ইলন মাস্কের হাতে টুইটারের ভবিষ্যৎ: উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

ইলন মাস্কের হাতে টুইটারের ভবিষ্যৎ: উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ০২ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ১২:২৫

বছরজুড়েই আলোচনার শীর্ষে ছিলো ইলন মাস্কের টুইটার ক্রয়ের প্রসঙ্গ। সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটে অক্টোবরের ২৭ তারিখ। বিশ্বের শীর্ষ ধনী কিনে নিয়েছেন টুইটার। কিন্তু কেন তিনি টুইটারের প্রতি আগ্রহী হলেন, আর তার মতো বিচক্ষণ ব্যক্তির এর পেছনে এতো সময় দেয়ার নেপথ্যে কী এই প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের। ইতোমধ্যেই মাস্ক মালিকানাধীন টুইটারে কর্মীছাটাইসহ ব্যাপক আকারের পরিবর্তন ঘটেছে, টুইটারের তবে ভবিষ্যৎ কী? বিস্তারিত লিখেছেন মিলন গাজী

২৮ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইলন মাস্কের টুইট- ‘পাখি মুক্ত’। নড়েচড়ে বসে টুইটার ব্যবহারকারীরা। মাস্ক সবসময়ই বাকস্বাধীনতার পক্ষে কথা বলে আসছিলেন, মালিকানা নিয়েই তার দেয়া টুইটে সেটা যে স্পষ্ট এক বার্তাই দিলো। বছরজুড়ে নানা টালবাহানা, আদালত থেকে ঘুরে আসা সহ শত জল্পনার অবসান ঘটে তার ওই টুইটে। আর মালিকানা পেয়েই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছেই নিয়েছেন এই বিজনেস ম্যাগনেট। ভেঙে দিয়েছেন পরিচালনা পর্ষদ। আমেরিকার সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জে দাখিল করা নথিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। নথিতে বলাা হয়েছে, গত ২৭ অক্টোবর টুইটারের মালিকানা কিনে নেন আমেরিকার গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার প্রধান নির্বাহী ও বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক। এতে তিনি টুইটারের একমাত্র পরিচালক হয়েছেন। এর আগে টুইটারের পরিচালক ছিলেন নয়জন। পরিচালনা পর্ষদ থেকে বিদায় নেওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন টুইটার বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ব্রেট টেলর ও সাবেক প্রধান নির্বাহী পরাগ আগারওয়াল। চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি টুইটার ক্রয়ের পরিকল্পনায় প্রথম পা ফেলেছিলেন মাস্ক। ওই মাস থেকে টুইটারের শেয়ার কেনা শুরু করেন। মার্চের মধ্যে মাস্কের হাতে আসে ‘মাইক্রোব্লগিং সাইট’টির ৫ শতাংশ শেয়ার। তার পর এপ্রিলে মাস্ক ঘোষণা করেন, ৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলার খরচ করে টুইটার কিনতে চান তিনি। আর অক্টোবরের শেষে এসে সেটা বাস্তবে রূপ দিলেন।

টুইটার কেনার নেপথ্যে কী: এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত টুইটার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বার বার আলোচনা হয়েছে মাস্কের। বরাবরই বাকস্বাধীনতার পক্ষে থাকা মাস্কের ইঙ্গিত ছিল, তিনি মালিক হলে টুইটার বদলে ফেলবেন। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে টুইটারের নিষেধাজ্ঞাকে মাস্ক খোলাখুলিই তকমা দিয়েছিলেন, চূড়ান্ত বোকামির সিদ্ধান্ত! গত মে মাসে টুইটার অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফের ভাবতে বসেছিলেন মাস্ক। ‘মাইক্রোব্লগিং সাইট’ কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি করেন, আগে টুইটারে স্প্যাম এবং ভুয়া অ্যাকাউন্টের তথ্য দিতে হবে। তা না হলে টুইটার কেনার পরিকল্পনা বাতিলের হুমকিও দেন তিনি। অক্টোবরের গোড়ার দিকে ডেলাওয়ারের আদালত মাস্ককে নির্দেশ দিয়েছিল, অক্টোবর মাসের ২৮ তারিখের মধ্যেই টুইটারের অধিগ্রহণের বিষয়ে চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে। দু’পক্ষই এ নিয়ে সিদ্ধান্ত না নিলে নভেম্বরে এই মামলার শুনানি শুরু হতো। তাতে নাকি মাস্কের হার অনেকটাই অনিবার্য ছিল। তবে কী আদালতের চাপে পড়েই টুইটার কিনলেন মাস্ক? এমন প্রশ্নও উঠছে।

টুইটার

বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রচার বাড়ার শঙ্কা: মাস্কের টুইটার কেনার আগ্রহের পর থেকেই ডিজিটাল মানবাধিকারকর্মীরা আশঙ্কা করে আসছিলেন, যথাযথ সেন্সরশিপের অভাবে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রচার বাড়বে টুইটারে। টুইটারে নিষিদ্ধ বা স্থগিত হওয়া অ্যাকাউন্টগুলোকে আবার ফিরিয়ে আনা হবে কি না, এমন প্রশ্নও তুলেছেন টুইটার ব্যবহারকারীদের মধ্যে অনেকে। মাস্ক নিজেকে বাকস্বাধীনতার বড় সমর্থক বলে প্রচার করার কারনেই এমন শঙ্কার কথা জানাচ্ছেন মানবাধিকার সংস্থাগুলো। তাদের মতে, মাস্কের একচ্ছত্র আধিপত্য বাকস্বাধীনতার নামে বিদ্বেষমূলক প্রচারণার পথ সুগম করবে। কেননা, একজন সাধারণ ব্যবহারকারী হিসেবে যখন মাস্ক টুইটার ব্যবহার করেছেন তখনই তার দ্বারা খোঁচা-বিদ্রুপের শিকার হয়েছেন সাবেক অ্যামাজন প্রধান জেফ বেজোস থেকে শুরু করে রাশিয়ার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা রসকসমসের প্রধান দিমিত্রি রোগোজিনও।

আরো পড়ুন: মহাকাশে যৌন সম্পর্কে আগ্রহী জনি সিন্স, চান ইলন মাস্কের সহায়তা

পরিবর্তনের শুরু, শেষ হবে কিসে?: মালিক বনে যাওয়ার পরপরই টুইটারে ব্যাপক পরিবর্তন আনছেন মাস্ক৷ ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রায় সব শীর্ষ কর্মকর্তাকেই সরিয়েছেন তিনি৷ সেই তালিকায় রয়েছেন ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভুত সাবেক সিইও পরাগ আগরওয়াল, ব্রেট টেলর, ওমিদ কোর্দেস্তানি, ডাভিড রোজেনব্লাট, মার্থা লেন ফক্স, প্যাট্রিক পিচেট, এগন দুরবান, ফেই-ফেই লি এবং মিমিআলমায়েহু৷ সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ছাঁটাই এখনো শেষ হয়নি, মাস্ক আরো ব্যাপক ছাঁটাইয়ের কথা ভাবছেন৷ টুইটারকে ঢেলে সাজাতে বর্তমানে যে ৭৫ হাজার কর্মী রয়েছে, তাদের অন্তত ৭৫ ভাগকেই বিদায় করা হতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে৷

শিকল ভাঙতে চান মাস্ক: মাস্কের দাবি অনুযায়ী, যে বাকস্বাধীনতার উপরে শিকল পরানো থাকে টুইটারে, সেই শিকলই কি এ বার ভাঙতে চান তিনি? সে প্রশ্নও উঠেছে। টুইটার কেনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মাস্ক। ২৭ অক্টোবরের ওই টুইটে মাস্কের দাবি, আমি কেন টুইটার অধিগ্রহণ করলাম, তা ব্যক্তিগতভাবে সকলকে জানাতে চাই। কারণ, মানবতার ভবিষ্যতের খাতিরে সমস্ত পক্ষের স্বাধীন মতপ্রকাশের জন্য একটা ডিজিটাল মঞ্চ থাকা উচিত। এই মুহূর্তে নেটমাধ্যম যে কট্টর বাম এবং দক্ষিণপন্থীদের প্রকোষ্ঠে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার বিপদসঙ্কুল পথে দাঁড়িয়ে, তা মনে করেন মাস্ক। এর জেরে সমাজে বিদ্বেষ বাড়তে পারে। সমাজে বিভাজন গড়ে উঠতে পারে। ওই টুইটে সে আশঙ্কাও করেছেন মাস্ক।

ডোনাল্ড ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিরবেন কী?: ইলন মাস্ক টুইটার কিনে নেওয়ায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটি এখন সুস্থ মস্তিষ্ক মানুষের হাতে রয়েছে। তবে আজীবন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলে প্ল্যাটফর্মটিতে ফিরবেন কি না তা স্পষ্ট করেননি সাবেক এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট। চলতি বছরের শুরুর দিকে ইলন মাস্ক বলেছিলেন, (ট্রাম্পের বিরুদ্ধে) তিনি সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবেন।গত শুক্রবার নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আমি খুবই খুশি যে, টুইটার এখন বিবেকবান মানুষের হাতে। এটি আর মৌলবাদী বামপন্থী পাগল ও উš§াদদের দিয়ে পরিচালিত হবে না; যারা সত্যিই আমাদের দেশকে ঘৃণা করে। এদিকে, ইলন মাস্ক ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি ট্রাম্পের টুইটার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে পারেন। ২০২১ সালে ক্যাপিটল হিল দাঙ্গায় উসকানির অভিযোগে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ করেছিল টুইটার।

খামখেয়ালিপনা নাকি নো বলে ছক্কা: সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত টুইটারের বাজার মূল্য ৪,০৮৩ কোটি ডলার। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এটি মুনাফা করেছে ১২০ কোটি ডলার। তবে গত বছরের এই সময়ের থেকে তা ১ শতাংশ কম। এমনকি, মুনাফায় মেটার থেকে তা ২৫ গুণ কম। লোকসানের নিরিখে ২৭ কোটি ডলার পানিতে গিয়েছে টুইটারের। লাভ-লোকসান ছাড়াও ব্যবহারকারীদের নিজের দিকে টেনে আনার ক্ষেত্রেও ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম-সহ বহু সমাজমাধ্যমের থেকে পিছিয়ে টুইটার। চলতি অর্থবর্ষের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে দৈনিক ২৩.৮ কোটি ইউজার বা ব্যবহারকারী রয়েছে এর। অথচ ফেসবুকের দাবি, তাদের সাইটে দৈনিক ১৯৮ কোটি। তবে কি খামখেয়ালিপনার কারনেই কিনেছেন টুইটার? কিন্তু বিশ্বের শীর্ষ ধনীর দাবি, তিনি বিশ্বাস করেন, যত কোটি ডলার খরচ করে টুইটার কিনেছেন, তার থেকে দশ গুণ বেশি মূল্য এটির। সে জন্যই ৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের মধ্যে নিজের সম্পত্তি থেকে ১,৫০০ কোটি ডলার ঢেলেছেন তিনি। টুইটার কিনতে বাকি অর্থ এসেছে ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড এবং অন্যান্য লার্জ ফান্ড থেকে। এই অধিগ্রহণে ১০০ কোটি ডলার ঢেলেছেন ওর‌্যাকল-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসনও। এ ছাড়া, বিভিন্ন ব্যাঙ্ক ঋণ নিয়ে বাকি ১,৩০০ কোটি ডলার তোলা হয়েছে।

উত্তরদক্ষিণ, ০২ নভেম্বর ২০২২, প্রথম পৃষ্ঠা

ব্যবহারকারীরা কি মুখ ফিরিয়ে নেবেন?: মাস্কের মালিকানায় টুইটারে ‘অরাজকতা, বিদ্বেষ, অভিবাসী বিদ্বেষ এবং নারীবিদ্বেষ’ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন ব্রিটিশ অভিনেত্রী জামিলা জামিল। টুইটার যার মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণেই থাকুক না কেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ‘বরাবরই বড় সামাজিক মাধ্যমগুলোর ক্ষমতা নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন।’ ডেমোক্রেটিক দলের সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেনের মতে, এই চুক্তি ‘গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক’। তবে, রিপাবলিকান পার্টির সিনেটর মার্শা ব্ল্যাকবার্নের মতে, মাস্ক এবং টুইটার পরিচালকদের মধ্যে অধিগ্রহণ চুক্তির সমঝোতা ‘বাকস্বাধীনতার জন্য একটি উৎসাহজনক দিন।’ স্ক্যামারদের হাত থেকে ভুয়া সংবাদ ঠেকাতে টুইটারে শুরু হয়েছে বিখ্যাত ব্যক্তিদের অ্যাকাউন্ট ভেরিফিকেশনের প্রক্রিয়া। এদিকে প্ল্যাটফর্মটির নতুন মালিক মনে করেন নামের পাশে ব্লু চেক সিম্বলটি একটি আভিজাত্যের প্রতীক। আর তাই এর জন্য ব্যবহারকারীদের আরও বেশি মূল্য দেয়া উচিত। এজন্য টুইটারের নতুন মালিক ইলন মাস্ক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এটি ভেরিফিকেশনের জন্য ব্যবহারকারীকে টুইটার ব্লুতে সাইন আপ করতে হবে। এর মূল্য প্রতি মাসে চার ডলার ৯৯ সেন্ট থেকে বাড়িয়ে ২০ ডলার করার সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে। সিদ্ধান্তটি কার্যকর করার জন্য মাস্ক প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের ৭ নভেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। এটি কার্যকর করতে না পারলে তিনি কর্মীদের ছাঁটাই করা শুরু করবেন বলেও জানিয়েছেন।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading