লোডশেডিং নিয়ে লুকোচুরি নয়: কমছে উৎপাদন, অতিষ্ঠ জনজীবন

লোডশেডিং নিয়ে লুকোচুরি নয়: কমছে উৎপাদন, অতিষ্ঠ জনজীবন

সারমিন সুলতানা । বুধবার, ২৬ অক্টোবর ২০২২। আপডেট ১৫:৪৫

আধুনিক সভ্যতার অন্যতম উপাদান বিদ্যুৎ। উন্নয়নের মূল চাবিকাঠিও। তাই বলা হয়, বিদ্যুতের শক্তি অপরিসীম। আমাদের সবার জীবনে বিদ্যুতের দরকার। জীবনে খাবারের যেমন দরকার, তেমনি উন্নয়নেও বিদ্যুৎ দরকার রয়েছে। বিদ্যুতের অপর নাম শক্তি। এক মাসের মধ্যে বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিডে দ্বিতীয়বারের মতো বিপর্যয় ঘটেছিল গত সপ্তাহে। এ সময় ঢাকাসহ ৩২ জেলায় কোথাও ৪ ঘণ্টা, কোথাও আবার একটানা ৮ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ ছিল না। টানা দীর্ঘসময় ধরে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় চরম ভোগান্তিতে পড়ে কোটি কোটি মানুষ।

গ্যাস হলো আমাদের জ্বালানির প্রধান উৎস। আর গ্যাসসংকট বাড়ছে। জ্বালানি গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে, কমছে উৎপাদন। দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে মজুতকৃত গ্যাসের পরিমাণ। বর্তমানে দৈনিক চাহিদা ৩৭০ কোটি ঘনফুটের বেশি থাকলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে প্রায় ৩০০ কোটি মিলিয়ন ঘনফুট। পেট্রোবাংলার গত জুলাই মাসের এমআইএস রিপোর্টে বলা হয়ছে, ২০২০ সালে গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল ২১৭ কোটি ১০ লাখ ঘনফুটের বেশি; যা ২০২১ সালের জুনে ২০৮ কোটি ১০ লাখ ঘনফুটে কমে আসে। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাসের সরবরাহ করা যাচ্ছে না। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে গ্যাসের চাহিদা, অন্যদিকে কমছে উৎপাদন। ফলে অচিরেই গ্যাসসংকট তীব্র আকার ধারণ করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, আগামী ২০২৫ সালেই উত্তোলনকৃত মজুত ফুরিয়ে যেতে পারে। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে গ্যাস মোট জ্বালানি খাতে ৬৫ শতাংশ ভূমিকা রাখছে। গত ১ জুন ২১ তারিখ পর্যন্ত উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত ছিল ১১ দশমিক ৪৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট, আর বছরে উত্তোলন হচ্ছে ১ টিসিএফ। যদি তাই হয় তাহলে তো আগামী ১১ বছরেই উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত শেষ হয়ে যাবে। কমিশন আরো বলেছে, গত এক দশকে এক টিসিএফ গ্যাসও রিজার্ভে যুক্ত হয়নি। এমতাবস্থায় চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২০২৫ সালে গ্যাসের রিজার্ভ ৬ টিসিএফ এবং ২০৩০ সালে ৫ টিসিএফএ নেমে আসবে, যা ব্যাপকভাবে এলএনজি আমদানিনির্ভর করে তুলবে এবং জ্বালানিনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। পেট্রোবাংলা সূত্রে আরো জানা যায়, বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, যার বিপরীতে দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলোসহ মোট ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট, সেই সঙ্গে সাড়ে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট আমদানিকৃত এলএনজিসহ দৈনিক মোট ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছে। আগামী ২০২৫ সালে গ্যাসের সরবরাহ হবে ১ হাজার ৩০০ বিসিএফ এবং ২০৩০ সরবরাহ হবে ৬৫০ বিলিয়ন ঘনফুট। এ সময় গ্যাসের চাহিদা হবে প্রায় ২ হাজার বিলিয়ন ঘনফুট, যা চাহিদার তুলনায় সরবরাহ হবে ১ হাজার ৩০০ বিলিয়ন ঘনফুট। আর তখন চাহিদা থাকবে ২ হাজার বিলিয়ন ঘনফুট। ঘাটতি থাকবে ৭০০ বিলিয়ন ঘনফুট। ২০৩০ সালে চাহিদা হবে ২ হাজার ২২৭ বিলিয়ন ঘনফুট আর সরবরাহ হবে ১ হাজার ৩০৮ বিলিয়ন ঘনফুট। ঘাটতি থাকবে ৯০০ বিলিয়ন ঘনফুট। ঐ সময়ে এলএনজি আমদানি করেও চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়বে।

গ্যাস-সংকট মোকাবিলায় নতুন করে উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। বাপেক্সের একজন সাবেক কর্মকর্তা জানান, আটটি গ্যাস ফিল্ডের পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্রেও এই স্তর থেকে গ্যাসের সন্ধান মেলেছে। এই স্তরের আরো নিচে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এর জন্য প্রয়োজন ডিপ ড্রিলিং বা মাটির আরো গভীবে খনন কাজ চালানো। তিনি আরো বলেন, বাপেক্সের রিগগুলোর গড়ে ৫ হাজার মিটারে খনন করার ক্ষমতা রয়েছে। ৭ হাজার মিটারের বেশি গভীরতায় খনন করতে হলে নতুন রিগ দরকার। কিন্তু তাদের রিগ-সংকট রয়েছে বলেও তিনি জানান। এ বিষয়টির প্রতি সরকারের নজর দিতে হবে। অন্যদিকে ভারত ও মিয়ানমার সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশকেও সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে মনোনিবেশ করতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading