বেনজিরের পর ইমরান হত্যাচেষ্টা: রক্তের রাজনীতিতে ধুঁকছে পাকিস্তান
দিদার হাসান । বুধবার, ০৯ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ০৯:৪৫
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে গুলি করে হত্যার চেষ্টার পর পাকিস্তানের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন অস্থিরতা। লং মার্চ চলার মধ্যে হামলার শিকার হয়েও প্রাণে বেঁচে ফেরা সাবেক এই ক্রিকেট তারকার সমর্থনে তার দল তেহরিক-ই-ইনসাফের কর্মীবাহিনী দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু করেছেন। আশঙ্কা করছেন অনেকেই, ইমরান খানকেও শেষ পর্যন্ত বেনজিরের পরিণতি বরণ করতে হয় কি না! বেনজিরের মতো প্রতিহিংসার শিকার যদি তিনিও হন, তাহলে তা হবে পাকিস্তানের গণতন্ত্রের ও আইনের শাসনের জন্য এক চরম বিপর্যয়, দুর্ভাগ্য। পাকিস্তানের ইতিহাস যে অগণতান্ত্রিক ও অরাজনৈতিক শাসনের যূপকাষ্ঠে দীর্ঘদিন বন্দি ছিল, তা থেকে মুক্তি ও উত্তরণে ইমরান খানের নেতৃত্ব ও তেহেরিক-ই-ইনসাফের ভূমিকা অনেকটাই গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় প্রভাব ফেলেছে। ইমরান খানের ভাগ্য ও পাকিস্তানের বিদ্যমান অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা ভেবে উদ্বিগ্ন পর্যবেক্ষক মহল।
বিশ্বনন্দিত ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিক এবং পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আগাম নির্বাচনের দাবিতে লংমার্চে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় ৩ নভেম্বর বৃহস্পতিবার পাঞ্জাবের ওয়াজিরাবাদে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। কমপক্ষে তিনটি গুলি তার পায়ে বিদ্ধ হয়। হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি ছোড়া হলেও তিনি এই যাত্রা বেঁচে গেলেন হয়তো! তবে আততায়ীর গুলিতে তার দলের এক কর্মী নিহত এবং ছয় জন আহত হয়েছেন। উল্লেখ্য, ইসলামাবাদের উদ্দেশে ইমরানের নেতৃত্বে পিটিআইয়ের লং মার্চ শুরু ২৮ অক্টোবর। মাত্র ছয় দিনের ব্যবধানে এমন সহিংস ঘটনা ঘটল! ইমরান খানের জীবন বিপন্ন করে আদতে কে বা কারা লাভবান হবে—এ নিয়ে প্রশ্ন মুলতবি রাখা কঠিন। আটক এক হামলাকারী অবশ্য বলেছেন, ‘ইমরান খান লোকজনকে বিভ্রান্ত করছিলেন, এটা আমি সহ্য করতে পারছিলাম না, তাই আমি তাকে হত্যার চেষ্টা করেছি। শুধু ইমরান খানকে, অন্য কাউকে না!’ তদন্তকারীদের উচিত ওর এই বক্তব্য সত্য না বিভ্রান্তিকর, তা খতিয়ে দেখা। কারণ ইমরান খান ও তার দল এখন পাকিস্তানের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইমরান খান গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় স্বাভাবিক কারণেই তার দলের অনুসারীরা পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে ব্যাপক বিক্ষোভ, প্রতিবাদ করেছে। দ্রুত অবাধ ও সুষ্ঠু রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা গ্রহণই এখন বর্তমান শাহবাজ শরিফের লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, সেনাবাহিনী ইমরান খানের গুলিবিদ্ধের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ এবং দ্রুত সুস্থতা কামনা করলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত ও অবনতিশীল হওয়ার আগেই নির্বাচন ছাড়া বিকল্প পথ ও পন্থার কথা ভাবা অনুচিত। গণতন্ত্রের অভিযাত্রার এই ধারা বজায় রাখার স্বার্থেই তা জরুরি।
পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক ইতিহাস প্রপঞ্চময়। জেনারেল আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জিয়াউল হক, পারভেজ মোশাররফের সামরিক শাসনের নিগরে দীর্ঘদিন বন্দি ছিল পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক শাসন। ২ জুন, ২০১৩ সালে সূচিত হয়েছিল নতুন ইতিহাস। কারণ ঐ দিন মীর হাজার খানের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বতী তত্ত্বাবধায়ক সরকার নবনির্বাচিত নওয়াজ শরিফের মুসলিম লীগ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নজির সৃষ্টি করেছিল এবং প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নতুন প্রধানমন্ত্রীকে (তৃতীয় দফা) শপথ পড়িয়েছিলেন। আরো একটা বিষয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আগে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির পিপিপি সরকার মেয়াদ পূর্ণ করার সুযোগ পেয়েছিল! তখন পাকিস্তানের ৬৬ বছরের ইতিহাসে সেই সরকারই ছিল প্রথম এমন সৌভাগ্যবান! উল্লেখ্য, নওয়াজ শরিফ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার দুই বছর আগেই তৎকালীন সেনাপ্রধান ও স্বনিযুক্ত রাষ্ট্রপ্রধান জে. পারভেজ মোশাররফ এক রক্তপাতহীন অভ্যুথানের মাধ্যমে ১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর নওয়াজ সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে ও দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল। পরে অবশ্য অন্তর্র্বতী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিতে পারভেজ মোশাররফ আদালত দ্বারা চিরদিনের জন্য অযোগ্য ঘোষিত হয়েছিলন।
সেই অন্তর্র্বতী সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ক্রিকেটার ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের তখন ২৯টি আসনে জিতে তৃতীয় শক্তি হিসেবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে উত্থান ঘটিয়েছিল। জুলাই, ২০১৮ সালে ঘটে পাকিস্তানের ২২তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠান। তারপর চলতি বছরের এপ্রিলে পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে হেরে গিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হন ৭০ ছুঁই ছুঁই ইমরান খানের সরকার। ইমরানের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় পাকিস্তানের প্রভূত আলোচিত ও ক্ষমতাধর সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে মন্তব্য করা হয়েছে, ইসলামাবাদে সমাবেশ করার গণতান্ত্রিক অধিকার ইমরান খানের রয়েছে, তবে দেশকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ কাউকেই দেওয়া হবে না! নির্বাচনের দাবিতে নিয়মতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ-লং মার্চ গণতান্ত্রিক অধিকার হলে দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রশ্ন উঠবে কেন? নির্বাচনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈধ নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক অধিকার তাহলে কী? ইমরান খানের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবরে অনেক বিশ্লেষকই মনে করছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর কথা। তাকেও এক নির্বাচনি মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় রাওয়ালপিন্ডিতে ২৭ ডিসেম্বর ২০০৭ সালে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।
লেখক: সাংবাদিক
ইউডি/কেএস

