রংপুরে সমাবেশ: রেকর্ড জনসমাগমের আশা বিএনপির, আ.লীগ বলছে সুযোগ নেই

রংপুরে সমাবেশ: রেকর্ড জনসমাগমের আশা বিএনপির, আ.লীগ বলছে সুযোগ নেই
বিএনপির সমাবেশকে ঘিরে চলছে প্রস্তুতি

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ২৮ অক্টোবর ২০২২। আপডেট ১৮:০৯

রংপুরে বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশে দলটি স্মরণকালের সব রেকর্ড ভেঙে জনসমাগমের আশা করলেও আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, ‘সে সুযোগই নেই। তারা গণসমাবেশ নিয়ে তেমন বিচলিতও নন।’

বিএনপির ২৯ অক্টোবরের বিভাগীয় গণসমাবেশ রংপুর জিলা স্কুলের মাঠে করার পরিকল্পনা থাকলেও সেখানে অনুমতি পায়নি দলটি। তাই সমাবেশ হতে যাচ্ছে কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, সমাবেশে স্মরণকালের সব রেকর্ড ভেঙে লোকসমাগম হবে—এমন কথায় তারা বিচলিত নন। কারণ, যত গর্জে তত বর্ষে না। তা ছাড়া কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে অত মানুষের ধারণক্ষমতা নেই। তাই লাখ লাখ লোকসমাগমের সুযোগ নেই।

সমাবেশের বিষয়ে রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে বিএনপি সমাবেশ, মিছিল, মিটিং সবই করতে পারে। বিএনপি-জামায়াতের মতো আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী দলের সমাবেশ বন্ধ করতে মরিয়া নয়।

‘তারা আওয়ামী লীগের সমাবেশে বোমা মেরেও মানুষ হত্যা করেছে। আওয়ামী লীগ কখনোই সে পথে হাঁটতে চায় না। কিন্তু তারা যদি সমাবেশ ও মিছিল-মিটিংয়ের নামে সন্ত্রাস কায়েম করে, তাহলে রংপুরের আওয়ামী লীগ ছেড়ে কথা বলবে না।’

রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিএনপি রাজনৈতিক দল। তারা তাদের বিভাগীয় গণসমাবেশ ডেকেছে, প্রশাসনও অনুমতি দিয়েছে। সেখানে তারা সমাবেশ করবে।

‘বিএনপির সমাবেশ নিয়ে আমাদের মাথা ঘামানোর কিছু নেই। আমরা ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা লীগকে বলেছি—এ বিষয়ে কেউ যেন অতি উৎসাহী না হয়’, বলেন তিনি।

জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি; ভোলা, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও যশোরে পাঁচ নেতাকর্মী নিহত এবং সারা দেশে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে প্রতিটি বিভাগে সমাবেশ করছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে খুলনাতে ২৯ অক্টোবর গণসমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে।

এতে প্রধান অতিথি থাকবেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ছাড়া দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুসহ বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

এদিকে রংপুরে বিএনপির গণসমাবেশের দুদিন আগেই পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে জেলা মোটর মালিক সমিতি। অবৈধ যান চলাচল বন্ধের দাবিতে শুক্রবার ভোর ৬টা থেকে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলবে এ ধর্মঘট।

রংপুর বিভাগীয় গণসমাবেশের সমন্বয়কারী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বিভাগীয় গণসমাবেশ নিয়ে আমরা প্রস্তুত। সরকার ধর্মঘটসহ যে কোনোভাবে বাধা দিয়েও গণসমাবেশে গণজোয়ার ঠেকাতে পারবে না।’

পুলিশের অবস্থান নিয়ে রংপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ক্রাইম) আবু মারুফ হোসেন বলেন, ‘আমরা বিএনপির এই সমাবেশ নিয়ে কোনো বাধা দিচ্ছি না। আমাদের গোয়েন্দা তৎপরতা রয়েছে। তবে রাজনৈতিক এই সমাবেশকে ঘিরে অন্য কোনো পরিকল্পনা থাকলে আমরা কঠোর হস্তে তা দমন করব।’

বক্তব্য রাখছেন রংপুর বিভাগীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবীব দুলু।

ধর্মঘট দেবে আগেই জানতাম : দুলু

খুলনার মতো রংপুরেও যে বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশের সময় পরিবহন ধর্মঘট দেওয়া হবে তা আগেই জানতেন বলে মন্তব্য করেছেন রংপুর বিভাগীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবীব দুলু।

তিনি বলেন, ‘পরিবহন ধর্মঘট দেওয়া হবে তা আমরা আগে থেকেই জানতাম। আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। প্রয়োজনে এই বিভাগের আট জেলার মানুষ হেঁটেই সমাবেশে যোগ দেবে।’

আগেভাগেই রংপুরে আসা শুরু করেছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা

রংপুরে বিএনপির গণসমাবেশের দু’দিন আগেই পরিবহন ধর্মঘট আহ্বান করেছে জেলা মোটর মালিক সমিতি। অবৈধ যানচলাচল বন্ধের দাবিতে শুক্রবার ভোর ৬টা থেকে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলবে এ ধর্মঘট। তবে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনার অভিজ্ঞতায় আগে থেকেই এমন শঙ্কা ছিল বিএনপি নেতাকর্মীদের। এ কারণে তারা আগেভাগেই রংপুর আসতে শুরু করেছেন।

বিভাগের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও এবং পঞ্চগড়ের কিছু কিছু নেতাকর্মী ইতোমধ্যে রংপুরে এসে পৌঁছেছেন। শনিবার রংপুর কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে বিএনপির গণসমাবেশের দিন ধার্য রয়েছে। সে কারণে তারা পরিবহন ধর্মঘটে দুর্ভোগের কবল থেকে রক্ষায় রংপুরেই অবস্থান করবেন।

কথা হয় আলীম উদ্দিন, নয়া মিয়া ও লোকমান হোসেন নামের বিএনপির তিন কর্মীর সঙ্গে। তারা লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার জগতবের থেকে সমাবেশস্থলে এসেছেন। সঙ্গে শুকনো খাবারসহ শীতের হাত থেকে রক্ষায় কম্বল নিয়ে এসেছেন তারা।

নয়া মিয়া বলেন, ‘সরকার বাধা দেবে, সে ভয় হামার আগে থাকি আছিল। সেই কারণে আইজক্যা (আজ) পাটগ্রাম থাকি ট্রেনোত রংপুর আচ্চি। স্টেশন থাকি হাঁটতে হাঁটতে এ্যাটেকোনা আসনো। কষ্ট হইলেও সমাবেশ দেখি বাড়িত যামো।’ পাটগ্রাম থেকে আরও অনেকে দিনের বেলাতেই রংপুরে এসেছেন এবং তারা আত্মীয়ের বাড়িতে উঠেছেন।

রংপুর জেলা যুবদলের সভাপতি নাজমুল আলম নাজু বলেন, সমাবেশ হবে শনিবার, অথচ দলের নেতাকর্মীরা দু’দিন আগেই রংপুরে আসতে শুরু করেছেন। সরকার যেভাবে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন ও সভা-সমাবেশ বাধাগ্রস্ত করছে- তারই প্রতিবাদ জানাতে প্রস্তুত তৃণমূল।

তিনি বলেন, বিভাগীয় এই গণসমাবেশ সফল করতে দলের অনেক কর্মী ও সমর্থক বাড়িতে কম খেয়ে এখানে ব্যয় করছেন। এই ভালোবাসা দেশের জন্য, বিএনপির জন্য। কারণ বিএনপি বর্তমানে যে দাবি নিয়ে আন্দোলন করছে, তা গণমানুষের দাবিতে রূপ নিয়েছে।

সমাবেশের আগে রংপুরে আ.লীগ-বিএনপি উত্তেজনা

রংপুরে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশকে ঘিরে বিলবোর্ড লাগানোকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

মহানগর আওয়ামী লীগ নেতাদের বিলবোর্ডের ওপর বিএনপি নেতাদের বিলবোর্ড সাটানোর অভিযোগ উঠার পর পর শুক্রবারের মধ্যে সেগুলো সরানোর আল্টিমেটাম দেয়া হয়েছে।

দুপুর ১২টায় বেতপট্টির দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ১২ ঘণ্টার এই সময় বেঁধে দেয়া হয়।

এতে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সফিয়ার রহমান সাফি বলেন, ‘সরকারের উন্নয়ন, আমাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে অনেকে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে বিলবোর্ড লাগিয়েছে। সেই বিলবোর্ডের ওপর বিএনপি বিলবোর্ড লাগিয়েছে। এটা রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত। আমরা আমাদের রাজনৈতিক জীবনে কারও পোস্টারের ওপর কারও পোস্টার লাগানো দেখি নাই।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপি নেতাদের লাগানো ওই বিলবোর্ড আজকের দিনের মধ্যে যদি সরিয়ে না নেয় তাহলে আমরাই সরিয়ে ফেলব। এ জন্য কোনো বিশৃঙ্খলা হলে তার দায় বিএনপির।’

তবে বিএনপির সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সভাপতি ও দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, ‘আমাদের সমাবেশ কাল, সেই সমাবেশে প্রোপাগান্ডা করার জন্য এসব করা হচ্ছে। কারও বিলবোর্ড সরানোর সময় আমাদের নেই।’

সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ নেতা সাফি বলেন, ‘বিএনপি শান্তিপূর্ণ সমাবেশের নামে পায়ে পা রেখে উসকানি ছড়িয়ে দিয়ে দেশের মধ্যে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়, মারামারি হানাহানি করতে চায়।

‘তারা লাশ ফেরার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। দীর্ঘদিন থেকে আমরা আশঙ্কা করছি যে, তারা দ্বন্দ্ব করতে চায়, রংপুরে শান্তিপর্ণ সমাবেশ করতে চায় না, তারই বহিঃপ্রকাশ এই বিলবোর্ড।’

রংপুর মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহফুজার রহমান বলেন, ‘বিলবোর্ড বিএনপি নিজে সরিয়েছে। এখন কোনো সমস্যা নেই।’

তবে তিনি এই বক্তব্য রাখার পরও আওয়ামী লীগ নেতাদের বিলবোর্ডের ওপর বিএনপির বিলবোর্ড সাঁটানো ছিল।

ইউডি/এআই

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading