চট্টগ্রাম নগরীতে আবাসিক বর্জ্য নিয়ে চলছে বাণিজ্য

চট্টগ্রাম নগরীতে আবাসিক বর্জ্য নিয়ে চলছে বাণিজ্য

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ২৮ অক্টোবর ২০২২। আপডেট ১৭:৩০

চট্টগ্রাম নগরীতে বাসাবাড়ির বর্জ্য নিয়ে বাণিজ্য চলছে। এলাকাভিত্তিক প্রভাবশালীর নিয়োজিত লোকেরা বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য নিয়ে সিটি করপোরেশনের ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছে। এই কাজের জন্য বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে মাসিক টাকা আদায় করা হচ্ছে। নগরীর অধিকাংশ বাড়ির মালিক বর্জ্য ফেলার জন্য ডাস্টবিন রাখেননি। বর্জ্য অপসারণের জন্য প্রতি বাসা থেকে মাসে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। বাসার আশপাশে সিটি করপোরেশনের কোনো ডাস্টবিন না থাকায় বসবাসকারীরা বিপাকে পড়েছেন।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, তারা নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে দৈনিক প্রায় আড়াই হাজার টন বর্জ্য অপসারণ করে থাকে। কিন্তু তার পরও নগরীর বিভিন্ন স্থানে নালা-নর্দমায় ও খালে বাসাবাড়ির আবর্জনার স্তূপ পড়ে থাকে। অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত ডাস্টবিনও নেই। দৈনিক সব বর্জ্য অপসারণ করতে না পারায় ডাস্টবিনগুলোতে আবর্জনা পড়ে থাকে। এতে মশা-মাছির উপদ্রব ও দুর্গদ্ধ ছড়ায়। পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকায় মানুষ যত্রতত্র আবর্জনা ফেলে রাখছে। এর সুযোগ নিচ্ছেন এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি। তারা এলাকায় লোক নিয়োজিত করে বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে নিচ্ছেন। বিনিময়ে প্রতি মাসে নির্ধারিত টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে।

নগরীর খাজা রোডের করমপাড়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন স্কুলশিক্ষক লিটন দাশ। তিনি বলেন, ‘বাড়ির মালিক বর্জ্য ফেলার জন্য কোনো ব্যবস্থা রাখেননি। আশপাশেও কোনো ডাস্টবিন নেই। প্রতিদিন সকালে বর্জ্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আগে মাসে ১৫০ টাকা করে পরিশোধ করতাম। এখন গত দুই মাস ধরে ২০০ টাকা করে দিতে হচ্ছে।’

নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এভাবে বর্জ্য নিয়ে বাণিজ্য চলছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এলাকায় আগে ডাস্টবিন থাকলেও বাণিজ্য করার জন্য ডাস্টবিন ভেঙে ফেলা হয়েছে, যাতে মানুষ বর্জ্য না ফেলে তাদের দিতে বাধ্য থাকে। আবার এলাকায় ডাস্টবিন থাকলেও করপোরেশনের গাড়ি আসতে বাধা দিচ্ছে। আবার অনেকেই অভিযোগ করছেন, করপোরেশনের গাড়ির লোকদের সঙ্গে এলাকার এসব লোকের যোগসাজশ রয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ড ও পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ডকে বর্জ্য অপসারণের জন্য মেসার্স পাওয়ার সোর্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিয়েছে। মেসার্স পাওয়ার সোর্সের ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০০ জন সেবক, ২০ জন সুপারভাইজার, ১২টি থ্রি-হুইলার গাড়ি ও ৩০টি ভ্যানের মাধ্যমে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও অলিগলি থেকে গার্ভেজ ব্যাগের মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহ করবে। পর্যায়ক্রমে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হবে। সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন তার আমলে ডোর টু ডোর বর্জ্য সংগ্রহের জন্য ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। কিন্তু তাতে কোনো সুফল মেলেনি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাসাবাড়ির সামনে তিনটি বিম বসানো থাকবে। সেখানে বর্জ্য ফেলা হবে। বিম থেকে তারা বর্জ্য সংগ্রহ করে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে ফেলবে। বর্জ্য অপসারণে নিয়োজিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত করে দেওয়া হারে বাড়ির মালিক থেকে সার্ভিস চার্জ আদায় করবে। নির্ধারিত সার্ভিস চার্জের মধ্যে রয়েছে সেমিপাকা বাসা হলে প্রতি বাসা থেকে মাসে ৫০ টাকা, বহুতল ভবন হলে ১০০ টাকা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, মিল-কারখানা হলে মাসে ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা, হোটেল-রেস্টুরেন্ট হলে মাসে ১ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকা, হাটবাজার ও বিপণিবিতানে ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা, কমিউনিটি সেন্টার হলে এক জন অতিথির কাছ থেকে ২ টাকা হারে বর্জ্য অপসারণ বাবদ টাকা আদায় করা হবে। নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান বাসাবাড়ি থেকে এই টাকা আদায় করবে। তাদের রসিদ প্রদান করবে। প্রাথমিকভাবে বাড়ির মালিকেরা টাকা পরিশোধ করবেন। বাড়ির মালিক ভাটাটিয়াদের কাছ থেকে মাসিক ভাড়ার সঙ্গে বর্জ্য খরচ আদায় করবেন।

পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ডে গত দুই মাস ধরে কার্যক্রম চলছে। আর উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ডে চলতি মাস থেকে শুরু হয়েছে। পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. মোবারক আলী বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে বেসরকারি খাতে বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ডোর টু ডোর কার্যক্রম চালু করে সুফল পাওয়া যায়নি। পর্যায়ক্রমে ৪১টি ওয়ার্ডে এই প্রক্রিয়ায় বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম চালু করা হবে। প্রাথমিকভাবে একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা বাসাবাড়ি থেকে যে টাকা আদায় করবে, তা থেকে তাদের খরচ মেটাবে। পরে টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা আবুল হাশেম বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় শতভাগ বর্জ্য অপসারণ সম্ভব হচ্ছে না। তাই এ কাজ বেসরকারি খাতের মাধ্যমে করার জন্য করপোরেশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মন্ত্রণালয়ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করার অনুমোদন দিয়েছে। এর ফলে বর্জ্য ব্যস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

ইউডি/আতা

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading