জনসাধারণকে নিরাপদ আশ্রয়ে বা সাইক্লোন শেল্টার যাওয়ার জন্য প্রচার করছে কোস্ট গার্ড, রেড ক্রিসেন্ট, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিপিপি।
ফেনী
ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং ধেয়ে আসছে উপকূলের দিকে। সোনাগাজীর উপকূলীয় এলাকায় থেমে থেমে ঝড়ো হাওয়া বইছে। বৃষ্টি ও ঝড়ো হওয়ার ফলে ইতোমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাঠের ধান। উপজেলার জেলে পাড়া, আদর্শ গ্রাম, মুহুরী প্রজেক্ট, ধান গবেষণা ও সোনাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় মাঠের ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে ফেনী জেলা প্রশাসন। ফেনীর সোনাগাজীর উপকূলে দুর্যোগ মোকাবিলায় বিদ্যুৎ, ফায়ার, সিপিপি, স্বাস্থ্য বিভাগ, বন বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনেরসহ সকল বিভাগ শুধু প্রস্তুত নয় বরং স্ব স্ব অবস্থান থেকে দায়িত্বপালন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আব সেলিম মাহমুদ- উল হাসান বলেন, দুর্যোগ চলাকালীন আশ্রয় কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় খাবারের সুসম বণ্টন, জরুরি স্বাস্থ্য সেবা ও আলোর ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া রংপুর, রাজশাহী, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন এলাকায়ও হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাতের খবর পাওয়া গেছে।
ইউডি/সিফাত

